রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আশা পাহাড়ি ঢলে বেশ কয়েকটি নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। রবিবার সকালে কাচালং নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কারণে নদীর পানি উপচে প্রবল বেগে নিম্নাঞ্চলে প্রবেশ করায় এতে পৌরসভা, আমতলী, রূপকারী ও বঙ্গলতলী ইউনিয়নের আশপাশের প্রায় ১০টি এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে, মাছের ঘের ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অপরদিকে, চট্টগ্রামে পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাসকারী ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদে অভিযান শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। টানা বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে টেকনাফ ও রাঙ্গামাটির কাউখালীতেও। সেখানে পাহাড় ধসে প্রাণহানির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকাসমূহ থেকে ইত্তেফাকের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:
রাঙ্গামাটি: রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় এখনো ঢলের পানি প্রবল বেগে নিম্নাঞ্চলে প্রবেশ করা অব্যাহত আছে। প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। সদর বাজার প্লাবিত হয়ে অনেক দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি প্রবেশ করেছে। বাজারের রাস্তাসহ গ্রামীণ রাস্তাঘাট ঢলের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মানুষের দূর্ভোগ বেড়েছে। অনেক বাড়িঘরেও পানি প্রবেশ করেছে। বিভিন্ন এলাকার অনেক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম জানান, কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণে মারিশ্যা-দীঘিনালা সড়ক ও পাহাড়ি এলাকায় মাটি ধসের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তাই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ে বসবাসকারী স্থানীয়দের সতর্ক করে মাইকিং করে সকলকে নিরাপদ স্থানে বা আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগ মোকাবিলায় উপজেলার ১৪টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে পৌরসভার ১ নম্বর ওযার্ড মাষ্টারপাড়া, পুরান মারিশ্যা, মধ্যমপাড়ার লোকজন আশ্রয়কেন্দ্রে আসতে শুরু করেছে।
গত কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণের কারণে রাঙ্গামাটি শহরের বাণিজ্যিক এলাকার রিজার্ভ বাজারের প্রবেশের মূল সড়কে আবারও ভাঙ্গও দেখা দিয়েছে। এতে যে কোনো সময় বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিলে বন্ধ হয়ে যেতে পারে যোগাযোগব্যবস্থা। রিজার্ভ বাজার প্রবেশ মুখের ভাঙনকবলিত মূল সড়ক দিয়ে জেলা শহরের সঙ্গে ছয় উপজেলা যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। এই রিজার্ভ বাজার থেকে প্রতিদিন হাজারো মানুষ চলাচল করে এবং রিজার্ভ বাজারের লঞ্চঘাট থেকে ছয় উপজেলায় যাতায়াত করে থাকে। এবার টানা বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে সড়কের কার্পেটিংয়ের নিচ থেকে আবারও মাটি সরে আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। রিজার্ভ বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাস্তা ভেঙে যদি যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সাধারণ ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
এদিকে গত কয়েক দিনের অবিরাম ভারী বর্ষণে ডুবে গেছে কাপ্তাই চন্দ্রঘোনা ফেরিঘাটের পাটাতন। রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার রাইখালী ফেরিঘাট অংশে গিয়ে দেখা যায়, বেশ কিছু সিএনজি পার হতে গিয়ে পাটাতনে আটকে গেছে। তবে আটকে পড়া প্রতিটি সিএনজি ৫০ হতে ১০০ টাকার বিনিময়ে পার করে দিচ্ছেনঘাট এলাকার কিছু শ্রমিক।
একই দৃশ্য দেখা যায়, রাঙ্গুনিয়া উপজেলা অংশে ফেরিঘাট এলাকায়। এই অংশেও ফেরির পাটাতন ডুবে হালকা গাড়ি চলাচলে বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে চালক এবং যাত্রীদের।
