শনিবার, ২০ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নানা সংস্থার পরিদর্শনে শিল্প খাতে জটিলতা

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২২, ০২:০৩

প্রচলিত সংস্থাগুলোর বাইরে নানা সংস্থার পরিদর্শনে হয়রানি বাড়ছে দেশের কারখানা মালিকদের। যে কাজটি নির্দিষ্ট সংস্থার নয় সেটিও করছে তারা। এর ফলে কারখানার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাসের অধিকাংশ সময় এসব কাজে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। একই বিষয়ে নানা সংস্থা পরিদর্শন রিপোর্ট দেওয়ায় জটিলতাও বাড়ছে। এছাড়া পরিদর্শন কর্মকর্তাদের খুশি করতে কারখানামালিকদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বিভিন্ন কারখানামালিক এবং তাদের অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, এমনিতেই ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো যাচ্ছে না। তার ওপর নানা সংস্থার অযাচিত খবরদারিতে উদ্যোক্তারা বিরক্ত। এ অবস্থা চলতে থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে দেওয়া ছাড়া গতি নেই।

বাংলাদেশে কারখানা বা ব্যবসা শুরু করতে গেলে উদ্যোক্তাদের বেশ কিছু সংস্থা থেকে অনুমোদন নিতে হয়। এক্ষেত্রেও তাদের বেগ পেতে হয়। উদ্যোক্তারা জানান, অনুমোদনের বিষয়টি একেক শিল্পের ক্ষেত্রে একেক রকম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের ২০ থেকে ২২টি সংস্থার অনুমোদন নিতে হয়। আবার বছর শেষে এসব লাইসেন্স নবায়নের বিষয়টিও থাকে। কিন্তু যে কাজটি নির্দিষ্ট কোনো সংস্থার না, সে কাজটিও ঐ সংস্থা করতে চায়।

  • কারখানা স্থাপনের জন্য যত রকম লাইসেন্স

বাংলাদেশে ব্যবসা করার জন্য যত রকম অনুমোদনের প্রয়োজন হয় তা বিশ্বের অন্য কোনো দেশে নেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বস্ত্র খাতের একজন উদ্যোক্তা তার কারখানা স্থাপনের জন্য অন্তত ২০ রকমের লাইসেন্স নিতে হয়। এগুলোর মধ্যে আছে, ট্রেড লাইসেন্স, কারখানা লাইসেন্স, ফায়ার লাইসেন্স, বয়লার লাইসেন্স, সংশ্লিষ্ট সমিতির সদস্য পদ, আমদানি রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট, রপ্তানি রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট, বন্ড লাইসেন্স (রপ্তানি খাতের প্রতিষ্ঠান), রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সার্টিফিকেট, সার্টিফিকেট অব ইনকরপোরেশন, টিআইএন সার্টিফিকেট, ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট, পরিবেশ ছাড়পত্র, কারখানার লে-আউট প্লান, সংশ্লিষ্ট সরকারি অফিস থেকে ভবনের ছাড়পত্র, বিইআরসি সার্টিফিকেট, গ্যাস কোম্পানির ছাড়পত্র, বিদ্যুৎ কোম্পানির ছাড়পত্র, ভূমির অনাপত্তি পত্র, বিল্ডিং অকোপেন্সি সার্টিফিকেট, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের লাইসেন্স ইত্যাদি। এর বাইরেও রপ্তানি পণ্য তৈরির কারখানাগুলো কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে নানা প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র নিয়ে থাকে। তবে একটি কারখানা বা স্থাপনার বিভিন্ন ইস্যু দেখার জন্য সরকারের পৃথক পৃথক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব লাইসেন্স বা সার্টিফিকেট প্রতি বছর নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে উদ্যোক্তারা নবায়ন করে থাকেন।

  • কার কাজ কে করে

একটি কারখানা বা স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তাসহ নানা বিষয় থাকে। এসব দেখভাল করার জন্য সরকারের নানা অধিদপ্তর আছে। যেমন অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি দেখে থাকে ফায়ার ব্রিগেড। গ্যাসের বিষয়টি দেখে থাকে তিতাস বা অন্য গ্যাস কোম্পানি। পরিবেশের বিষয়টি দেখে পরিবেশ অধিদপ্তর। বিদ্যুতের বিষয়টি দেখে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কোম্পানি। কিন্তু সাম্প্রতিককালে এর উলটোটা ঘটছে। গত কিছুদিন ধরে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বিভিন্ন কারখানা এবং স্থাপনা পরিদর্শন করছেন। তারা বিভিন্ন টিম করে পরিদর্শন রিপোর্টও দিচ্ছেন। এ পরিদর্শন রিপোর্টে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্হাসহ নানা বিষয় উঠে আসছে। এ নিয়ে নানা ধরনের জটিলতাও হচ্ছে। জানা গেছে, বিডা ইতিমধ্যে এক হাজারেরও বেশি স্থাপনা নির্বাচন করেছে পরিদর্শনের জন্য। তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, আমাদের জবাবদিহিতা কার কাছে এটি বুঝতে অসুবিধা হয়। যে আইনে বিডা প্রতিষ্ঠা করা হয় সেখানে প্রতিষ্ঠানটিকে সুনির্দিষ্ট কিছু কার্যাবলী দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৬ অনুযায়ী বিডা যে কাজগুলো করতে পারবে তার মধ্যে আছে—দ্রুত শিল্পায়নের উদ্দেশ্যে দেশি-বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগকে উত্সাহিত করা, পুঁজি বিনিয়োগ সংক্রান্ত সরকারের বাস্তবায়ন, শিল্প প্রকল্প অনুমোদন, অবকাঠামো সুবিধা নিশ্চিতকরণ, শিল্পে বিদেশি কর্মী নিয়োগের শর্ত নির্ধারণ, শিল্পের জমি হস্তান্তরে বাধা দূর করা প্রভৃতি। কিন্তু বিডার চলমান কাজে কারখানা মালিকদের হয়রানি বাড়ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কারখানা মালিক বলেন, এমনিতেই দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো নানা সমস্যায় ধুঁকছে। এর ওপর নানা সংস্থার অতিরিক্ত খবরদারি পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলছে। কারখানার প্রশাসনিক কর্মকর্তারা মাসের অধিকাংশ সময় ঐসব সংস্থার কর্মকর্তাদের সময় দিতে হয়।

  • বাংলাদেশের ব্যবসা পরিস্থিতি

বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থাপন এবং তা চালিয়ে নেওয়ার পরিস্থিতির ওপর রিপোর্ট করে বিশ্বব্যাংক। ১৯০টি দেশের ওপর পরিচালিত ঐ জরিপ রিপোর্টে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮ নম্বরে। পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থা তৈরি করা হয়েছে ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করার জন্য। কিন্তু পরিস্থিতির এখনো তেমন উন্নতি নেই। এ বিষয়ে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দও নানা পরামর্শ দিয়েছেন। বাংলাদেশের বড় শিল্প খাত টেক্সটাইল মিল-মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী খোকন ইত্তেফাককে বলেছেন, ২০২৭ সালের মধ্যে আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের টার্গেট নির্ধারণ করেছি। কিন্তু যে পরিস্থিতি চলছে তাতে পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। এক্ষেত্রে যে অন্তরায়গুলো আছে সেগুলোকে দূর করতে হবে। তিনি বলেন, নানান সংস্থার হয়রানি বন্ধ করতে না পারলে আমরা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ব। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করার জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা হয়েছে। সেগুলো যাতে ঠিকমতো কাজ করে সেদিকে নজর দিতে হবে।

ইত্তেফাক/ইআ