প্রয়োজন একটু বাড়তি উদ্যোগের

আপডেট : ০৯ জুন ২০১৯, ২১:৫৩

ঈদের ছুটির আগে আগে একটি খবর ছুটির আনন্দকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। বাংলাদেশ সরকার রাজাকারের তালিকা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও এমন একটি খবরে আমার ধারণা তিন ধরনের প্রতিক্রিয়া হতো— ‘বাহ্’, ‘কী!’ আর ‘হাহ্্’। অন্তরে যাদের বাংলাদেশ, তারা সবাই বলতেন ‘বাহ্’, আরেকটি সাধু উদ্যোগ। ‘কী!’ বলতেন তারা যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে সুযোগ-সুবিধাগুলো উপভোগ করছেন ঠিকই, প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধু আর জননেত্রীর নাম জপতে জপতে মুখে ফেনাও তুলে ফেলছেন; কিন্তু যাদের অন্তরে বঙ্গবন্ধু আর শেখ হাসিনাকে খুঁজে বের করতে মাইক্রোস্কোপও যথেষ্ট নয়। তারা ভাবতেন, ‘কি দরকার ছিল আবারো এসব মীমাংসিত বিষয় নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে দেশটাকে ঝামেলায় ফেলার। ভালইতো চলছিল সবই’। আর ‘হাহ’ শব্দটি অনেকেই বলতেন, গভীর অবিশ্বাস থেকে। এদেশের কোনো সরকার রাজাকারের তালিকা প্রণয়নের দুঃসাহস দেখাবে এমনটি বিশ্বাস করার চেয়ে বাংলাদেশ আবার পাকিস্তান হয়ে যাবে তেমনটি বিশ্বাস করাই তাদের কাছে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য।

৭৫-এর পর শুধু শেখ হাসিনার সরকারগুলো বাদ দিলে এদেশে ইতিহাসের চর্চা বলতে হয়েছে শুধু বিকৃতির চর্চা। বাঙালিকে গুলিয়ে খাওয়ানো হয়েছে একজন সেনা কর্মকর্তার এক ঘোষণায় ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান মুখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া একদল সেনা সদস্যের হাতে হানাদারদের পরাজয়েই স্বাধীন বাংলাদেশ। একই সময়ে ক্ষমতাধর করা হয়েছে স্বাধীনতা বিরোধীদের। শেখ হাসিনার সরকারগুলোকে হিসেবের বাইরে রাখা হলে, ৭৫ পরবর্তী এদেশের প্রতিটি মন্ত্রিসভায় ছিল একাধিক রাজাকারের অন্তর্ভুক্তি। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংক, বীমা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রিয়েল এস্টেট, পর্যটন— কোন সেক্টরে একচেটিয়া হয়ে উঠেনি স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি? আঙুল ফুলে কলা গাছ নয় বরং কাঁঠাল গাছে পরিণত হয়েছিল মীর কাশেমের মতো যুদ্ধাপরাধীরা। কাজেই আজকে যে রাজাকারের তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তাতে তাদের সেদিনের প্রতিক্রিয়াতো ‘হাহ’-ই হতো।

কিন্তু সময় পাল্টেছে। আজ যখন এমন সরকারি ঘোষণা আসে তখন স্বাধীনতায় বিশ্বাসী আর অবিশ্বাসী কারোরই আর বিশ্বাস করতে দ্বিধা থাকে না যে, এই প্রধানমন্ত্রী এই কাজটিও করেই ছাড়বেন। কদিন আগে একটি পত্রিকায় এই বিষয়ে একটি লেখা লিখেছিলাম। লিখেছিলাম শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল বদর আর আল শামসের তালিকা করে আঁস্তাকুড়ে ছুড়ে দিলেই দাঁড়িয়ে যাবে লাল-সবুজের বাংলাদেশ। স্বাধীনতার স্বপক্ষের বাংলাদেশের সংজ্ঞাতো ১৬ কোটি বাঙালি বিয়োগ মুষ্টিমেয় ঐ কুলাঙ্গারগুলো; কিন্তু লেখাটা ছাপা হবার পর থেকেই মাথায় ঘুরছে, ‘আসলেই কি তাই’?

বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই এদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে যে গোষ্ঠীটি সক্রিয়, স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বের বুকে তাদের ভয়ানক আঘাতটি ছিল ৭৫-এর ১৫ আগস্ট। লক্ষণীয়, ১৫ আগস্টের কুশীলবরা সবাই কিন্তু একাত্তরে প্রকাশ্যে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়নি। বরং নানা ছদ্মবেশে মুক্তিযুদ্ধের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে একাত্তরের ঘটনাপ্রবাহকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার প্রয়াস ছিল তাদের অনেকেরই। ১৫ আগস্ট বাংলাদেশকে যে কত বছর পিছিয়ে দিয়েছে তা রীতিমতো গবেষণার বিষয়; কিন্তু আজকের সরকার যে রাজাকারের তালিকা প্রণয়ন করতে যাচ্ছেন তাতে তো বাদ পড়ে যাবে এই লোকগুলো। একই ভাবে বাদ পড়ে যাবে বাংলাদেশকে যারা দফায় দফায় কলুষিত করেছে, বাধাগ্রস্ত করেছে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের বাংলাদেশের জয়যাত্রাকে। দফায় দফায় যারা সেনানিবাস থেকে বেড়িয়ে এসে দুর্নীতি দমনের নামে রাজাকার তোষণ করেছে, ভূলুণ্ঠিত করেছে গণতন্ত্রকে, বাদ পড়ে যাবেতো তারাও। শুধু শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল বদর আর আল শামসের তালিকাই তাই আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আরো একটু বড় তালিকার। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের যে অসংখ্য মঙ্গল করেছেন তার অন্যতম হলো আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা। স্বাধীন বাংলাদেশের এই সব ঘৃণ্য ‘ব্যক্তিদের’ নাম উঠে এসেছে দফায় দফায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের একের পর এক রায়ে। তাদের নাম আছে বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলা, জেল হত্যা মামলা, কর্নেল তাহেরের হত্যা মামলা, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা আর ১০ ট্রাক অস্ত্র পাচারের মতো মামলাগুলোয়। আছে সংবিধানের পঞ্চম, সপ্তম আর দশম সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত সুপ্রিমকোর্টের রায়েও। তাদের নামগুলো নথিবদ্ধ আছে স্বাধীনতার স্বপক্ষের বুদ্ধিজীবীদের অসংখ্য বইয়ে, কলামে। রাজাকারদের তালিকাটি প্রণয়নে সরকারের যে উদ্যোগ তার সঙ্গে আরেকটু উদ্যোগী হয়ে এই বাড়তি নামগুলো প্রকাশ করা খুব বেশি দুরূহ নয়; কিন্তু পাকাপাকিভাবে কলঙ্কমুক্ত, লাল-সবুজের একটি ঐক্যবদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় এইটুকু বাড়তি উদ্যোগের বোধ করি খুব বেশি প্রয়োজন।

n লেখক :অধ্যাপক, হেপাটলজি বিভাগ, বাংলাদেশ শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়