মানিকগঞ্জের ঘিওরে জমে উঠেছে ২০০ বছরের পুরোনো নৌকার হাট। চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের মানুষের জীবনজীবিকা আর চলাচল নৌকা ছাড়া যেন অনেকটাই অচল। সম্প্রতি সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ বন্যা, বর্ষণ এবং অভ্যন্তরীণ নদনদীর পানি বৃদ্ধির ফলে চলাচলের জন্য মানুষজন নৌকা কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছে ঘিওর হাটে।
সরেজমিন উপজেলা সদরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহের মাঠে এমন দৃশ্য দেখা গেল নৌকার হাটে। নির্ধারিত হাটের জায়গার সংকুলান না হওয়ায় পাশেই ডিএন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দৃষ্টিনন্দনভাবে সাজানো হয়েছে বাহারি নৌকা। পদ্মা-যমুনা, কালীগঙ্গা, ইছামতি ও ধলেশ্বরীসহ ছোট-বড় বেশ কয়েকটি নদীবেষ্টিত জেলা মানিকগঞ্জে ইতিমধ্যে বর্ষার পানি প্রবেশ করেছে। এ এলাকার নদীনালা, খালবিল পানিতে এখন ভরপুর। ঘিওর, হরিরামপুর, শিবালয়, ও দৌলতপুর উপজেলার বেশির ভাগ এলাকাই নিচু। পদ্মা-যমুনার সঙ্গে এই চারটি উপজেলার সম্পর্ক থাকায় সাধারণ বর্ষাতেই এদের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়ে। এসব এলাকায় বর্ষা মৌসুমে একমাত্র ভরসা হলো নৌকা। এছাড়া জেলার বাইরের দূর-দূরান্ত এলাকা থেকে মানুষ জন এ হাটে এসে নৌকা কিনে নিয়ে যাচ্ছে। তবে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এসব নৌকা কেনাবেচা কম-বেশি হয় বলে জানিয়েছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। এই হাটে প্রতি দিন লাখ লাখ টাকার নৌকা বেচাকেনা হয়ে থাকে। তবে সাপ্তাহিক হাট বুধবারে সবচেয়ে বেশি নৌকা বেচাকেনা হয়ে থাকে। প্রতি হাটে ২০০ থেকে ৩০০টি নৌকা বেচাকেনা হয়।
ঘিওর বাজারের কাঠমিস্ত্রি সুবল সূত্রধর ও আশিষ সূত্রধর বলেন, প্রতি বছরই বর্ষা মওসুমের অপেক্ষায় থাকি। সপ্তাহে আমাদের নৌকার কারখানা থেকে কমপক্ষে ২০/২২ টি নৌকা হাটে নেওয়া হয়। বর্তমানে কাঠ, লোহা ও অন্যান্য সরঞ্জামাদির দাম বেড়ে যাওয়ায় নৌকা তৈরিতে খরচ বেড়েছে। আমরা সাধারণত জামরুল, রেইনট্রি, আম, কদম, শিমুল, বৈন্যা, ডোমরা ইত্যাদি কাঠ দিয়ে ডিঙি, কোশা ও স্টিল বডির নৌকা তৈরি করছি।
নৌকা বিক্রি করতে আসা জাবরা গ্রামের কানাই চন্দ্র সূত্রধর বলেন, ১০ হাত লম্বা এবং আড়াই হাত প্রস্থের একটি নৌকার মূল্য ৫ হাজার টাকা। এরকম ১১/৩ সাইজের নৌকা ৬ হাজার, ১৩/৩ সাইজের দাম ৭ হাজার, ১৫/৩ সাইজের নৌকা আট থেকে নয় হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের স্টিলের নৌকাও উঠেছে হাটে। এসব নৌকা তৈরিতে খরচ একটু বেশি, দামও বেশি।
হাটে নৌকা কিনতে আসা আশাপুর গ্রামের মুন্নাফ মিয়া বলেন, আমাদের গ্রামটি খুবই নিচু। সামান্য বর্ষাতেই রাস্তাঘাট সব তলিয়ে যায়। বর্ষার সময় একমাত্র বাহন হচ্ছে নৌকা। পানি বেড়ে রাস্তায় উঠেছে। নৌকা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তাই ঘিওর হাট থেকে ৬ হাজার টাকা দিয়ে একটি বড় ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে গেলাম।
ঘিওর নৌকার হাট পরিচালনা কমিটির সদস্য গৌরাঙ্গ ঘোষ জানান, মানিকগঞ্জের নিচু এলাকাগুলোতে বর্ষার শুরুতেই পানি আসে। নিত্যদিনের যাতায়াত ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে তখন প্রয়োজন হয় নৌকার। ঘিওর হাটবাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন মুসা বলেন, ঘিওর হাটের ঐতিহ্য ২০০ বছরেরও অধিক। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. হামিদুর রহমান বলেন, প্রায় ২৫০ বছর ধরে ঐতিহ্যবাহী ঘিওর হাটে বর্ষা মৌসুমে নৌকার কদর বাড়ে।
‘আমাদের গ্রামটি খুবই নিচু। বর্ষায় একমাত্র বাহন হচ্ছে নৌকা। পানি বেড়ে রাস্তায় উঠেছে। নৌকা ছাড়া কোনো উপায় নেই’
