শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সুনামগঞ্জের কান্না কি শুনতে পাচ্ছেন?

আপডেট : ১৭ জুন ২০২২, ২৩:১০

বসত ঘরের ভেতর পানি বিছানা-বালিশ পানির নিচে। একটা বাড়িও আর অবশিষ্ট নেই যেখানে গিয়ে উঠবে মানুষ। সমস্ত রাত পানিতে দাঁড়িয়ে কাটিয়েছে অসহায় হাওরপাড়ের বেশিরভাগ মানুষ। এমন রাত এর আগে দেখেনি কেউ। সুনামগঞ্জ জেলার প্রায় সব উপজেলার চিত্রই এখন এমন। অনেকের ঘর, গৃহপালিত পশুটি ভেসে গেছে বানের তোড়ে। কারও ঘরে আছে বৃদ্ধা মা, দুধের শিশু। চলছে টিকে থাকার লড়াই। ঘরে পানি উঠায় গ্রামের দিকে কেউ মাচায় আশ্রয় নিয়েছে, কেউ অন্যের ঘরে থাকছে। ঢেউয়ে কারো কারো ভিটা-মাটি ভেঙে যাওয়ায় ঘর হেলে গেছে; না হয় পড়ে গেছে।

এই মানুষগুলো প্রাণ নিয়ে আর কতক্ষণ টিকতে পারবে কে জানে? আশেপাশের সবাই যে যেভাবে পারে ছুটছে। বিদ্যুৎ নেই, চুলাও গেছে, নেই খাবার। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন সুনামগঞ্জে এখন কেবলই হাহাকার। দরকার উদ্ধার কার্যক্রম, ত্রাণ তৎপরতা এবং পর্যাপ্ত নিরাপদ খাবার পানি ও ওষুধের ব্যবস্থা করা। গত রাতে আমার পরিচিত দুইজন লোক মারা গেছে। এই দুই পরিবারের লোকজন আমার কাছে পরামর্শ চেয়েছে, এই লাশ তারা রাখবে কোথায়? কারণ সবজায়গায় পানি। কোথাও যে নিয়ে যাবে, সেই রকম যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। নেই পর্যাপ্ত নৌকা। সরকারি অফিস আদালতও ডুবে গেছে। এমন এক টুকরো মাটি সুনামগঞ্জে আর নেই, যেখানে কেউ গিয়ে দাঁড়াবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সুনামগঞ্জের মানুষ আপনার দিকে তাকিয়ে আছে। সুনামগঞ্জকে অবিলম্বে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

কয়েকদিন আগে একবার বন্যা হয়ে গেছে। গত ১৩ মে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জে প্রথম দফা বন্যা হয়। সে সময়েও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে মানুষের বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, মাছের খামারের। প্রথম দফার বন্যার ক্ষত সারার আগেই দ্বিতীয় দফায় বন্যার কবলে পড়েছে হাওরকন্যা সুনামগঞ্জ। প্রথম দফা কিছুটা সামলে উঠতে পারলেও এবারের বন্যা এখানকার মানুষদের ঠেলে দিচ্ছে জীবন-মরণ লড়াইয়ে। খবর নিয়ে জেনেছি, বৃষ্টি না থামায় সময়ের সাথে সাথে পানির উচ্চতা বেড়েই চলেছে। মানুষকে লড়তে হচ্ছে বন্যার সাথে। এ লড়াই হাওর সভ্যতার মানুষের একেবারে অপরিচিত তা নয়। কিন্তু অতীতে কখনো দফায় দফায় এমন দুর্ভোগে পড়েনি কেউ।

বিদ্যুতের ট্র্যান্সফর্মার ডুবে গেছে

স্মরণকালের ১৯৮৮ কিংবা ২০০৪ সালের বন্যাকে ছাড়িয়ে গেছে এবারের ভয়াবহতা। সুনামগঞ্জ শহরসহ পুরো জেলার যে চিত্র তা অতি বৃষ্টি, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, বিদ্যুৎ না থাকায় বিভিন্ন ডিভাইসে চার্জ দিতে না পারা—এসব কারণে এই অঞ্চলের খবর ঠিকঠাক গণমাধ্যমে আসছে না। সব মিলিয়ে হাওরের মানুষের বসবাস এখন প্রতিনিয়ত হাহাকারের সাথে। সামনে কী হবে সেই ধারণা কারো নেই। অনিশ্চিত এক আগাম অন্ধকারের আশঙ্কায় বিপন্ন এখন সেখানকার মানুষের জীবনযাপনের সব আয়োজন। মানুষগুলো এখন সহায়তা না পেলে ধীরে ধীরে লাশ হয়ে ভাসতে থাকবে হাওরের পানিতে।

পত্রিকায় এসেছে, সুনামগঞ্জে ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল নামা অব্যাহত থাকায় দ্বিতীয় দফা বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পানি বৃদ্ধি পেয়ে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে এখন প্রায় ৯০ ভাগ এলাকার মানুষ পানিবন্দী, অসহায়। মানুষের বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা প্লাবিত হয়েছে। বন্যার কারণে সুনামগঞ্জে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বন্যায় প্লাবিত হয়ে চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছে সাধারণ মানুষ। শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের আয় রোজগার বন্ধ রয়েছে। মানুষগুলো দীর্ঘ সময় ধরে পানিবন্দী। সেখানকার মানুষ ও তাদের গৃহপালিত পশুদের অবস্থা একবার চোখ বুজে ভাবলেই বুঝতে পারা যায়!

