আমরা সাধারণত মানসিক রোগ নিয়ে সচেতন নই। কিন্তু কিছু জটিল মানসিক রোগ রয়েছে, যা ঢাকা পড়ে আছে আমাদের কিছু অন্ধ বিশ্বাস এবং কুসংস্কারের জন্য। তেমন একটি মানসিক রোগ সিজোফ্রেনিয়া। এটি একটি জটিল মানসিক রোগ। এর শাব্দিক অর্থ দাঁড়ায় ভাঙা মন বা টুকরো হয়ে গেছে এমন মন। এ রোগের লক্ষণ হচ্ছে- চিন্তাধারা (প্রত্যক্ষণ, চিন্তন) এবং অনুভূতি প্রকাশের মধ্যে সঙ্গতি না থাকা। লক্ষণগুলো হলো: উদ্ভট চিন্তা, বিভ্রান্তিকর বা অলীক কিছু দেখা, অসঙ্গতিপূর্ণ কথাবার্তা, অহেতুক সন্দেহপ্রবণতা, এবং অন্যরা যা শুনতে পায় না এমন কিছু শোনা। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি সামাজিক বা কর্মক্ষেত্রে সচরাচর অক্ষমতাজনিত অসুবিধার সম্মুখীন হন। আর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষণ হচ্ছে অনাগ্রহ, চিন্তার অক্ষমতা, আবেগহীনতা, বিচ্ছিন্নতা। এই রোগকে অনেক সময় মানসিক রোগের ক্যানসার হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। চলুন, আরো কিছু তথ্য জেনে নিই এই রোগটি সম্পর্কে।
যে-কোনো বয়সে হতে পারে তবে যাদের বয়স ১৫-৩০-এর মধ্যে তাদেরই বেশি হয়। বয়স ৪০-এর ওপরে গেলেও সিজোফ্রেনিয়া হতে পারে। শিশুদের হয়ে থাকে তবে বেশি হয়ে থাকে মায়ের গর্ভে থাকাকালীন অবস্থায়। সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর মধ্যে এমন ধরনের বিশ্বাস সৃষ্টি হয় যার কোনো ভিত্তি নেই। যেমন- অনেকে বিশ্বাস করেন তিনি মহাপুরুষ। তাঁর অনেক ক্ষমতা আছে যা দিয়ে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। কোনো কারণ ছাড়াই কেউ বিশ্বাস করে তাঁর নিজের বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী বা কোনো প্রতিষ্ঠান তাঁর ক্ষতির চেষ্টা করছে। তাঁকে পাগল বানাতে চেষ্টা করছে বা হত্যা করতে চাইছে। রোগী নিজেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে পারেন। রোগীর মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাস সংক্রান্ত কতগুলো ভুল ধারণার জন্ম নেয়। তিনি নিজেকে ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী মনে করেন। কেউ স্বামী বা স্ত্রীর প্রতি তীব্র সন্দেহে ভুগতে পারেন। রোগী কতগুলো অবাস্তব দৃশ্য দেখে, এগুলোকে বাস্তব মনে করেন। কোনো বাস্তব স্পর্শ ছাড়াই অনুভব করতে পারেন, কেউ তাকে স্পর্শ করছে। শরীরে খোঁচা লাগার অনুভূতিও হতে পারে। এই রোগীদের আচরণ স্বাভাবিক থাকে না। কখনো একেবারে চুপচাপ, আবার কখনো অতিরিক্ত নড়াচড়া করেন বা কখনো কখনো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। পোশাক-আশাক এবং নিজেরাও অপরিষ্কার থাকেন। কোনো কাজেই উত্সাহ পান না। অনেকে অন্য কারো সঙ্গে, বিশেষ করে বিপরীত লিঙ্গ এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতে পারেন না। একা একা থাকতে চান।
এই রোগটি সাধারণত হয় পরিবেশ ও পুষ্টিজনিত কারণে, বংশগত এবং নেশা সেবনকারীদের। তবে সিজোফ্রেনিয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। তবে বিভিন্ন কারণে সিজোফ্রেনিয়া হতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, মস্তিষ্কে এক ধরনের রাসায়নিক উপাদানের পরিমাণে ত্রুটি এবং নিউরোকেমিক্যাল উপাদান ভারসাম্যহীন হলে এ রোগ হয়। জন্মকালীন কোনো জটিলতা থাকলেও এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্তদের মধ্যে শতকরা ২৫ ভাগ চিকিত্সার পর সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়, ৫০ ভাগ ওষুধ ব্যবহারের মাধ্যমে সুস্থ জীবনযাপন করতে পারে। বাকি ২৫ ভাগ কখনোই ভালো হয় না।শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যায়ামের মাধ্যমে মৃদু লয়ের বাঁশি, সারেঙ্গী, বেহেলা অষ্টপ্রহর মেনে নিয়মিত শুনলে ক্ষতিবিহীন সিজোফ্রেনিয়া ভালো হয়। সেইসঙ্গে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায় ও কর্মস্পৃহা বেড়ে যায়।
সিজোফ্রেনিয়ায় দুই ধরনের চিকিত্সা রয়েছে :ওষুধ প্রয়োগ ও সাইকোথেরাপি। তবে বাংলাদেশ শুধু ওষুধ প্রয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাই মানসিক রোগবিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে চিকিত্সার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, নোয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
