শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নারায়ণগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে পানি বাড়ছে 

আপডেট : ২৭ জুন ২০২২, ১৩:৪২

গণমাধ্যমে বন্যার পূর্বাভাস শুনে নারায়ণগঞ্জ জেলার মানুষ কিছুটা আতঙ্ক নিয়েই দিন কাটাচ্ছেন। বন্যা আতঙ্কের অন্যতম অনুষঙ্গ ভারী বর্ষণ। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার পাশাপাশি নিম্নাঞ্চলের পানি বাড়ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। 

এদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্রমতে, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ জেলার নদ-নদীর পানি এখনো বিপদসীমার অনেক নিচ দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছে। কাশীপুর ইউনিয়ন পরিষদের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কাশীপুর খাল। 

চরনরসিংপুরের বাসিন্দা মঞ্জিল মিয়ার বেগুন ও ঢেঁড়সের ক্ষেত ডুবে গেছে। তিনি অপরিপক্ক বেগুন ও ঢেঁড়সসহ গাছগুলো তুলে নিয়েছেন। পুঁই শাক এবং মরিচ ক্ষেতেও পানি ছুঁই ছুঁই করছে। 

মঞ্জিল মিয়া বলেন, ‘মাত্র অর্ধেক টাকা উঠছে। বেগুন ও ঢেঁড়সে লাভ অইতো। পানির কারণে লোকসান গুণলাম। পানির রঙ ঘোলাটে। মনে অয় এইবার বন্যা অইবো। টিভিতে খবরে দেখলাম মুন্সীগঞ্জেও বন্যা অইতে পারে। এহানে অইলে আমরা নারায়ণগঞ্জের মানুষ আর কয়দিন বাদ থাকমু।’ 

কদমআলী স্কুল সংলগ্ন গুদারাঘাট দিয়ে গরুর দুধ নিয়ে যাচ্ছিলেন বক্তাবলীর কানাইনগর গ্রামের লালু শেখ। সেখানকার পানির অবস্থা কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পানি তো আল্লাহর রহমতে বাড়তাছে। আমার সবজি ক্ষেত থেকে পানি এখনো দুই তিন হাত দূরে আছে। এভাবে পানি বাড়তে থাকলে ক্ষেতে পানি উঠবো। লাউ ক্ষেত গেছে। কম দামে লাউ বিক্রি কইরা দিছি। দেখি সবজি ক্ষেতের কী অবস্থা। পানি উঠলে সব তুইল্লা হালামু।’ 

লালু শেখ জানান, কুড়েরপাড় এলাকায় তার বোনের বাড়ির পেছনে সবজি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। জানা গেছে, ধলেশ্বরীর পাশাপাশি শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। ফলে আলীরটেক, বক্তাবলী, কুড়েরপাড়, কানাইনগর, মোক্তারপুর, চর সৈয়দপুর, গোপচর, গোগনগর, কাশীপুর হাটখোলা, নরসিংপুর, এনায়েতনগর, ভোলাইল গেদ্দারবাজার, হাজীপাড়া, জেলেপাড়া, মাসদাইর, মরাখাল এলাকা,  চর নবীনগর, ধর্মগঞ্জের নিচু এলাকায় পানি বাড়তে শুরু করেছে। পথ তলিয়ে যাওয়ায় কোথাও কোথাও নৌকা চলছে। 

গোপচর, সৈয়দপুর, মোক্তারপুর ও শহীদনগরের লোকজন জানান, এসব এলাকায় পানি বাড়ছে। সেসঙ্গে বৃষ্টি হওয়ায় জলাবদ্ধতায় বাড়ছে মানুষের দুর্ভোগ। এলাকার কৃষক পরিবারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অসময়ে নদীর পানিতে সবজির ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় অনেকে কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না। গবাদি পশু নিয়েও রয়েছে আরেক যন্ত্রণা। মাঠ-ঘাট তলিয়ে যাওয়ায় গবাদি পশুর খাবার সংকট দেখা দিতে পারে। গো-খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে কৃষকরা অসহায় হয়ে পড়েছেন। 

