সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পাকিস্তানে যৌন-নিগ্রহে অভিযুক্ত কূটনীতিককে ফেরাচ্ছে জার্মানি 

আপডেট : ১৬ জুন ২০২২, ১৯:৩৬

গত নভেম্বরে করাচিতে কয়েকজন শিল্পী গান এবং স্ট্যান্ড আপ কমেডির লাইভ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পাকিস্তানের এই বন্দর শহরে বেসরকারি জায়গায় এই প্রস্তুতি চলছিল। এই ইভেন্ট নিয়ে প্রত্যেকে ছিলেন উত্তেজিত এবং আবেগপ্রবণ।

ইভেন্টটি করাচিতে শনিবারের নিয়মিত লাইভ শো ছিল না। এই ইভেন্ট ছিল এলজিবিটিকিউও তাদের সমর্থকদের জন্য অনুষ্ঠান। এর উদ্যোক্তা ছিলেন ক্যানাডিয়ান-পাকিস্তানি রক গায়ক উর্বা খান। করাচির জার্মান কনসুলেটের কূটনীতিক ছিলেন অনুষ্ঠানের যুগ্ম-স্পনসর। 

ডিডাব্লিউকে খান বলেছেন, ''এই ইভেন্ট ছিল আমাদের সমাজে ব্রাত্য মানুষদের প্রতিভা দেখানোর মঞ্চ।'' তবে পাকিস্তানের আইন অনুসারে সমকামিতা অপরাধ।

এই অনুষ্ঠানের নাম দেয়া হয়েছিল স্ক্র্যাপফেস্ট, সেখানে যারা এসেছেন, তারা যাতে খোলা মনে মিশতে পারেন, নিজেদের প্রকাশ করতে পারেন এবং আনন্দ করে সময় কাটাতে পারেন, সেটাই ছিল অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য।

অনুষ্ঠানের দিন পুরো জায়গাটা ছিল ভিড়ে ঠাসা। 

সেখানে এক নারী কিছুটা নার্ভাস হয়ে মঞ্চে উঠলেন, তিনি আবেগ ও শারীরিক নিগ্রহ নিয়ে বললেন, ''বাচ্চা মেয়েরা, তোমরা কি মনে কর না, শারীরিক নিগ্রহের জন্যই তোমাদের জন্ম হয়েছে?''

তার এই কথাই সেদিনের ইভেন্টকে ঢেকে দেয়। কারণ, ওই ইভেন্টেই এক নারীকে জার্মান কূটনীতিক নিগ্রহ করেন বলে অভিযোগ।

ডিডাব্লিউকে জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, একমাস ধরে অনুসন্ধান করেও কূটনীতিকের বিরুদ্ধে যৌন নিগ্রহের কোনো প্রমাণ তারা পায়নি। তবে এই তদন্তের রিপোর্ট গোপন নথি। অবশ্য শীঘ্রই ওই কূটনীতিককে বার্লিনে নিয়ে আসা হচ্ছে।

ডিডাব্লিউ সেদিনের ইভেন্টে উপস্থিত আটজনের সঙ্গে কথা বলেছে। ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে। ইভেন্টের আয়োজকদের সঙ্গে কূটনীতিকের টেক্সট মেসেজও দেখেছে ডিডাব্লিউ।

সব মিলিয়ে সেদিনের ইভেন্টে ঘটে যাওয়া ঘটনার অন্য দিক বেরিয়ে এসেছে।

যে নারীর যৌন নিগ্রহ নিয়ে অভিযোগ, তিনি বলেছেন, ইভেন্টের শেষের দিকে তিনি যখন জার্মান কূটনীতিকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি ওই নারীর শরীরে নীচের দিকে হাত দেন। ভুল নয়, কূটনীতিকের ওই কাজ ইচ্ছাকৃত ছিল।

ভিডিও ফুটেজে আংশিকভাবে বোঝা যাচ্ছিল কী হয়েছিল। কিন্তু এখান থেকে নিগ্রহের কোনো প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। এটুকু দেখা যাচ্ছে, ওই নারী কূটনীতিকের পাশ দিয়ে যাচ্ছেন আর কূটনীতিকের হাত আন্দোলিত হচ্ছে।

রাতে কূটনীতিক ইভেন্টের আয়োজক উর্বা খানের কাছে ওই নারীর ছবি টেক্সট করে ফোন নম্বর চান। পরের দিন যখন নিগ্রহের অভিযোগ এল, তখন উর্বা খানের সঙ্গে কূটনীতিকের মেসেজ বিনিময় হয়েছিল।

