পানির বৃত্তে আবদ্ধ সিলেট। অঝোরে একটানা বৃষ্টিপাত আর উজানের ঢলে সম্প্রতি দ্বিতীয় দফায় ফের ভয়াবহ বন্যায় ডুবছে সিলেট অঞ্চল। সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চল ও সিলেটের বেশ কিছু উপজেলা পানিতে ডুবে আছে প্রায় তিন দিন ধরে। শুধু নিম্নাঞ্চল নয়, বৃহত্তর সিলেট শহরের প্রায় ৫০টির বেশি এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দী মানুষের জীবন বাঁচাতে সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ৩১টি আশ্রয় কেন্দ্রের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এ ছাড়া, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলদের উদ্যোগে বিশুদ্ধ খাবারের পানি ও শুকনো খাবার বিতরণ করে হচ্ছে। কিন্তু যত সময় গড়িয়ে যাচ্ছে, পানির গতি ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে বাধ্য হয়ে পানিবন্দী মানুষ বাসা-বাড়ি ছেড়ে স্বজনদের কাছে স্বরণাপন্ন হচ্ছেন নৌকাযোগে। আর কেউবা যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী যানমাল নিয়ে নিরাপদ আশ্রয় স্থলে ছুটে যাচ্ছেন আপনজনদের নিয়ে। এমন ভয়াবহ দুর্যোগের ক্লান্তিলগ্নে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও হিমশিম খাচ্ছে রীতিমতো। প্রয়োজনীয় খাবারের সংকটসহ বিদ্যুৎ-গ্যাস না থাকায় দুর্ভোগে পড়েছেন পানিবন্দী লাখো মানুষ।
এদিকে, শুক্রবার থেকে সিলেট ও সুনামগঞ্জ দুই জেলায় বন্যাকবলিত মানুষের উদ্ধার কাজে তৎপর হয়ে উঠেছে সেনাবাহিনীর ৮টি ইউনিট। সেনাবাহিনী প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সিলেটের তিনটি উপজেলায় ও হাওর অঞ্চলের সুনামগঞ্জের ৫টি উপজেলায় কাজ করে যাচ্ছে। পানিতে তলিয়ে আছে সিলেট কুমারগাঁও বিদ্যুৎ স্টেশন। বস্তা ভরা বালু দিয়ে বিদ্যুৎ স্টেশন সচল করতে একদল সেনাবাহিনী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে যাচ্ছেন।
বন্যা পরিস্থিতি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো হল- সিলেট সদর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানিগঞ্জ, জৈন্তাপুর, দক্ষিণসুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ এবং জকিগঞ্জ। এদিকে সুনামগঞ্জ জেলার উপজেলাগুলো হল-দিরাই, ছাতক, দোয়ারাবাজার ও জামালগঞ্জ।
আবহাওয়াবিদরা জানান, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে আসা উজানের ঢল না থামা পর্যন্ত সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। এই উজানের ঢলের ফলে সুরমা-কুশিয়ারাসহ বেশ কয়েকটি নদীর পানি ফুঁসে উঠেছে। ফলে সিলেটজুড়ে বন্যা ভয়ঙ্কর আকারে প্রসারিত হচ্ছে। বন্যা পরিস্থিতি আগামী ২৬ জুন পর্যন্ত চলমান থাকার সম্ভাবনা আছে ভারি বর্ষণের জন্য।
এই দুর্যোগ মুহূর্তে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খবরা-খবর নিয়ে যাচ্ছেন।সিলেটের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি বিবেচনায় বন্যার্ত মানুষের মাঝে নগদ ২০ লাখ টাকা ও ৮ হাজার ব্যাগ শুকনো খাবার বরাদ্দ দিয়েছে ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এছাড়া সাড়ে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গিয়েছে। ইতোমধ্যে বন্যার্তদের উদ্ধার তৎপরতায় মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনী।’ এসময় তিনি বন্যার্তদের সাহায্যার্থে খাবার প্রদান ও স্বেচ্ছাসেবীদের কাজ করার আহবান জানিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তর সিলেটের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী সংবাদ মাধ্যমকে জানান, জুন মাসে ৮১৮ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হওয়া সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু ১৬ তারিখ পর্যন্ত ৯৪ দশমিক ৮১ শতাংশ অর্থাৎ ৭৭৪ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই কারণে সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি আরও বেশি অবনতি হচ্ছে।
একই বিষয়ে সিলেট সেনানিবাসের জিওসি মেজর জেনারেল হামিদুল হক বলেন, ‘সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। তাই আমাদের জীবন দিয়ে হলেও এই মানুষগুলোর জন্য কাজ করবো, তাদের পাশে দাঁড়াবো।’
জিওসি বলেন, ‘আমরা ৮টি ব্যাটালিয়ান টিম গঠন করেছি। এখানে মেডিক্যাল টিম আছে। মেডিক্যাল টিমের তিনটি ব্যাটালিয়ান টিম রয়েছে। ৩টা ব্যাটালিয়ানের কিছু অংশ একসঙ্গে উন্নয়নে যাচ্ছে। আমাদের টিম কাজ করে দিয়েছে। ৫টা কাজ দিয়েছি তাদেরকে। প্রথম কাজ হচ্ছে বন্যায় দুর্গত ও পানিবন্দী মানুষকে উদ্ধার করা। দ্বিতীয়ত্ব তাদের বিভিন্ন নিরাপদ স্থানে এবং খাবার দাবারের ব্যবস্থা করা বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায়। ৩য় পানিবন্দি মানুষকে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া। যারা আহত ও পানিবন্দী হয়েছেন, তারা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত। এই সময় তাদের চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া। ৪র্থ স্পর্শকাতর বিষয় যেগুলো আছে, যেমন- খাবারের গোডাউন, পাওয়ার স্টেশন এগুলো হুমকির সম্মুখীন হয়েছে, সেগুলো রক্ষা করা।’
মেজর জেনারেল হামিদুল হক বলেন, ‘আমরা শুনেছি বিভিন্ন গোডাউনে পানি উঠার সম্ভাবনা রয়েছে। এগুলোকে যেকোনোভাবে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করা। কুমারগাঁও পাওয়ার স্টেশন রক্ষায় ইতোমধ্যে কাজ চলছে।’
