সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

জিতুর ‘দাদাগিরিতে’ অতিষ্ঠ ছিল এলাকাবাসী

আপডেট : ২৯ জুন ২০২২, ২১:০৮

সাভার উপজেলার আশুলিয়ার চিত্রশাইল এলাকায় হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন উৎপল কুমার সরকার। গত ১০ বছর যাবত তিনি এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছেন। একইসঙ্গে তিনি প্রতিষ্ঠানটির শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি ছিলেন। এ পদে থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন আচরণের জন্য শাসন ও নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা দিতেন। আর এ শাসনই কাল হয়ে দাঁড়ায় তার জীবনে।

প্রতিষ্ঠানের দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র আশরাফুল আহসান জিতু (১৬)। সে এলাকার প্রভাবশালী উজ্জ্বল হাজীর পুত্র এবং প্রতিষ্ঠানটির দাতা হাজী ইউনুস আলীর সম্পর্কে নাতি। তাই দাদার নামে স্কুলে চলতো জিতুর দাদাগিরি। জিতু তার পারিবারিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক প্রতিপত্তির জন্য ছিল বেপরোয়া। এলাকায় গড়ে তুলে নিজস্ব বাহিনী।অল্প বয়সেই সে এলাকায় ‘দাদা’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ফিল্মি স্টাইলে দলবল নিয়ে সে পুরো এলাকা চষে বেড়াতো।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার একাধিক ব্যক্তি বলেন, আশুলিয়ায় অঞ্চলটি মূলত শিল্পনগরীতে পরিণত হয়েছে। এলাকায় অধিকাংশই বহিরাগত। সর্বদাই স্থানীয়দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। আর জিতুর পরিবারের প্রচুর জায়গা জমি থাকায় সেখানে শ্রমিকদের কলোনি রয়েছে। হোটেল ব্যবসা ও কলোনি থেকে মাসে মোটা অঙ্কের টাকা পেয়ে থাকেন জিতুর বাবা। তাই অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ ছিল তার পরিবারে।

আশরাফুল আহসান জিতু অল্প বয়সেই নষ্ট হয়ে যায়। প্রথমে সে মাদরাসায় পড়াশুনা করতো। ৯ম শ্রেণিতে তাকে হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি করা হয়। এরপর থেকে স্কুল-কলেজগামী মেয়েদের প্রেম নিবেদন, মাদক সেবন ও আড্ডাবাজি করে বেড়ানোই ছিল তার নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। এমনকি রাতেও স্কুলের সামনে দলবেঁধে সে আড্ডা দিতো। অতিষ্ঠ করে তুলেছিল এলাকার পরিবেশ। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ সাইফুল হাসান এ বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

হাজী ইউনুস আলী স্কুল ও কলেজের একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, ‘সে একজন বখাটে প্রকৃতির ছাত্র। উচ্ছৃঙ্খল আচরণ, মেয়েদের উত্ত্যক্ত ও বেয়াদবির জন্য কয়েকদিন আগেও শিক্ষক উৎপল কুমার সরকার তাকে শাসিয়ে ছিলেন। আর এ শাসন করাটাই কাল হলো তার জীবনে। জিতু এতটাই উচ্ছৃঙ্খল ছিল যে, কেউ তার কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করতে সাহস পেতেন না। তার ছিল ৩০/৪০ জনের একটি কিশোর গ্যাং। বয়সে ছোট হলেও গ্রুপ টিকিয়ে রাখার কৌশল ছিল তার। এলাকায় পারিবারিক প্রভাব ও নিজের বাহিনীর প্রতাপে কাউকে পরোয়া করতো না সে। জিতুর সন্ত্রাসী ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়টি নিয়ে স্কুলে ইতোপূর্বে বেশ কয়েক দফা বসা হলেও কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। কারণ হিসেবে জানা যায়, স্কুলের পরিচালক মো. সুমন জিতুর বাবা উজ্জ্বল হাজীর মামাতো ভাই। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা জিতুর আত্মীয় থাকার সুবাদে সবাই ওর কর্মকাণ্ডকে নীরবে মেনে নিত।’

স্কুলের সমাজ কল্যাণ বিষয়ের প্রভাষক সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জিতু এমনিতেই বখাটে স্বভাবের। সে ছাত্র হিসেবেও বেশি ভালো না। এ ছাড়া, নিয়মিত স্কুলে আসতো না। ছাত্র হিসেবে খারাপ হলেও সে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করতো। স্কুলের নিয়ম-কানুনও মানতো না। এসব নিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ অনেকবার বিচারে বসেছিল। উৎপল কুমারসহ তারা অনেকভাবে জিতুকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে। এমনকি জিতুর অভিভাবককেও বলেছেন কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি।’ 

জিতুর উচ্ছৃঙ্খল আচরণের ব্যাপারে তার অভিভাবকদের জানালে শিক্ষক উৎপল কুমারের ওপর দারুণভাবে ক্ষিপ্ত হয় সে। ঘটনার কয়েক দিন আগেও ওই শিক্ষকের সঙ্গে প্রকাশ্যে বেয়াদবি করেছিল বলে স্কুল সূত্রে জানা গেছে। ঘটনার দিনও জিতুকে খেলার মাঠে না আসার জন্য নিষেধ করেছিল শিক্ষক উৎপল। এতে জিতু আরও ক্ষিপ্ত হয়ে খেলার মাঠে এসে ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প নিয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে পিছন থেকে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। উপর্যপুরি আঘাতে উৎপল সরকার মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

