পরিবেশের ক্ষতি মানেই নিজের ক্ষতি

আপডেট : ০৮ জুন ২০১৯, ২১:৫৩

মানুষসহ জীব-জগতের প্রতিটি প্রাণীকে টিকে থাকার জন্য সুষ্ঠু সুন্দর পরিবেশের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু আমরা নানা কারণে পরিবেশের ক্ষতি সাধন করে জীব-জগতের জন্য বিপদ ডেকে আনছি।

সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের নানাবিধ সমস্যার মধ্যে প্রকৃতি যেন প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দেখা দিয়েছে। দেশে দেশে ঝড়, বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, তুষারপাত, খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কাছে মানুষ আজ অসহায়। প্রায় সাত কোটি মানুষ ভুগছে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায়, বন্যার জন্য হাজার হাজার মানুষ হয়ে পড়ছে আশ্রয়হীন, আক্রান্ত হচ্ছে মরণ ব্যাধি রোগে, সংকটে ভুগছে নিরাপদ সুপেয় পানির। বৈশ্বয়িক তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ার জন্য স্থায়ীভাবে আশ্রয়হীন হওয়ার ঝুঁকিতে আছে দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল একটি জনগোষ্ঠী।

গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১৭ শতাংশ সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যথাসময়ে বৃষ্টি না হওয়ার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি। দ্রুত শিল্পায়নের ফলে প্রতিবছর প্রায় সত্তর হাজার হেক্টর  আবাদি জমি হারাচ্ছে বাংলাদেশ। আর নদীভাঙনের ফলে আরো প্রায় দশ হাজার হেক্টর আবাদি জমি বিলীন হচ্ছে নদীগর্ভে। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার না করে শিল্পের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলার জন্য একদিকে যেমন দূষিত হচ্ছে মাটির উপরিভাগের পানি তেমনি বিপর্যস্ত হচ্ছে জলজ সম্পদ, ব্যাহত হচ্ছে নদীর উপর নির্ভরশীল এদেশের হাজার হাজার মানুষের জীবন ও জীবিকা। পরিবেশের বিরূপ আচরণের জন্য অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশও রয়েছে মারাত্মক ঝুঁকিতে। প্রতি বছরের বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, অসময়ে শীত, বর্ষা যেন তারই বহিঃপ্রকাশ। এই সমস্যাগুলো একদিক দিয়ে বিবেচনা করলে আমাদের নিজেরই সৃষ্টি। যে গাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে, জীব-জগতের প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ করে সেই গাছ ও বন উজাড় চলছে নির্বিশেষে। গ্রিনহাউজ প্রতিক্রিয়ার ফলে বায়ুমণ্ডলে বেড়েই চলছে মিথেন, নাইট্রোজেনের মতো ক্ষতিকারক গ্যাস।

এছাড়া বাতাসে ধুলিকণা যেখানে সর্বোচ্চ প্রতি ঘন মিটারে ১০০ মাইক্রোগ্রাম থাকা উচিত সেখানে কোথাও কোথাও ৪ গুণ বেশি এবং শহরে গাড়ির হর্ন, মাইক, বিয়ে, জন্মদিন ও কনসার্টের মাত্রাতিরিক্ত শব্দ ৪৫ ডেসিমেলের অনেক উপর হওয়ায় মানুষের শ্রবণশক্তি কমে যাচ্ছে। একটি দেশের মোট আয়তনের পঁচিশ ভাগ বনভূমি প্রয়োজন কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে মাত্র নয়ভাগ বনভূমি এবং দিন দিন বনভূমির পরিমাণ আরো কমছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য আমাদের দেশে ২২ শতাংশ বনভূমি দরকার আর সে লক্ষ্য অর্জনে সবচেয়ে কার্যকরি ভূমিকা রাখতে পারে সামাজিক বনায়ন। মাটি বর্জ্য ও পচনশীল দ্রব্য নিঃশেষ করে ফেলে কিন্তু সে মাটিও যেন আজ মানুষের ব্যবহার করা প্লাস্টিক ও পলিথিনের কাছে অসহায়, কমে যাচ্ছে তার ঊর্বরতা শক্তি। পরিবেশ রক্ষায় দেশে ২০০২ সাল থেকে পলিথিন ব্যবহার নিষেধ। মানুষের সচেতনতা ও এ আইনের আরো কার্যকরি প্রয়োগ করে পলিথিনের ক্ষতি থেকে আমাদের পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। মাত্রাতিরিক্ত পানি দূষণ নষ্ট করছে জলজ সম্পদ ও ছড়িয়ে পড়ছে নানাবিধ পানিবাহিত রোগ-বালাই। শিল্প-কারখানার বর্জ্য সরাসরি নদীতে না ফেলে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে উপরিভাগের পানি দূষণমুক্ত রাখা সম্ভব হবে না। উন্নত দেশগুলো তাদের অর্থনীতির ভিত মজবুত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোও সেই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের ফলে ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনছে ও ভবিষ্যত্ পৃথিবীকে নিয়ে যাচ্ছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। পরিবেশের ক্ষতি করার আগে আমাদের একটি নেটিভ আমেরিকান প্রবাদ মনে রাখা উচিত—

‘যখন শেষ গাছটি কেটে ফেলা হবে,

শেষ মাছটি খেয়ে ফেলা হবে,

শেষ জলধারা বিষাক্ত হবে,

তখন মানুষ বুঝতে পারবে টাকা খাওয়া যায় না’

পরিবেশের উপাদানগুলো কোনো একক ব্যক্তির দ্বারা দূষণমুক্ত রাখা সম্ভব না। মানব সভ্যতা টিকিয়ে রাখতে প্রতিটি মানুষকে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে, বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে, সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পরিবেশ রক্ষায় ঐকমত্যে আসতে হবে। হাতে হাত রেখে দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকারই হোক দেশে দেশে।  

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়