গত ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। চার মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে হাজার হাজার সেনা, বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জামের অপচয় হয়েছে। ইউক্রেনের অনেক শহরে অব্যাহত বোমা হামলা চলছে, প্রচুর অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে এবারই প্রথম নজিরবিহীন শরণার্থীর ঢল দেখা গেছে। দৃশ্যত মনে হচ্ছে, ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ে সারা বিশ্বে যেন একটা ক্লান্তি ভর করতে শুরু করেছে। এজন্য প্রশ্ন উঠছে এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে? তা নিয়ে নানা মন্তব্য এখন পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে।
সম্প্রতি পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর প্রধান জেন্স স্টলটেনবার্গ সতর্ক করে বলেছেন, ইউক্রেনের যুদ্ধ বছরের পর বছর চলতে পারে। এজন্য তিনি কিয়েভকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত থাকার জন্য পশ্চিমা দেশগুলোকে আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, এই যুদ্ধের জন্য ইউক্রেনকে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মস্কোকে যদি তাদের সামরিক লক্ষ্য অর্জন করতে দেওয়া হয় তাহলে তার জন্য আরো বেশি মূল্য দিতে হবে। এর আগে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত মোকাবিলার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। ন্যাটোর প্রধান এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী দুই জনেই ইউক্রেনে আরো সামরিক সাহায্য পাঠানোর ওপর জোর দিয়েছেন।
একটি জার্মান সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ন্যাটো মহাসচিব বলেন, এই ব্যাপারে আমাদের অবশ্যই প্রস্তুত থাকতে হবে যে—এই যুদ্ধ কয়েক বছর ধরে চলতে পারে। ইউক্রেনকে সাহায্য করা থেকে আমাদের দমে গেলে চলবে না। যদিও যুদ্ধের জন্য চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে, শুধু সামরিক সাহায্য দিতে গিয়ে নয়, জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যও বেড়ে যাচ্ছে।
সানডে টাইমস সংবাদপত্রে লেখা এক নিবন্ধে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন অভিযোগ করেছেন যে—রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যতই ক্ষতি হোক না কেন দাঁতে দাঁত চেপে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্বর হামলা চালিয়ে ইউক্রেনকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছেন। আমি শঙ্কিত যে—আমাদের দীর্ঘ এক যুদ্ধের জন্য শক্ত থাকতে হবে। সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
গত সপ্তাহে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত জি-সেভেন সম্মেলনে দেশগুলো যত দিন প্রয়োজন ততদিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। স্পেনে ন্যাটোর সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইউক্রেনকে আরো ৮০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন। পশ্চিমা নেতারা মনে করেন, অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে কিয়েভকে সহযোগিতা করা গেলে এই যুদ্ধে ইউক্রেন জয়ী হতে পারে।
পশ্চিমারা গোয়েন্দারা বলছেন, আগামী কয়েক মাসে রাশিয়ার যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা ফুরিয়ে আসবে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণা সংস্থা বলছে, এ অবস্থায় রাশিয়া তাদের অর্থনীতিতে এমন কিছু পরিবর্তন আনছে যা দেখে মনে হচ্ছে, তারা ইউক্রেনে একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক ইনস্টিটিউট অব ওয়ারের গবেষণায় বলা হচ্ছে, ইউক্রেনে দীর্ঘ সময় ধরে সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার ধকল যেন সামলানো যায়, সেজন্য রাশিয়া নিজেদের অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ সম্পর্কে ইনস্টিটিউট অব ওয়ার তাদের সর্বশেষ পর্যালোচনায় বলেছে, ক্রেমলিন এমন কিছু আইন করার প্রস্তাব করছে, যা মানুষকে রাতের বেলায় বা কেন্দ্রীয় সরকারের ছুটির দিনেও কাজ করতে বাধ্য করবে। বিশেষ সামরিক অভিযানের জন্য সরকারের জারি করা নির্দেশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে অমান্য করতে না পারে, সেজন্য এটা আইন করে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। ইনস্টিটিউট আরো বলছে, রুশ কর্তৃপক্ষ ইউক্রেনের যাপোরিঝিয়া পরমাণু শক্তি কেন্দ্র রাশিয়ার জ্বালানি ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করতেও ব্যবস্থা নিচ্ছে। বর্তমানে ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চল দখলের দিকেই মনোযোগী রাশিয়া। ঐ অঞ্চলে গত কয়েক মাস ধরে ইউক্রেনীয় ও রুশ বাহিনীর মধ্যে লড়াই চলছে এবং সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রুশ বাহিনী ধীরে ধীরে কিছু অগ্রগতি অর্জনে সক্ষম হয়েছে। যদিও গত বুধবার রুশ প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ইউক্রেনে হামলা বন্ধে এখনই কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করতে তিনি চান না।
ন্যাটোর সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল কন্সট্যান্টটিনস লোউকোপোউলস আলজাজিরাকে বলেন, একটি যুদ্ধ তখনই শেষ হয় যখন এক পক্ষ প্রথমে মাঠে এবং তারপর আলোচনার টেবিলে তার ইচ্ছা অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়। অথবা যখন উভয় পক্ষই লড়াইয়ের পরিবর্তে একটি সমঝোতা চায়। বর্তমান অবস্থায় আমি নিশ্চিত যে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সমাপ্তি আসন্ন নয়। এর কারণ রাশিয়ার রাজনৈতিক-কৌশলগত এবং অপারেশনাল-কৌশলগত উদ্যোগ রয়েছে, অন্যদিকে ইউক্রেন এবং পশ্চিমা জোটের প্রতিক্রিয়া।
কিছু বিশ্লেষক বলছেন যে, কিয়েভ এখন শান্তি আলোচনায় গেলে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে না। যার ফলাফল সম্ভবত মস্কো কর্তৃক একচেটিয়াভাবে নির্দেশিত ‘শান্তি’ হবে। পশ্চিমারা এখনো শক্তভাবে ইউক্রেনের পাশে রয়েছে। অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র পাঠাচ্ছে। এই অবস্থায় ইউক্রেন সে ধরনের কোনো ছাড় দিতে সহজে রাজি হবে না।
—বিবিসি ও আলজাজিরার খবর অবলম্বনে