অভিযোগ উঠেছে, জিতু এতটাই ক্ষমতাবান ও দুর্ধর্ষ প্রকৃতির ছিল যে, অন্য শিক্ষকদের সামনে ঘটনাটি ঘটলেও কেউ তাকে আটকায়নি। বরং ভয়ে অনেকেই তাকে সরে যেতে সহায়তা করেছে। তাই প্রশ্ন উঠেছে- এত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মাঝখান থেকে জিতু এত বড় অপরাধ করে কিভাবে পালিয়ে গেলো! এদিকে, শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে আশুলিয়া থানা পুলিশের তেমন তৎপরতা ছিল না বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।

এলাকার বাসিন্দা তাজুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষককে মেরে হাসপাতালে পাঠানোর পরও জিতু তার কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে স্কুলের সামনে ঘোরাঘুরি করেছিল। সে মূলত কাউকে পরোয়া করতো না।’ 

হাজি ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সাইম ইসলাম বলেন, ‘জিতুর সঙ্গে একটি মেয়ের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। স্যার সেই মেয়ের বাসায় ফোন করে শক্তভাবে বিচার দিয়েছিলেন যেন মেয়েটা জিতুর সঙ্গে না মেশে। এটার ক্ষোভ থেকেই জিতু স্যারকে খেলার দিন পিটিয়েছে।’ 

কলেজের আইসিটি বিভাগের শিক্ষক মনির হোসেন বলেন, ‘জিতু দশম শ্রেণিতে পড়লেও তার বয়স ছিল ১৯। সে ক্লাস নাইনে আমাদের এখানে ভর্তি হয়েছিল। এর আগে সাভারের রাজফুলবাড়িয়া এলাকার একটা মাদরাসায় পড়তো। সে ছাত্র হিসেবে খুবই দুর্বল প্রকৃতির। উচ্ছৃঙ্খলও। তার অভিযোগ স্কুলের নথিতে উল্লেখ আছে, সন্দেহভাজন জিতুর বয়স ১৯, তবে মামলার এজাহারে বলা হয়েছে ১৬। বিষয়টি নিয়ে সারা দেশে তোলপাড়ের মধ্যেও যে স্ট্যাম্প দিয়ে শিক্ষক উৎপলকে পেটানো হয়েছে, সেটি জব্দ করা হয়েছে তিন দিন পর।’ 

কলেজের অধ্যক্ষ সাইফুল হাসান বলেন, ‘যেখানে উৎপলকে পেটানো হয়েছে, সেই জায়গাটি কলেজের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার আওতাধীন বলে জিতু ঘটনার আগে আগে মেইন সুইচ বন্ধ করেছিল, যেন কোনো কিছু ক্যামেরায় রেকর্ড না হয়। সেদিন আমরা হঠাৎ করে দেখি কারেন্ট চলে গেছে। কিন্তু তখন আশেপাশে সব জায়গায় কারেন্ট ছিল। ঘটনার পরপর আমরা বুঝতে পারি, জিতু পরিকল্পিতভাবেই বিদ্যুতের মেইন সুইচ বন্ধ করে রেখেছিল।’ 

এছাড়া জিতুর প্রকৃত বয়সের বিষয়ে জানতে চাইলে সাংবাদিকদের একটি নথি সরবরাহ করেন অধ্যক্ষ। যেখানে আশরাফুল ইসলাম জিতুর বাবা মো. উজ্জ্বল, মা জুলেখা বেগম ও তার জন্ম তারিখ ১৭ জানুয়ারি ২০০৩ সাল উল্লেখ রয়েছে। সে হিসাবে জিতুর বয়স ১৯ বছর।

স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের সদস্য সচিব শাহজাহান আলম সাজু বলেন, ‘শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। দ্রুত হত্যাকারীকে গ্রেফতারপূর্বক সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে।’

আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুজ্জামান বলেন, ‘হত্যাকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অপরাধী অপরাধীই। সে যত শক্তিশালীই হোক না কেন, অন্যায় করলে কেউ ছাড় পাবে না।’

ইত্তেফাক/মাহি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

শিক্ষক খাইরুনকে লাথি মেরে বাইরে চলে যান মামুন: পুলিশ

শোক দিবসের অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ

তালাবদ্ধ বাথরুম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রীর লাশ উদ্ধার 

সিরাজগঞ্জে প্রাথমিকের ১৭৯ শিক্ষকের পদ শূন্য, পাঠদান ব্যাহত 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বেনাপোল-পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি বন্ধ

নাজিরপুরে পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ

রাজশাহীর শিরোইল থেকে সরানো হচ্ছে বাসস্ট্যান্ড

শিক্ষিকার ‘রহস্যজনক মৃত্যু’: স্বামী মামুনকে আদালতে পাঠানো হচ্ছে