সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা, জাল বুনে সংসার চালাচ্ছেন নারীরা

আপডেট : ১৫ জুন ২০২২, ১০:৪৯


‘আমাগের স্বামীরা নিষেধাজ্ঞার কারণে সাগরে মাছ ধরতি যাতি পারতিছে না। গ্রামেও কাজ নেই। বেকার অবস্থায় বাড়ি বসে রইছে। সাগরে মাছ ধরা ছাড়া অন্য কাজও তারা জানে না। ঘরেও খাবার নেই। আমাদের জেলেপল্লীর মানুষের জীবন কাটতিছে খুব  কষ্টের মধ্যি’। এভাবেই সংসারের কষ্টের কথা বলছিলেন, খুলনার পাইকগাছা উপজেলার রামনাথপুর গ্রামের সমুদ্রগামী জেলে পল্লীর চল্লিশোর্ধ গৃহবধূ শেফালি বিশ্বাস।

সোমবার (১৩ জুন) খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার হরিঢালী ইউনিয়নের রামনাথপুর ও মাহমুদকাটী গ্রামের সমুদ্রগামী জেলেপল্লীতে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পুরুষরা বাড়িতে শুয়ে-বসে আছে। কেউ কেউ ঘরের বারান্দায় বসে গল্পগুজব করছে। নারীদের কেউ জাল বুনছে; আবার কেউ বারান্দায় ছোট্ট শিশুকে কোলে নিয়ে বসে আছে। আবার কেউবা রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের ভেতর নেই কোনো উচ্ছ্বাস। চোখে-মুখে যেন একরাশ হতাশা।

জেলে পল্লীতে ঢুকতেই দেখা যায়, পঞ্চাশোর্ধ একজন নারী একান্ত মনে জাল বুনছেন। চার-পাঁচজন লোককে একসঙ্গে দেখেই জড়োসড়ো হয়ে গেলেন। টেনে দিলেন মাথার ঘোমটা। নাম জিজ্ঞেস করতেই বললেন, শীলা বিশ্বাস।

তিনি জানান, তার চার মেয়ের মধ্যে তিন মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। এখন সংসারে এক মেয়ে, স্বামী আর তিনি। তার স্বামী অমল বিশ্বাস সাগরে মাছ ধরেন। সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে এখন মাছ ধরাও বন্ধ। তিনি এখন বাড়িতে বেকার বসে আছেন।

নিষেধাজ্ঞার কারণে তিন মাস সাগরে মাছ ধরা বন্ধ। জেলেরা পাইকগাছা উপজেলার মাহমুদকাটি গ্রামের কপোতাক্ষ নদের পাড়ে সমুদ্রগামী নৌকা সারিবদ্ধভাবে তুলে রেখেছেন।

শীলা বিশ্বাস বলেন, ‘এখন আমি বাড়িতে জাল বুনে সংসার চালাচ্ছি। এক মালি (এক গোছা) জাল বুনতে দুই দিন সময় লাগে। এ থেকে আয় হয় মাত্র ১২০টাকা। এই টাকা দিয়েই চাল কিনতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘খালি কী চাল কিনলে হয়, তেল, নুন, ডাল, মরিচ, আদা, পেঁয়াজ, মসল্লাও কিনতে হয়। কিন্তু ওসব কেনার টাকা পাবো কই? খুব কষ্টের মধ্যে আছি আমরা।’

শীলা বিশ্বাসের মতো একইভাবে পাশের বাড়ির বারান্দায় বসে জাল বুনছিলেন, আশি বছরের বৃদ্ধা খুকু রাণী। তিনি বলেন, তার দুই ছেলে অনিমেষ বিশ্বাস আর ভোলানাথ বিশ্বাস। ছেলেদের মাছ ধরা বন্ধ, তাই তিনি এই বৃদ্ধ বয়সে জাল বুনে তাদের একটু সাহায্য করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাইকগাছা উপজেলার হরিঢালী ইউনিয়নের রামনাথপুর, মাহমুদকাটী, নোয়াকাটী ও নগর শ্রীরামপুর গ্রামের তিন শতাধিক পরিবার সমুদ্রে মৎস্য আহরণের সঙ্গে জড়িত। এসব পরিবারের দেড় সহস্রাধিক জেলে অক্টোবর মাসে মৎস্য ও বনবিভাগের পাশ পাওয়ার পর মাছ ধরার জন্য বঙ্গোপসাগরে পাড়ি জমান। সাগরের হিরণপয়েন্ট থেকে দুবলারচরের আলোরকোল, শ্যালা, নারকেলবাড়ী ও কোয়াকাটা এলাকার ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে গভীর সাগরে দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে মাছ শিকার করেন। এই পাঁচ মাসে জেলেদের জালে ধরা পড়ে ইলিশ, ছুরি, রূপচাঁদা, তেলে পারশে, কুটি পারশে, লটে, চিংড়ি, ভোলাসহ বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছ। এই মাছ শিকার শেষে মার্চ মাসের প্রথম দিকে আবার ঘরে ফিরতে শুরু করেন জেলেরা।

মাছ ধরার মৌসুম শুরু হলে এক শ্রেণির মহাজনের কাছ থেকে এক লাখ টাকায় ২০ হাজার টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা সুদে দাদন (ঋণ) নিয়ে সাগরে নৌকা ভাসান জেলেরা। এভাবে সাত-আটজন জেলের নৌকাপ্রতি খরচ হয় কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা থেকে ১২ লাখ টাকা। প্রতিবছর কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই এই জেলেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকা ভাসান সাগরের বুকে।

খুলনা জেলা মৎস্য অফিস সূত্র জানায়, খুলনা জেলার নয় উপজেলায় ২৩ হাজার ৭২০জন সমুদ্রগামী জেলে রয়েছে।

১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস সুন্দরবন বন বিভাগের পক্ষ থেকে এবং ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে সাগরে মাছ আহরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই সময় মাছের প্রজননকাল বলে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

রামনাথপুর গ্রামের সমুদ্রগামী জেলে ভোলানাথ বিশ্বাস বলেন, সুন্দরবন বন বিভাগের পক্ষ থেকে ১ জুন থেকে তিন মাসের জন্য সাগরে মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সে কারণে বাড়িতে বেকার বসে আছি। অন্য কাজও জানি না যে সেই কাজ করব। সাগরে গিয়ে যে টাকা আয় হয়েছিল, তাও শেষ হয়ে গেছে। এখন খুব কষ্টের মধ্যে আছি।

ঘরে বসে জাল বুনছেন ৮০ বছরের বৃদ্ধা খুকু রাণী।

তিনি বলেন, আমাদের সমুদ্রের জলসীমায় মাছ ধরার উপর সরকারের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ভারতের জেলেদের মাছ ধরার উপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। ওরা আমাদের জলসীমায় ঢুকে পড়ে মাছ ধরে নিয়ে যায়। মাঝেমধ্যে দু-একটি ট্রলার কোস্টগার্ডের হাতে ধরা পড়লেও ওদের ঠেকানো যায় না। ওদের মাছ ধরা ট্রলার অনেক উন্নতমানের ও গতিসম্পন্ন। নৌবাহিনী অথবা কোস্টগার্ডের সদস্যরা যেতে যেতে ওরা মাছ ধরে পালিয়ে যায়।

মাহমুদকাটী গ্রামের জেলে পাঁচু বিশ্বাস বলেন, সুন্দরবন বন বিভাগের তিন মাসের নিষেধাজ্ঞার চেয়ে মৎস্য বিভাগের ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা জেলেদের জন্য বেশি ক্ষতিকর। এই ৬৫ দিন মাছ ধরার সবচেয়ে ভরা মৌসুম। নিষেধাজ্ঞার জন্য এই ভরা মৌসুমে আমাদের বসে থাকতে হয়; আর এই সুযোগে ভারতের জেলেরা বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় ঢুকে ট্রলার ভরে মাছ ধরে নিয়ে যায়।

তিনি বলেন, সরকারিভাবে সমুদ্রগামী জেলেদের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞাকালীন সময় পরিবার প্রতি ৫৫ কেজি চাল দেওয়া হয়। এখনো আমরা সে চালও পাইনি। নিষেধাজ্ঞার জন্য সাগরে মাছও ধরতে যেতে পারছি না। আবার সংসারও চালাতে পারছি না। এখন অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছি।

জেলে অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাগরের চিত্র পাল্টে গেছে। আকাশ এই পরিস্কার তো হঠাৎ কালো মেঘে ঝড়ের আঘাত। নিরাপত্তা সরঞ্জাম না থাকার কারণে আমাদের ঝড়ের কবলে মৃত্যুর মুখে পড়তে হয়। জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেই আমরা সাগরে মাছ ধরি।’

হরিঢালী ইউনিয়নের ৭ নম্বর মাহমুদকাটী ওয়ার্ডের সদস্য শঙ্কর বিশ্বাস বলেন, ‘সমুদ্রগামী জেলেদের সংসার অনেক কষ্টে কাটে। জেলেদের বেশির ভাগই মহাজনের ঋণের জালে বন্দি। সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকলে তাদের অনাহারে দিন কাটে।’

খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়দেব কুমার পাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস সুন্দরবন বন বিভাগের পক্ষ থেকে এবং ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে সাগরে মাছ আহরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ৬৫ দিন নিষেধাজ্ঞার সময় মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে সমুদ্রগামী জেলেদের পরিবার প্রতি ৫৬ কেজি চাল দেওয়া হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সময় সরকারের পক্ষ থেকে জেলেদের সাগরে যাওয়ার আগে নিরাপত্তাসামগ্রী প্রদান করা হয়েছে। তবে, আপাতত এগুলো দেওয়া বন্ধ রয়েছে। এছাড়া সমুদ্রগামী জেলেদের সহায়তায় ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিসারিজ প্রজেক্ট’ নামে একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার সময় বাংলাদেশের সমুদ্র সীমায় ভারতীয় জেলেদের মাছ ধরে নিয়ে যাওয়ার কথা সত্য নয়। এজন্য নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড সদস্যরা যথাযথভাবেই দায়িত্ব পালন করছেন।’

ইত্তেফাক/এমএএম