পণ্য আমদানিতে সক্রিয় জালিয়াত ও চোরাচালানিরা

আপডেট : ০৮ জুন ২০১৯, ২২:২২

চট্টগ্রাম কাস্টমসের মাধ্যমে পণ্য আমদানিতে জালিয়াত ও চোরাচালানি চক্র সক্রিয় রয়েছে। মিথ্যা ঘোষণায় মূল্যবান পণ্য এনে সরকারের যেমন কোটি কোটি টাকা ফাঁকি দিচ্ছে একইভাবে কম মূল্যের পণ্য বেশি দেখিয়ে কিংবা নির্দিষ্ট পণ্য না এনে বালি, মাটি, পাথর কিংবা কোনো পণ্যই না এনে কোটি কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার করছে।

এ ধরনের অনেক ঘটনা ঘটলেও কাস্টমস কর্তৃক এ পর্যন্ত মানি লন্ডারিংয়ের কোনো মামলা হতে দেখা যায়নি। চট্টগ্রাম কাস্টমসের গত কয়েক মাসের পরিসংখ্যানে কাস্টমস কর্তৃক পণ্য আটক, মামলা ও জরিমানার পরিমাণ থেকে জালিয়াত, মাফিয়া এবং চোরাচালান চক্রের কর্মকাণ্ড ফুটে উঠে।

কাস্টমস ও সিএন্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি পণ্যের প্রতিটি চালানের ক্ষেত্রে কঠোর নজর দেওয়ায় বেশকিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। গত চার মাসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ন্যূনতম পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির কারণে প্রায় ১০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত শুল্ক আদায় হয়েছে। এদের থেকে জরিমানা আদায় হয়েছে আরো প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম কাস্টমসের কঠোর অবস্থানের সংবাদে কয়েকটি চিহ্নিত পণ্যের খালাস মোংলা, ঢাকা আইসিডি কিংবা পানগাঁও টার্মিনালে স্থানান্তর করা হয়েছে। এমনকি অনেক অসাধু আমদানিকারকের পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছালেও খালাস করা নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বলে জানা যায়।  চট্টগ্রাম বন্দরে আসা এ ধরনের তিন শতাধিক কন্টেইনারের দিকে সবার নজর। গত প্রায় চার মাস পূর্বে এ সব কন্টেইনারে আসা আমদানি পণ্যের খালাস নেওয়ার কোনো      উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। খালাস প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পণ্যসমূহের জন্য বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়নি। কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, শিল্প পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে বেশকিছু কন্টেইনারের ঘোষণা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে এর ভেতরে দামি এবং আমদানি নিষিদ্ধ পণ্য রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সূত্রে জানা যায়, গত প্রায় চার মাস পূর্বে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা পণ্য ভর্তি কন্টেইনারের একাধিক চালানের খালাসের জন্য বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হলে মিথ্যা ঘোষণার পণ্য পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে কন্টেইনারে পাওয়া পণ্যের নতুন শুল্ক ছাড়াও ৮০ থেকে ১০০ ভাগ জরিমানা করা হয়। এরপর থেকে বিপুলসংখ্যক কন্টেইনার বন্দরে কয়েক মাস ধরে পড়ে থাকলেও খালাস করা হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

গত জানুয়ারিতে চট্টগ্রাম কাস্টমসে নতুন কমিশনার নিয়োগ পাওয়ার পর এক নির্দেশনা প্রদান করেন। তার নির্দেশনায় বলা হয়, মিথ্যা ঘোষণার ব্যাপারে পূর্ব থেকে কেউ স্বীকার করে আবেদন করলে জরিমানা কম নেওয়া হবে। কিন্তু স্বীকার না করলে ধরা পড়ার পর দুইশত ভাগ পর্যন্ত জরিমানা করা হবে। তার এই নির্দেশনায় সাড়া দিয়ে অনেকে আবেদন করলেও অনেকেই তাতে সাড়া দেয়নি বলে জানা যায়। ধারণা করা হচ্ছে তাদের মধ্যে বিপুলসংখ্যকের তিন শতাধিক কন্টেইনার খালাস করা হচ্ছে না।

বন্ডের মাধ্যমে বিনা শুল্কে কাঁচামাল এনে কোনো পণ্যই রপ্তানি না করে কিংবা আংশিক তৈরি করে রপ্তানি দেখানো হয়। আবার দেখা যায়, বেশি মূল্যের কাপড় এনে কম মূল্যের কাপড় দিয়ে পণ্য তৈরি করে সমপরিমাণ কাপড় রপ্তানি দেখানো হয়। বাস্তবে পরিমাণগত রপ্তানি ঠিক থাকলেও মূল্যের ক্ষেত্রে বিরাট অনিয়ম পাওয়া যায়। আবার বন্ডের লাইসেন্স অনুযায়ী তার প্রাপ্যতার চেয়ে বেশি দেখিয়ে কাগজ জালিয়াতির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে আমদানির তথ্য উদ্ঘাটিত হয়। আবার বিজিএমইএ কিংবা বিকেএমইএ থেকে কাপড়ের ব্যবহার সংক্রান্ত যে ইউডি দেওয়া হয় তাতেও অনেক ক্ষেত্রে অনিয়ম দেখা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বন্ডের অধীনে কাঁচামাল হিসেবে আসা গার্মেন্টসের কাপড় কিংবা এক্সেসরিজ সামগ্রীর ক্ষেত্রে মূল তদারকি সংস্থা বন্ড কমিশনারেট অফিস। সাধারণত তারাই বন্ডের অধীনে আসা পণ্য সামগ্রীর রপ্তানি বা মজুদ বিষয়ে সার্বক্ষণিক খোঁজ-খবর নিয়ে থাকেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ডের অধীনে আসা পণ্যের ব্যাপারে ব্যাপক তদারকি শুরু করে। বন্ড প্রতিষ্ঠানের পূর্বের আমদানি ও রপ্তানি এবং মালের মজুদ বিষয়ে বিপুলসংখ্যকের অনিয়ম ধরা পড়ে। অসাধু অনেক বন্ড প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্যতা, মজুদ, আমদানি ও রপ্তানির মধ্যে ব্যাপক গরমিলের কারণে তাদের আমদানি পণ্য আটকে দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম কাস্টমসের পক্ষ থেকে এ নিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য বন্ড কমিশনারেট অফিসে অভিযোগও দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম কাস্টমসের মাধ্যমে দেশের সিংহভাগ পণ্য আমদানি হয়ে থাকে। এদের মধ্যে বিপিশীট-জিপিশীট, ক্যাপিটাল মেশিনারিজের নামে ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী, কাপড়সহ আমদানি নিষিদ্ধ পণ্য, কাপড়ের ঘোষণা দিয়ে সোফার কাপড় নিয়ে আসার প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া এক পণ্যের ঘোষণায় অন্য পণ্য আমদানির অহরহ ঘটনা ঘটছে চট্টগ্রাম কাস্টমসে।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের কঠোর ভূমিকার কারণে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি শতকরা প্রায় ৩৭ ভাগ কমে গেছে। চট্টগ্রাম কাস্টমসের শুল্ক আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা চলতি অর্থবছরের এই পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে আছে বলে জানা যায়।