শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পারিবারিক-মানবিক শিক্ষার অভাবেই শিক্ষক হত্যা-লাঞ্ছনা

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২২, ০৬:১৪

সম্প্রতি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক লাঞ্ছনা ও হত্যায় বেড়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। এসব ঘটনা যেন প্রতিনিয়ত বেড়েছে চলেছে। তবে এসব ঘটনার পেছনে পারিবারিক ও মানবিক শিক্ষার অভাব বলে মনে করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। 

সর্বশেষ সাভারের হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে পিটিয়ে হত্যা এবং নড়াইল সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে জুতার মালায় পরানোর ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শিক্ষকরা বলছেন-বিগত কয়েক বছর ধরে শিক্ষক লাঞ্ছনার বিভিন্ন ঘটনা প্রমাণ করে যে-শিক্ষকদের সম্মানের জায়গাটুকু নড়বড়ে। এছাড়া এসব ঘটনাকে হিন্দু-মুসলিম,সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু কিংবা সাম্প্রদায়িকতা মানদণ্ডে বিচার করা হচ্ছে। 

শিক্ষকদের ওপর হামলা ও লাঞ্ছিতের বিষয়ে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস্ (বিইউপি)-এর পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আলমগীর কবীর বলেন, ‘শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনা আমাদের শুধু ব্যথিত ও অপমানিত করেনি, করেছে ক্ষুব্ধও।’ 

শিক্ষক উৎপল কুমার সরকার। ছবি: সংগৃহীত

তিনি বলেন, ‘বাঙালি সমাজে সেই আদিকাল থেকেই শিক্ষকতাকে সামাজিকভাবে খুবই সম্মানিত পেশা হিসেবে দেখা হয়। শিক্ষকদের কাছ থেকে পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি যে উপদেশ এবং পরামর্শ একজন শিক্ষার্থী লাভ করে, তা তার চরিত্র গঠনে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। তবে বিগত কয়েক বছর ধরে শিক্ষক লাঞ্ছনার বিভিন্ন ঘটনা প্রমাণ করে যে-শিক্ষকদের সম্মানের জায়গাটুকু আজ নড়বড়ে। 

পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার অভাবের বিষয়টি উল্লেখ করে আলমগীর কবীর আরও বলেন, ‘পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার অভাবের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীকে ভালো মানুষ ও মানবিক হিসেবে তৈরিতে আমাদের কোন ত্রুটি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। পরীক্ষা ও ফলমুখী শিক্ষাব্যবস্থার কারণে শিক্ষকদের শ্রেণি-পাঠ নিয়ে এত বেশি ব্যস্ত থাকতে হয় যে, শিক্ষার্থীদের চারিত্রিক এবং মানবিক দিক গঠনের বিষয়টি তাদের কাছে অনেকাংশে গৌণ হয়ে গিয়েছে। একইসঙ্গে পরিবারও শিক্ষার্থীদের ফলের দিকে এত বেশি গুরুত্ব দেয় যে, শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশ এবং জীবনবোধ তৈরির প্রক্রিয়া যে অনেকাংশেই বাধাগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে–সেটা আমলে রাখে না।’ 

তিনি বলেন, ‘সামাজিক অনৈক্য ও সর্বক্ষেত্রে রাজনীতিকরণ আমাদের শিক্ষার্থীদের মননে মানবিকতা তৈরিতে অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। শিক্ষকদের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পারিবারিক, মানবিক ও সামাজিক শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপের কোনো বিকল্প নেই।’

সাভারে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। ছবি: সংগৃহীত

শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা ও নড়াইলে কলেজ অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরানোর ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সমাজতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাইদুল ইসলাম বলেন, ‘কলেজ অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরানো এবং সাভারে এক স্কুল শিক্ষককে তারই এক ছাত্র কর্তৃক পিটিয়ে হত্যা দুটো ঘটনাই সমানভাবে উদ্বেগ ও আশঙ্কাজনক। একজনকেতো মেরেই ফেলা হয়েছে, আর একজনকে জ্যান্ত মেরে ফেলা হয়েছে। এসব ঘটনা কিন্তু নতুন নয়। হরহামেশাই ঘটে চলেছে। এই সব ঘটনাকে হিন্দু-মুসলিম, সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু কিংবা সাম্প্রদায়িকতা-অসাম্প্রদায়িকতা-অতি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র কর্তৃক সৃষ্ট এই সব বাইনারির বাইরে এসেও ব্যাখ্যা করলে আমরা দেখবো যে-অনেক বছর থেকেই একটি চরম স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো জনগণের ওপর দৈত্যের মত সওয়ার হয়েছে। এই দানবীয় কাঠামোকে কেবল টিকিয়ে রাখতে পারে জনগণের মধ্যে ভয়ভীতি, ত্রাস সৃষ্টি, হীনমন্যতা উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে।’ 

এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘একটি রাষ্ট্র যখন ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ, উচিত-অনুচিত ভেদরেখাগুলোকে অপসৃয়মান করে দেয় তখন এর প্রভাবে প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানের চিরাচরিত মানবিক মূল্যবোধগুলোও আর টিকে থাকতে পারে না। আরও পরিষ্কার করে বললে একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার যদি নিজেই প্রতিষ্ঠানের নিয়ম লঙ্ঘন করে, সংবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়, আইন লঙ্ঘন করার সংস্কৃতি তৈরি করে তাহলে স্বাভাবিকভাবে প্রতিষ্ঠানের অন্যান্যরা আইন-সংবিধান মানবে কেন, মানবিক মূল্যবোধতাড়িত হবে কেন?’ 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ সমাবেশ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বায়ত্তশাসনের ওপর জোর দিয়ে এই অধ্যাপক বলেন, ‘দেশের কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বশাসিত বা স্বায়ত্তশাসিত রাখা হয়নি, দিন শেষে জোর করে তাকে রাষ্ট্রের পথেই হাঁটতে হয়। আমাদের সংবিধানে ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটি খোদাই করা আছে, কিন্তু সেটি প্রতিষ্ঠা করা কতদূর জানি না, কিন্তু এই দেশে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক মূল্যবোধও অবশিষ্ট নাই। রাষ্ট্র সৃষ্ট এই লুপহোলগুলো যদি দ্রুত ঠিক করা না হয় তাহলে এমন আরও ঘটনার মুখোমুখি আমরা হতেই থাকবো।’

তবে সাম্প্রতিক ঘটনায় পারিবারিক শিক্ষার অভাব রয়েছেন বলে মনে করছেন নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের (এনইউ) বাংলা বিভাগের শিক্ষক জান্নাতুল যূথী। তিনি বলেন, ‘শিক্ষক লাঞ্ছনা ও হত্যার পেছনে প্রধান কারণ পারিবারিক শিক্ষার অভাব। বর্তমানে যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে একক পরিবারে রূপ নিয়েছে, সেইসঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে নানা জটিলতা। পরিবারগুলো সন্তানদের যথাযথ সময় দিতে পারে না। তাই তারা কার সঙ্গে মিশছে, কীভাবে বেড়ে উঠছে এ বিষয়েও যতটুকু  নজরদারি রাখা দরকার তা রাখছেন না। ফলে শৈশব থেকেই সন্তানদের মধ্যে এক ধরনের বিক্ষিপ্ত মনোভাব গড়ে উঠছে!’

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির মানববন্ধন।

তিনি বলেন, ‘পারিবারিকভাবে মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার অভাব, সুশিক্ষার অভাব, জীবন সম্পর্কে সচেতনার অভাবের ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। তাই এখনই সময় সন্তানদের মূল্যবোধের শিক্ষা দিয়ে তাদের বিবেকসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। ভালো-মন্দের তফাৎ বুঝতে দেওয়া। সন্তানের সব চাহিদা চাওয়া মাত্রই মিটিয়ে না দেওয়া। পরিবেশ, সমাজ ও সেইসঙ্গে পারিপার্শ্বিক জীবন সম্পর্কে অভিজ্ঞ করে তোলা। তবেই হয়তো এই কালো ছায়া দূরীভূত হবে।’

শিক্ষকদের কাছ থেকেই ভালো কিছু অনুপ্রেরণা পাওয়া যায় উল্লেখ করে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস্ (বিইউপি)-এর শিক্ষার্থী আতিকা রহমান আঁখি বলেন, ‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। এই মেরুদণ্ডটা ঠিকভাবে গড়ে উঠতে সব থেকে বড় ভূমিকা থাকে শ্রদ্ধেয় শিক্ষকমন্ডলীর। প্রত্যেক শিক্ষকের ভূমিকা ভিন্ন ভিন্ন হলেও তা প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনে অনেক বড় প্রভাব ফেলে। আমার এখনো মনে আছে-আমার স্কুলের শিক্ষকদের শেখানো জীবনবোধ, বিবেকবোধ আর মনুষ্যত্ববোধের দীক্ষা। এখন আমি যেমন, তার পেছনে আমার স্কুলের শিক্ষকদের অবদান কোন ক্ষেত্রেই অস্বীকার করা যাবে না। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও এমন কিছু শিক্ষকের সান্নিধ্য পেয়েছি, যাদের জন্য এখনো সঠিক পথে আছি, ভালো কিছু করার অনুপ্রেরণা পাচ্ছি। কিন্তু বর্তমানে এমন কিছু ঘটনা প্রত্যক্ষ করছি যে, নিজেকে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিতে মাথা নিচু হয়ে যায়।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ।

এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, ‘এখন শিক্ষার্থীরা শুধুমাত্র পুঁথিগত-বিদ্যা অর্জনেই সীমাবদ্ধ। সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা নেই বললেই চলে। শিক্ষকরা চরম অপমানে পর্যদুস্ত। কেবলই নামধারী এসব শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাগুরুকেই যেখানে লাঞ্ছিত করতে পারে, সেখানে তারা তাদের মা-বাবার সঙ্গেও যে এর থেকে খারাপ কিছু করবেনা, সে বিষয়ে সন্দেহের উদ্রেক হওয়াটাই স্বাভাবিক। বর্তমান সময়ে অবস্থা এমনই দাঁড়িয়েছে যে, শিক্ষার্থী নামধারী এসব অশিক্ষিতের মৌখিক কিংবা আচরণগত মূর্খতা আর আমানবিকতা মাত্রা ছাড়িয়ে এখন প্রাণঘাতী বর্বরতায় পরিণত হচ্ছ। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না।’

শিক্ষার প্রকৃত সুফল ভোগ নিয়ে উদ্বেগ জানালেন আতিকা রহমান আঁখি। তিনি বলেন, ‘সমাজের সব থেকে সম্মানিত ব্যক্তি যিনি, তাকেই এখন এমন করে হেয় করা হচ্ছে। যতদিন পর্যন্ত না এই অবস্থার উত্তরণ হচ্ছে, ততদিন যতই মেধাবীরা আসুক না কেন, শিক্ষার প্রকৃত সুফল ভোগ করা থেকে আমরা বঞ্চিতই থাকবো।’

ইত্তেফাক/এএএম