ইসলামে কোরবানির বিধান

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২২, ০৮:৪৯

বছর পরিক্রমায় আবারও পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ সমাগত। কোরবানি একটি আরবি শব্দ, যা ‘কুরবুন’ থেকে উৎকলিত। কুরবুন শব্দের অর্থ হলো নিকটবর্তী হওয়া, ত্যাগ বা বিসর্জন দেওয়া ইত্যাদি। আর শরিয়তের পরিভাষায়, কোরবানি হচ্ছে—নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জন্তুকে শরিয়াসম্মত পন্থায় মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জবেহ করা। কোরবানির বিধান শুধু উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য অবধারিত হয়েছে বিষয়টি এমন নয়; বরং এটি অতি প্রাচীন একটি বিধান। আদি পিতা সাইয়্যিদুনা হজরত আদম (আ.) এর যুগ থেকে কোরবানির এই প্রথা চলে আসছে।

হযরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র ছিল। একজনের নাম হাবিল ও অন্যজনের নাম কাবিল। তখনকার সময়ে হজরত আদম ও হাওয়া (আ.)-এর ঔরসজাত সন্তান প্রতি বছর দুই জন করে জন্মগ্রহণ করত; একজন ছেলে ও অন্যজন মেয়ে। সেক্ষেত্রে সহজাত সহোদরা ভাইবোনের মধ্যে বিবাহ হারাম ছিল। পক্ষান্তরে এক বছরের সন্তানের সঙ্গে পরবর্তী বছরের সন্তানের বিবাহ বৈধ রাখা হয়েছিল। কেননা তখন পৃথিবীতে অন্য কোনো মানুষের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল না।

ঘটনাক্রমে হাবিলের সহোদরা বোন ছিল কদাকার। আর কাবিলের বোন দেখতে অনিন্দ্য সুন্দরী। তাই কাবিল তদানীন্তন সময়কার শরিয়া আইন লঙ্ঘন করে আপন সহোদরা বোনকে বিয়ে করতে চাইলে সত্য ও মিথ্যার মাঝে পার্থক্য স্পষ্ট করে দেওয়ার জন্য সাইয়্যিদুনা হজরত আদম (আ.) তাদেরকে কোরবানি দিতে বললেন। যার কোরবানি আল্লাহ কর্তৃক গৃহীত হবে, সে সত্যের ওপর আছে বলে প্রমাণিত হবে। এদিকে হাবিলের পেশা ছিল কৃষিকাজ আর কাবিলের পেশা ছিল পশুপালন। সে হিসেবে হাবিল তার জমিতে উৎপাদিত কিছু শস্য কোরবানির উদ্দেশ্যে পাহাড়ের ওপরে রেখে আসেন আর কাবিল তার গৃহপালিত একটি পশু কোরবানি হিসেবে পেশ করে।

তখনকার সময়ে নিয়ম ছিল আল্লাহ কর্তৃক আসমান থেকে আগুন এসে গৃহীত কোরবানির বস্তুকে জ্বালিয়ে দিয়ে যেত, সেই মতে কিছু সময় পর হাবিলের কোরবানিকে আগুন এসে জ্বালিয়ে দিয়ে যায় আর কাবিলের উৎসর্গীকৃত প্রাণী পাহাড়ের ওপর বৃথাই পড়ে থাকে। কাবিলের কোরবানি কবুল না হওয়ায় সে আরও অধিক ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল এবং হাবিলকে শেষপর্যন্ত হত্যা করল, যা মানবেতিহাসের প্রথম হত্যাকাণ্ড। সুরা মায়েদার ২৭-৩১ নম্বর আয়াতে এর বিশদ বর্ণনা রয়েছে। একই সঙ্গে এটাই ছিল মানব ইতিহাসের সর্বপ্রথম কোরবানি। তবে উম্মতে মুহাম্মদির কোরবানির সম্পর্ক সেই কোরবানির সঙ্গে নয়; বরং উম্মতে মুহাম্মদির কোরবানির বিধান এসেছে ইবরাহিমি ত্যাগের স্মারক হিসেবে। হজরত ইবরাহিম (আ.) তার জীবনের সিংহভাগ কাটিয়ে দিয়েছিলেন নিঃসন্তান অবস্থায়। ৮৬ বছর বয়সে একদিন তিনি মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একটি নেককার পুত্র দিন।’ (সুরা ছফফাত: আয়াত ১০০) অতঃপর দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরা (আ.) এর গর্ভেই হযরত ইবরাহিম (আ.) এর প্রথম সন্তান ইসমাইল জন্মগ্রহণ করেন। ইসমাইল (আ.)-এর বয়স যখন ১৩ বছর, বাবার সঙ্গে চলাফেরা করেন, টুকিটাকি কাজে সহযোগিতা করেন, এমতাবস্থায় ইবরাহিম (আ.) কে স্বপ্নে আদেশ করা হয়—অত্যন্ত আদরের সন্তান ইসমাইল (আ.) কে কোরবানি করুন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক হজরত ইবরাহিম ও ইসমাইল (আ.) এর এই আত্মনিবেদনকে চিত্রায়িত করেছে সুরা ছফফাতের ১০২-১০৮ নম্বর আয়াতে।

ইবরাহিম (আ.) এর এই ত্যাগ ও বিসর্জনের দৃষ্টান্তকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য আল্লাহ পাক কোরবানিকে আমাদের সামর্থ্যবানদের ওপর ওয়াজিব (অবশ্য পালনীয়) করেছেন। কোরবানির মূল শিক্ষা হচ্ছে, নিজের জান-মাল, এবাদত-বন্দেগি সবকিছু আল্লাহর জন্য নিবেদন করা। আল্লাহ বলেন, ‘হে নবি! আপনি বলে দিন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ সবই আল্লাহর জন্য।’ (সুরা আনআম: আয়াত ১৬২) তাই আসুন, হজরত ইবরাহিম (আ.) এর অনুসৃত পথে ইবরাহিমি চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে কোরবানির জন্য যথাযথ ভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করি।

লেখক: চেয়ারম্যান, আস-সুফফা ফাউন্ডেশন ও প্রিন্সিপাল, আস-সুফফা মহিলা মাদ্রাসা। খতিব, বাইতুল মামুর জামে মসজিদ, আড়াপাড়া, সাভার, ঢাকা

ইত্তেফাক/এমআর