এম এ আলআমিন
চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে রক্তপাতের মধ্য দিয়ে ছাত্র বিক্ষোভের দমনের ৩০ বছর পূর্ণ হলো গত ৪ জুন। ১৯৮৯ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ছাত্রদের যে গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল ৪ জুন সেটি নির্মমভাবে দমন করা হয়। ওই ঘটনায় কয়েকশ ছাত্র, অসমর্থিত সূত্রে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।
তিয়েনআনমেন বিক্ষোভ দমনের বিষয়টি চীনের মূল ভূখণ্ডে ৪ জুনের ঘটনা হিসেবে পরিচিত। দেশটিতে প্রতি বছর দিনটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘটা করে পালন করা না হলেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনেকে দিনটি স্মরণ করেন বিশেষভাবে। ঐ ঘটনার পর চীনে এ পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের সরকার বিরোধী বিক্ষোভ হয়নি। মে মাসের মধ্যেই বিক্ষোভ প্রায় ৪শ শহরে ছড়িয়ে পড়ে। দেং জিয়াও পিংসহ ক্ষমতাসীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির অনেক নেতাই রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলার পক্ষে ছিলেন। বেইজিংয়ের কর্তৃপক্ষ সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দমন করেছিল সে বিক্ষোভ। সেনাবাহিনী ট্যাংক ও অ্যাসল্ট রাইফেল ব্যবহার করে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনকারীদের ওপর।
৩০ বছর পর লক্ষ করলে দেখা যাবে চীনের সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলায়নি। তিয়েনআনমেন বিক্ষোভের সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সেল ফোন ইত্যাদি ছিল না। কিন্তু এখন সেগুলো থাকলেও বাকি বিশ্বের মানুষের মতো চীনারা স্বাধীনভাবে সেগুলো ব্যবহার করতে পারে না। সমাজ কাঠামোয় যে রকম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর তেমনি রয়েছে বিধিনিষেধ ও কড়া নজরদারি। মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা বা গণতন্ত্রকে রাষ্ট্রের জন্য হুমকি বিবেচনা করা হয়। প্রশাসন থেকে পরিকল্পিতভাবে সংস্কারমনাদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিদেশি সাংবাদিক বহিষ্কার সেখানে এখনও নৈমিত্তিক ঘটনা। ৩০ বছর আগে চীন আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বর্তমান সময়ের মতো এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। দেশটিতে প্রকৃত গণতন্ত্র না থাকলেও নিয়মিত ব্যবধান সরকারের পরিবর্তনের একটি নিয়ম ছিল। বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আজীবন স্বপদে থাকার ব্যবস্থা করে সে নিয়মের অবসান ঘটিয়েছেন।
অর্থনৈতিক শক্তি দেশটিকে বহির্বিশ্বে দর কষাকষির একটি ক্ষমতা এনে দিয়েছে ঠিকই কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে জটিলতা কাটেনি। মানবাধিকার রেকর্ড, মুদ্রা কারসাজি, প্রযুক্তি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ এনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন চীনের ওপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও শাস্তিমূলক শুল্ক চাপিয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র চীনের সুলভ ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ঠিকই কিন্তু নমনীয় হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখায়নি ওয়াশিংটন। চীন মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধ নিকট ভবিষ্যতেও চলবে বলে ধারণা করা যায়। বেইজিং সরাসরি একে ওয়াশিংটনের ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বলে অভিহিত করেছে। সাগরে চীন মার্কিন যুদ্ধ জাহাজগুলোও এক রকম ইঁদুর বিড়াল খেলায় লিপ্ত।
তিয়েনআনমেনে রক্তপাতের পর পশ্চিমা দেশগুলো চীনের ওপর বিভিন্ন রকম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। কিন্তু চীন সেসব নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে উঠেছে। তিয়েনআনমেন বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ওয়াং ডানের একটি নিবন্ধ ১ জুন নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে তিনি চীনের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোর নমনীয় মনোভাবে হতাশ। তিনি লিখেছেন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চীনে গণতান্ত্রিক পরিবর্তন আনার পরিবেশ তৈরি করবে এমন প্রত্যাশা থেকে পশ্চিমা দেশগুলো চীনের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো সরিয়ে ছিল। বাস্তবে এই অর্থ কেবল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের পকেট স্ফীত করেছে। এটি তাদের হাত আরো শক্তিশালী করেছে, অন্যদিকে ভিন্নমত প্রকাশ আরো কঠিন হয়েছে। উল্লেখ্য ওয়াং ইতিপূর্বে দেশে দুইবার জেল খেটেছেন। তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। তার মতে, পশ্চিমাদের এটি উপলব্ধি করা প্রয়োজন ছিল যে প্রবল চাপ সৃষ্টি করা ছাড়া বেইজিংয়ের নেতৃবৃন্দ কখনোই রাজনৈতিক উদারীকরণের পথে হাঁটবে না। চীনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা আরো ধীরে তুলে নেওয়া উচিত ছিল বলে তিনি মনে করেন। কেউ কেউ বর্তমান পরিস্থিতিকে নয়া শীতল যুদ্ধ বলে অভিহিত করছেন। তবে অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এটি ঠিক শীতল যুদ্ধ নয় বরং এটি ওয়াশিংটনের বেইজিংয়ের উত্থান ঠেকানোর চেষ্টা।
চীনের অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের শুরুটা হয়েছিল ১৯৭৮ সালে, দেং জিয়াও পিংয়ের সময় থেকে। তিনি আংশিক পুঁজিবাদী নীতি গ্রহণ করে সীমিত পরিসরে বাজার অর্থনীতি চালু করেন। অনেকে মনে করেন তিনি তার দেশের গণতন্ত্রে উত্তরণের স্বপ্ন দেখতেন। ১৯৭৬ সালে মাও জেডংয়ের মৃত্যুর পর থেকেই বেইজিং বহির্বিশ্বের জন্য একটু একটু করে দরজা উন্মুক্ত করা শুরু করে। কিন্তু তিয়েনআনমেন বিক্ষোভ মুক্তিকামী চীনা জনগণের সে আশা যেন নিভিয়ে দিয়েছে।