খাগড়াছড়ি: খাগড়াছড়িতে টানা বর্ষণে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল সকালে খাগড়াছড়ি সদরের কলাবাগান এলাকায় বৃষ্টির সময় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। তবে এ সময় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, টানা বর্ষণে পাহাড় থেকে নামা ঢলের পানিতে বাড়ির টিন ও দেওয়ালে মাটি ভেঙে পড়ে। এ সময় বাড়ির দেওয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাহাড় ধসের পরপর বাড়ির লোকজনদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেয় রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকরা।
চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামে পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাসকারী ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদে অভিযান শুরু করেছেন জেলা প্রশাসন। গতকাল রবিবার পূর্ব ফিরোজশাহ ১ নম্বর ঝিল ও বিজয়নগর এলাকায় পাহাড়ে ১৮০টি অবৈধ ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের সিনিয়র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে এই অভিযান চালানো হয়। এ সময় র্যাব পুলিশ ও আনসার সদস্যরা সঙ্গে ছিলেন। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মনীষার নেতৃত্বে অপর একটি টিম অভিযানে সহযোগিতা করেন। জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সকাল থেকে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। অভিযানে অবৈধ বসতিতে বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা ও দখলমুক্ত এলাকায় কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে বৃক্ষ রোপণ করা হবে। পাহাড়ে অন্যান্য এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে।’ দুপুরে অভিযান চলাকালে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মমিনুর রহমান বলেন, যেখানে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হচ্ছে সেখানে পুনরায় কেউ দখলে নিয়ে স্থাপনা নির্মাণ করতে পারবে না।
কাউখালী (রাঙ্গামাটি): ২০১৭ সালের ভয়াবহ পাহাড় ধসে কাউখালী উপজেলার বিভিন্নস্থানে ২৩ জন মারা গেলেও এখনো পাহাড়ের পাশে কয়েক শ পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। গত কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণের কারণে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের অবস্হা আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এদিকে, টানা বর্ষণে ধসের আশঙ্কা থাকায় পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরতদের আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য কাউখালী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার মাইকিং করা হচ্ছে। এর পরও পাহাড়ের বাসিন্দারা বসতি ছাড়ছেন না। প্রবল ভারী বর্ষণের ফলে যে কোনো সময় ঘটে যেতে পারে যে কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
সূত্র জানায়, কাউখালী উপজেলার চারটি ইউনিয়ন বেতবুনিয়া, ফটিকছড়ি, ঘাগড়া, কলমপতি। এসব ইউনিয়নের প্রায় গ্রামগুলো ছোট বড় পাহাড়ে বা পাহাড়ের ঢালুতে এবং পাহাড়ের গা ঘেঁষে অবস্থিত। এসব পাহাড়ি গ্রামগুলোর বেশির ভাগ মানুষ খুবই সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত। কিন্তু এসব এলাকার মানুষের বসবাসের জন্য পাহাড়ের পাশে বা ছোট ছোট পাহাড়ের ওপর অথবা পাহাড়ের একদম গা ঘেঁষে বহু বছর ধরে বাড়িঘর বাগান সৃজন করে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করে আসছেন। প্রতি বর্ষায় অতি বর্ষণের ফলে এসব বসতিগুলোর কম বেশি বাড়িঘরের এবং জানমালের ক্ষতি সাধন হয়ে থাকে বলে জানা যায়।
টেকনাফ: কক্সবাজার টেকনাফে টানাবৃষ্টির কারণে পাহাড় ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে এ পর্যন্ত পাহাড় ধসের বিষয়ে প্রশাসন বা ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা করা হয়নি। গত কয়েক দিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টি হলেও শনি ও রবিবার টানা বর্ষণ চলছে। এই টানা বর্ষণের কারণে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের প্রাণহানির আশঙ্কাও রয়েছে। টেকনাফের বাহারছড়া, হোয়াইক্যং, হ্নীলা, টেকনাফ সদর, পৌরসভার পুরাতন পল্লানপাড়াসহ বেশ কিছু এলাকায় স্থানীয় ও রোহিঙ্গারা পাহাড়ে পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে।