এদিকে, শহরতলীর বাংলাবাজার, আমবাগান, পশ্চিম দেওভোগ মাদরাসার শেষমাথা এলাকার লোকজন বলেন, আমাদের এলাকার খালইতো শুকিয়ে গেছে। নদ-নদীর পানি বাড়তে থাকলে তো বাড়িঘরে পানি উঠে যাবে। নাসিক মেয়র ডা. আইভী বাবুরাইল লেক প্রকল্প করায় আমাদের কাশীপুর বোট খাল রক্ষা পেলো। নইলে খালটি পুরোপুরি অস্তিত্ব হারাতে বসেছিল। খালটি রক্ষা পেলেও এই খালের সঙ্গে তিনটি শাখা রয়েছে। যেগুলোর অস্তিত্ব কোথাও নালা আবার কোথাও নর্দমায় পরিণত হয়েছে। কোথাও কোথাও দালানকোঠা গড়ে তোলা হয়েছে ঠিক খালের উপর। 

সরকারি দলের পান্ডারা খালপাড় দখল করে বিক্রি করে দিয়েছে অন্য জেলা থেকে বসতি করতে আসা লোকের কাছে। এভাবেই তিনটি শাখা খালের মৃত্যু হয়েছে। ২০০৪ সালের বন্যাতেও খাল তিনটিতে পানি ছিল। কষ্ট করে নৌকা চলতো। এরপর সরকারি দলের পান্ডারা এলাকার পরিবেশই বদলে দিয়েছে। খাল তিনটি বাংলাবাজার, আমবাগান ও বাবুরাইলের শেষমাথা এলাকায় অবস্থিত। নদনদীর পানি বৃদ্ধি পেলে বন্যা হলে এই এলাকায় ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। ময়লা-আবর্জনায় এলাকা তলিয়ে যাবে। কেননা অধিকাংশ বাড়িঘরের স্যুয়ারেজ লাইনের পাইপের লাইন ওই তিনটি খালে দেওয়া। সব ময়লা-আবর্জনা খালে পড়ে। তাছাড়া আছে পলিথিনের জঞ্জাল। 

এলাকার বাসিন্দারা জানান, ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে খালে বন্যার পানি ঢুকলে প্রথমে ময়লা-আবর্জনা ফুলেফেঁপে উঠবে। এরপর সেগুলো খালপাড়ের বাড়িঘরে ঢুকবে। এমনটা হলে নরকের পরিস্থিতি তৈরি হবে। মানুষ আক্রান্ত হতে পারে নানা রোগ বালাইয়ে। তাই বন্যার আশঙ্কায় সবার মনে কাঁটা বিঁধে আছে। 

জানা গেছে, পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শীতলক্ষ্যা নদী তীরবর্তী নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হয়েছে। শহরের সেন্ট্রাল খেয়াঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ঘাটের এখনও দুটি সিঁড়ি ছাড়া বাকি সবই পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়াও, বন্দর রূপালী এলাকায় তীরের কাছাকাছি চলে এসেছে পানি। ৫ নম্বর খেয়াঘাট দীর্ঘদিন ধরে নিচে থাকলেও এখন সেটাও ওপরে নিয়ে এসেছে। 

সেন্ট্রাল খেয়াঘাটের মাঝি খলিলুর রহমান বলেন, ‘যেভাবে নদীর পানি বাড়ছে, এমনভাবে আরও এক সপ্তাহ পানি বাড়লে শহরে পানি ঢুকে যাবে। তা-ছাড়া নদীর পানি না কমলে আর এরমধ্যে বৃষ্টি হলে শহর পানিতে তলিয়ে যাবে। কারণ এখনই নদীর পানির সঙ্গে ড্রেনের মুখগুলো সমান হয়ে গেছে। এতে করে শহরের পানিগুলো নদীতে নামতে পারবে না। তখনই শহরে জলাবদ্ধতা দেখা দিবে।’ 

এদিকে, পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূইয়ার সতর্কবার্তাটি জেলায় সচেতনতা সৃষ্টি করেছে। তার বার্তা অনুযায়ী দেশের উত্তর থেকে মধ্যাঞ্চলে একটি স্বাভাবিক বন্যা আসতে যাচ্ছে। সাধারণত জুলাইয়ের প্রথম থেকে দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে বন্যা হয়। এবারও সেটি আসতে যাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে এটি এক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হবে না। তবে বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভর করবে বন্যার স্থায়িত্ব কত দিন হবে। 

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, উত্তর-মধ্যাঞ্চল, মধ্যাঞ্চলের ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও পদ্মা অববাহিকার লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, পাবনা, নওগাঁ ও নাটোর জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যার শঙ্কা রয়েছে। উত্তর পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে ভারী বর্ষণ হলে আকস্মিক বন্যা হতে পারে।

ইত্তেফাক/মাহি