২০১২ সালের ২৯ জুন দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু ঋণচুক্তি বাতিল করে দেওয়ায় বাংলাদেশের তীব্র ভাবমূর্তি সংকটে পড়ে দেশ। সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু করার ঘোষণা দিলে দেশের অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ, সমাজবিদ, রাষ্ট্রচিন্তক, রাজনীতিবিদ সন্দেহ-সংশয়-বিদ্রূপ করছিল। এরপর ঐ বছরের ১৯ জুলাই বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ব্যানারে আমি ‘নিজ অর্থে পদ্মা সেতু’ গবেষণা ও বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরি, যা জাতিকে যথেষ্ট আশান্বিত করেছিল। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় না থাকলে এ সেতু করা সম্ভব হতো না।
২০১২ সালে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু নিয়ে এসব ঘটনা ঘটিয়েছে কারণ তারা চায়নি শেখ হাসিনা ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসুক। তাদের সরকার পরিবর্তনের কার্যকলাপ দীর্ঘ মেয়াদে কাজ করে। পদ্মা সেতু এখন বিশ্বনন্দিত ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ উন্নয়ন মডেল। ২০১২ সালে আমরা হিসাব করে দেখিয়েছি সরকার যে রাজস্ব আদায় করছে তার চেয়েও ৯৮ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা বাড়তি আদায় করা সম্ভব। সে সময়ে পদ্মা সেতুর জন্য প্রয়োজন ছিল ২৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ আরো মেগা প্রকল্পে বাড়তি অর্থায়ন সম্ভব। এখন অর্থনীতির আকার আরো বেড়েছে। আমরা আমাদের সম্পদ সম্পর্কে অবগত নই। সরকার ৬ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে। আমরা বিকল্প বাজেট প্রস্তাবে দেখিয়েছি বাজেটের আকার ২০ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা করা সম্ভব।
এটা ঠিক যে পদ্মা সেতু দেশের জিডিপির আকার বাড়াবে। অনেকেই অনেক শতাংশের কথা বলছেন। তবে আমি মনে করি, এর ফলে অনেক সুযোগ বাড়বে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে। ২১ জেলার অর্থনীতির গতি বাড়বে। সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বাড়বে। ঐ অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যগত উন্নতি হবে, শিক্ষার উন্নতি হবে। সামাজিক সাংস্কৃতিক সব ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসবে। এই ২১ জেলায় তেমন কোনো শিল্পায়ন নেই। কিন্তু গত তিন বছরে ব্যাংকগুলোতে যে বিনিয়োগ প্রস্তাব, তাতে দেখা যায় বড় অংশ এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে। ঐ অঞ্চল উন্নয়নের নতুন হাবে পরিণত হবে। তবে এই কাজ এক দিনে হবে না।’ তিনি বলেন, পদ্মা সেতুর প্রভাবে ২০২৭ সালে দেশের জিডিপির আকার ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। সেই সঙ্গে ঐ ২১ জেলার জিডিপি কমপক্ষে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিশ্রুত ঋণচুক্তি বাতিলের কারণে পদ্মা সেতু নির্মাণ দেরি ও ব্যয় বেশি হওয়ার জন্য বাংলাদেশকে সংস্হাটির ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত। বিশ্বব্যাংক কথিত দুর্নীতির অভিযোগে পদ্মা সেতুর বরাদ্দ বাতিল করেছিল। তারা বাংলাদেশকে নতজানু করে রাখতে প্রতিশ্রুত ঋণচুক্তি বাতিল করেছিল। এখন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।
‘নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু’ নির্মাণকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার অনন্য অর্জনের জন্য সেতু উদ্বোধনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহস ও প্রজ্ঞায় লালিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানাচ্ছে। বাংলাদেশকে আরো একবার বিজয়ের আনন্দ এনে দিয়েছে।
লেখক :ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগ ও জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির চার বারের নির্বাচিত সভাপতি