কূটনীতিকের মেসেজ ছিল, ''আমি করেছি? ব্লাডি হেল! খারাপ! ফা... অ্যালকোহল।'' তারপর তার মেসেজ, ''আমি শুধু এইটুকু মনে করতে পারছি, ওই নারী আমার দিকে তাকিয়ে খুবই উষ্ণতার সঙ্গে হেসেছিলেন। কিন্তু কোনোরকম শারীরিক স্পর্শ হয়েছিল বলে আমি তো মনে করতে পারছি না।'' এরপর তিনি লিখেছেন, ''আমি কাউকে হেনস্থা করি না।''

ডিডাব্লিউ ওই ইভেন্টে উপস্থিত যে মানুষদের সঙ্গে কথা বলেছে, তারাও জানিয়েছেন, কূটনীতিক ওই নারীকে যৌন নিগ্রহ করছেন, এমন কিছু তারা দেখেননি। কিন্তু তারা সকলেই বলেছেন, ওই কূটনীতিক অতিথিদের হেনস্থা করেছিলেন এবং অতিথিরা তাকে নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছিলেন।

কীরকম ব্যবহার?

ওই কূটনীতিকের বয়স ষাটের বেশি। সেদিন তিনি মদ্যপ হয়ে পড়েছিলেন এবং অতিথিদের খুব কাছে চলে যাচ্ছিলেন। অনেকেই বলেছিলেন, তিনি সীমানা লঙ্ঘন করছিলেন। একজন অতিথি জানিয়েছেন, ওই কূটনীতিক তার এক বান্ধবীর পেছনে হাত রেখেছিলেন। দেখেই তিনি অস্বস্তিতে পড়ে যান। তারপর তিনি সারা রাত বান্ধবীকে ওই কূটনীতিকের হাত থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করে গেছেন।

এক রূপান্তরকামী নারী ডিডাব্লিউকে বলেছেন, কূটনীতিক তাকে ওইদিন বলেছিলেন, ''আপনাকে খুব হট লাগছে।'' তিনি নাচার কথাও বলেছিলেন। আরেক রূপান্তরকামী নারী জানিয়েছেন, ওই কূটনীতিক তাকে জোর করে নাচের ফ্লোরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। এক পুরুষের বক্তব্য, ওই কূটনীতিক এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের মানুষদের সঙ্গে যা করেছেন, তা একেবারেই প্রত্যাশিত নয়। তিনি ওই ইভেন্টটা স্পনসর করেছিলেন। তাই তিনি ভেবেছিলেন, তার হাতে সব ক্ষমতা আছে।

এক নারী ডিডাব্লিউকে বলেছেন, ''ওই কূটনীতিক এমন কথা বলছিলেন, এমন ব্যবহার করছিলেন, যেন তিনি আমাদের শেখানোর জন্য এসেছেন।''

কিন্তু এরপরেও কোনো অতিথিই ওই জার্মান কূটনীতিকের বিরুদ্ধে পুলিশ বা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানাননি। কারণ, পাকিস্তানের আইন অনুযায়ী সমকামিতা অপরাধ। তাই পুলিশ প্রথমে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে বলে তারা চুপ থেকেছেন। আজও পাকিস্তানে এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায় সামাজিক দিক থেকে প্রান্তিক মানুষ।

উর্বা খান জানিয়েছেন, কী ঘটেছে তা বুঝতে তার কিছুটা সময় লেগেছিল। তারপর তিনি জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কারণ, তিনি চাননি, এরকম ঘটনা ঘটুক।

কূটনীতিকদের কিছু রক্ষাকবচ থাকে। পাকিস্তানে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া কঠিন। কিন্তু জার্মানিতে তার বিচার হতে পারে। কারণ, যে অভিযোগ তার বিরুদ্ধে উঠেছে, তা জার্মানিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

ওই কূটনীতিক অবশ্য ডিডাবব্লিউর সঙ্গে কথা বলতে চাননি। আর যে নারী অভিযোগ করেছিলেন, তিনি কূটনীতিককে ফেরত নেয়ার খবরে জানিয়েছেন, তিনি সন্তুষ্ট। অন্তত কিছুটা ন্যায় হলো। 

 

 

 


 

ইত্তেফাক/এসআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

পাক স্বাধীনতা দিবসকে 'কালো দিন' হিসেবে আখ্যা 

পাকিস্তানে বাস দুর্ঘটনায় নিহত ১৩

পাকিস্তানে সেনা চৌকিতে হামলা, নিহত ২ 

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই: ইমরান খান 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

দেশভাগে ঘরছাড়া, ৭৫ বছর পর পাকিস্তানে ফিরলেন বৃদ্ধা 

ভারতে হুমকি-চাঁদাবাজি করে পাকিস্তানে ৩ কোটি রুপি পাচার  

পাকিস্তানকে জোরপূর্বক গুমের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের দমন-পীড়ন বন্ধ করার আহ্বান

আজ বড় সমাবেশের ডাক ইমরান খানের