চারদিকে পানি থইথই

বন্যার পানির তোড়ে অনেক বাড়িঘর বিধ্বস্ত হওয়ার পাশাপাশি গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয়রা। শুধু শহর নয় সেখানকার গ্রামগুলো এমনভাবে প্লাবিত হয়েছে যে নিরাপদ আশ্রয় নেয়ার জায়গাও নেই। বন্যার পানিতে সকল নলকূপ ডুবে গেছে। এজন্য বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ঘরে চাল নেই, চুলাও ডুবে গেছে। লাকড়ি নেই। কী খাবে এরা? ক্ষুধার্ত একটা শিশুর কান্না কীভাবে সইবে সেখানকার মা-বাবা? বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। কিন্তু মানুষ সেইসব আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছাবে কীভাবে? পানিবন্দী বন্যার্ত লোকগুলো অসহায়। যারা পারছে তারা কোনোভাবে নিরাপদে পৌঁছে যাচ্ছে। কিন্তু অনেকেই সেই ব্যবস্থা করতে পারছে না। তাদের উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। কয়েকটি নৌকায় লাখ লাখ মানুষকে নিরাপদে নেওয়ার ব্যবস্থা করা অসম্ভব। প্রয়োজন সরকারি প্রশাসনের পূর্ণ সহায়তা। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা আরও বাড়তে হতে পারে। জেলা সদরের সঙ্গে ছয়টি উপজেলার সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। কোনো যানবাহন চলছে না। সুনামগঞ্জ শহরের প্রধান সড়কগুলোতে নৌকা চলছে। সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের অন্তত সাত জায়গায় কোমরসমান পানি। ফলে সুনামগঞ্জের সাথে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।  

বন্যা কবলিত সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ে অনেক মানুষই এখন খাবার সংকটে ভুগে ত্রাণের জন্য হাহাকার করছেন। এখনো সরকারের দায়িত্বশীলদের তেমন কার্যক্রম নেই। কার্যক্রম যা আছে, তা খুব সীমিত। আবার ত্রাণ যারা পাবার, তারা না পেয়ে সরকারি দলের লোকেরা পায়। সেই ত্রাণ সরকারি কর্মচারীদের দিয়ে ভাগ করালেও সঠিক ভাবে সঠিক মানুষের কাছে কেন জানি তা পৌঁছে না। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সহায়তার জন্য ২৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিটি উপজেলায় দেওয়া হয়েছে ২০ মেট্রিক টন করে। চারটি পৌরসভায় দেওয়া হয়েছে ৩০ মেট্রিক টন। এ ছাড়া নগদ ৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব বিতরণ করা হচ্ছে। দুর্গতদের মাঝে শুরু হয়েছে ত্রাণ তৎপরতা, কিন্তু তা খুব অল্প। আর সেই ত্রাণ ঠিকভাবে সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছাবে কিনা সেই প্রশ্ন থেকে যায়।

বন্যার পানিতে ডুবে গেছে নলকূপ

আমাদের দেশে হাওর এলাকায় প্রধান প্রধান দুর্যোগ হল বন্যা, বজ্রপাত, উচ্চ মাত্রার ঢেউ এসব। গত কয়েক বছর ধরে হাওর এলাকায় ঘন ঘন বন্যা হচ্ছে। বন্যা যেহেতু প্রাকৃতিক দুর্যোগ, তাই একে পুরোপুরিভাবে আমরা দমিয়ে ফেলতে বা প্রতিরোধ করতে পারবো না। কিন্তু দুর্যোগ পূর্ববর্তী, দুর্যোগকালীন এবং দুর্যোগ পরবর্তী সঠিক পদক্ষেপ ও সহায়তা এর ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে।

পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে ২০১৭ সাল থেকে অতিমাত্রায় বৃষ্টি হচ্ছে। এটাকে পিরিয়ডকালীন বিবেচনা করে সব পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলে অসহায় মানুষগুলোর কষ্ট অনেকটাই লাঘব হবে। আমাদের এখানে হওয়া বন্যাকে প্রায় সময়ই বলা হয়, আকস্মিক বন্যা। আর ঘন ঘন বন্যা হওয়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এটা মোটামুটি সবাই এখন জানি। বন্যা অনেকাংশেই বৃষ্টিপাতের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। আবার আমাদের এখানে সেটি হয় মৌসুমভিত্তিক। এজন্য বন্যা হবার আগাম খবর আমরা চাইলে আগেই জানতে ও জানাতে পারি। এজন্য আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর, আবহাওয়া অধিদফতর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা সংস্থা, কৃষি গবেষণা ইনস্টিউট এগুলোর সমন্বয়ে একটি কার্যকর পর্যবেক্ষণ সেল গঠন করতে হবে।

বন্যা কিন্তু আকস্মিক হয় না; জানাতে দেরি হয় বা জানানো হয় না বলেই আমাদের কাছে এটা আকস্মিক বন্যা হয়ে আসে। অথচ এর ওপর নজরদারি সংক্রান্ত অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান আছে। তারা হয়তো কাজও করছেন। সমন্বয়ের অভাব, কাজের দীর্ঘসূত্রিতা যে কোনো সমস্যাকে অনেক বাড়িয়ে দেয়। অথচ কার্যকর ভাবে সব পদক্ষেপ নিলে, বন্যার অনেক আগেই আমরা প্রস্তুতি নিতে পারি। আজকাল কয়েক দিন আগে সাবধানী বার্তা জানানো হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আমাদের বেশিরভাগ মানুষ সচেতন বা শিক্ষিত নয়। তাছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থাও সবখানে সমান নয়। বার্তাটি ঠিকভাবে পৌঁছাতে সময় লাগে। দুর্যোগের আগে পর্যাপ্ত সময় না পেলে হাওরপাড়ের একজন কৃষক তার ধান নিরাপদ জায়গায় নিতে পারেন না, তার গরু-ছাগল নিরাপদে কোথাও রাখার ব্যবস্থা করতে পারেন না। মোট কথা হলো, আবহাওয়া অধিদপ্তরসহ উপরে উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানগুলো আগে থেকেই দুর্যোগের খবর জানাতে কাজ করবে এবং দুই সপ্তাহ আগে সেটি এলাকায় জানিয়ে দেওয়া হবে।

বন্যার পানিতে প্লাবিত রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি

বন্যায় গো-খাদ্যের প্রচণ্ড অভাব দেখা দেয়। হাওরাঞ্চলে গবাদি-পশুর খাদ্য সংকট নিরসনে কমপক্ষে ছয় মাসের জন্য দানাদার খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বন্যা পরবর্তী পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে। বন্যার পানি কমে যাবার সাথে সাথে যাতে রোগ ব্যাধি ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে রাখতে হবে।  আমার মনে হয়, হাওর এলাকার দুর্গত মানুষের পাশে এখন দাঁড়াতে হবে সবাইকে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোর জরুরি ভিত্তিতে হাওর এলাকায় ত্রাণ কাজ পরিচালনা করা দরকার। দুর্গত এলাকায় উপযুক্ত পরিমাণে খাদ্য, জলপরিশোধনকারী ট্যাবলেট, পেটের পীড়ারোধের ওষুধ, খাবার স্যালাইন জরুরি ভিত্তিতে পাঠানো দরকার। পাশাপাশি গবাদি পশুর খাদ্যের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। হাওরের কৃষক বাঁচাতে এখন সরকারি পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ বিতরণ জরুরি। সেই সাথে স্থানীয় মহাজনদের হাত থেকে গরিব মানুষকে বাঁচানো প্রয়োজন। সেইসব এলাকায় কাজ করা এনজিওগুলোর এখন বাধ্যতামূলকভাবে ঋণ মওকুফ করতে হবে।

বন্যা কবলিত সুনামগঞ্জকে বাঁচাতে দরকার সবক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ। সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে, সাংগঠনিকভাবে বিভিন্ন দুর্যোগে সবচেয়ে যেটা জরুরি সেটি হলো ঐক্য। এই ঐক্য ধরে রেখে সবাই এক হয়ে দাঁড়াতে হবে দুর্গত হাওরবাসীর পাশে। হাওরবাসীর প্রত্যাশা, সরকার দ্রুত এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করে হাওরের কান্না থামানোর জন্য আরও কার্যকর ও উদ্যোগী ভূমিকা পালন করবে। যেকোনো দুর্যোগেই মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়, আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে অগণিত মানুষ। আর অসহায়দের সাহায্যে এগিয়ে আসা একটি মহৎ কাজ। যে কোনো দুর্যোগ মূহুর্তে প্রত্যেকের উচিত নিজ নিজ সাধ্যানুযায়ী সাহায্যের হাত প্রসারিত করা। মানুষ মানুষের জন্য এই নীতি প্রয়োগের উৎকৃষ্ট সময় এখন।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন