বৃহস্পতিবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৬ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

উৎপাদন খরচের তুলনায় দাম কম, তবু ক্রেতা নেই

আপডেট : ১৬ জুন ২০২২, ০২:০০

বিশ্বব্যাপী মন্দার শঙ্কায় বিরূপ প্রভাব পড়েছে দেশীয় সুতার বাজারে। কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে বহুগুণ। এমনকি জাহাজীকরণের সমস্যাও দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় উৎপাদন খরচের প্রায় অর্ধেক কম দামেও সুতার ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সামগ্রিকভাবে ৩০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হুমকিতে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে তুলার দাম বেড়েছে। পরিবহন খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন খরচও বেড়েছে। কিন্তু ক্রেতা না থাকায় উৎপাদিত সুতা নিয়ে বিপাকে পড়েছে স্থানীয় বস্ত্রকলগুলো। এদিকে বন্ড সুবিধায় আসা সুতা খোলা বাজারে বিক্রি হওয়াও বন্ধ হয়নি।

এদিকে করোনা পরবর্তী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে টালমাটাল অবস্থা বিরাজ করছে। উন্নত দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি উচ্চমাত্রায় পৌঁছেছে। ক্রেতারা দৈনন্দিন ব্যয়ে লাগাম টেনে ধরায় দেশীয় গার্মেন্টস রপ্তানিও হুমকির মুখে রয়েছে। অভ্যন্তরীণভাবে কাপড়ের চাহিদা কমে যাওয়ায় সুতার বিক্রিতে ভাটা পড়েছে। কাপড়ের চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশীয় উৎপাদকরা সুতা কেনা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজার ও আন্তর্জাতিক উভয় বাজারের চাহিদা কমে যাওয়ায় সুতার বিক্রি কমে গেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) কর্মকর্তারা।

বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন ইত্তেফাককে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বেশি। এই যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঢিমেতালে চলবে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন ধীরে চলে নীতিতে এগোচ্ছে। জাহাজীকরণের সমস্যাতো রয়েছেই। তিনি জানান, অভ্যন্তরীণ বাজারের অবস্থাও খুব খারাপ। কাপড়ের বিক্রি কমে গেছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে স্পিনিংমিলগুলোতে প্রতিদিনই মজুত বাড়ছে। উৎপাদন সক্ষমতা অনুযায়ী একেক মিলের ক্ষেত্রে একেক রকম মজুত হচ্ছে। কোনো কোনো কারখানার ১৫ দিনের মজুত মানেই ১ হাজার টনের বেশি সুতা জমছে। এভাবে সবগুলো কারখানায় মজুত বাড়তে থাকলে অবিক্রীত সুতা নিয়ে মিলগুলো আরো বেশি সমস্যায় পড়বে। সুতার বাজারের এই শ্লথগতিতে ব্যাংকগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যাংকের বিনিয়োগে গড়া বস্ত্রকলগুলো নিয়মিত কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হবে। কর্মীদের বেতন-ভাতা প্রদানেও অনিশ্চয়তা দেখা দেবে।

জানা যায়, উৎপাদন খরচ পুষিয়ে না আসায় ৭০ ভাগ পাওয়ার লুম বন্ধ হয়ে গেছে। চাহিদার নিরিখে দেশে বস্ত্রকলে বিনিয়োগে এগিয়ে এসেছেন উদ্যোক্তারা। স্বাধীনতার পর দেশে তাঁত শিল্পের ব্যাপক প্রসার লাভ করে। তখন তাঁত শিল্পের সুতা সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত স্পিনিং মিল ছিল না। পরবর্তী সময়ে তাঁতিদের চাহিদা মেটাতেই দেশে স্পিনিং মিল দেশে গড়ে ওঠে। যারা অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা মেটাতে সক্ষম।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশীয় সুতার কলগুলো এমনিতেই নানা প্রতিবন্ধকতার মোকাবিলা করছে। মিথ্যা ঘোষণায় কম মূল্যে সুতা আমদানি, বন্ডের সুতা খোলাবাজারে বিক্রি, আবার তাঁতি সমিতির নামে রেয়াতি শুল্কহারে আমদানি করা সুতাও খোলাবাজারে চলে যায়। এই ত্রিমুখী চাপ মোকাবিলা করে আসা স্পিনিং শিল্প এখন চাহিদা কমে যাওয়ায় নতুন করে সংকটে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আন্তর্জাতিক বাজার মনিটরিং সেল গঠন করে প্রতিনিয়ত বাজার তদারকি করার মাধ্যমে সরকার সহায়ক নীতি গ্রহণ করতে পারে। যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার নিরিখে দামের উত্থানপতন ঘটে। এসব নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা এবং সেই মোতাবেক নীতি গ্রহণ করা হলে ক্রেতা ও উৎপাদক কারোই সমস্যা হতো না। অন্যান্য দেশে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাংক ও রাজস্ব নীতি প্রণয়ন করা হয়। তাতে উদ্যোক্তারা ঋণ খেলাপি হন না, ক্রেতাদেরও সংকট মোচন হয়। বাংলাদেশেও এই ধরনের নীতি অনুসরণ করলে বিনিয়োগ সুরক্ষা পাবে বলে মনে করেন তারা। 

ইত্তেফাক/ ইআ