বুধবারও পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রীত্ব না ছাড়ার অঙ্গীকার করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। যে কোনো চাপের মোকাবিলা করতে তিনি প্রস্ত্তত বলেও জানিয়েছিলেন। কিন্তু নিজের মন্ত্রী ও দলের এমপিদের প্রচন্ড চাপের মুখে অবশেষে বিশ্বের ‘সেরা পদ’ থেকে তাকে বিদায় নিতে হলো। গতকাল ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দেওয়া শেষ ভাষণে তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন যে তাকে আর মন্ত্রী এবং এমপিরা চান না। তবে দলের নতুন নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রীত্ব চালিয়ে যাবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। বরিসের পদত্যাগে বিশ্ব নেতারা মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
পদত্যাগের ঘোষণায় যা বললেন বরিস
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেষ বক্তৃতা করলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন তিনি। তবে তার কনজারভেটিভ পার্টি যতদিন না নতুন নেতা নির্বাচিত করছে, ততদিন তিনিই তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই থাকতে চান বলেও জানিয়েছেন বরিস। নিজের ভাষণে বরিস বলেন, ‘এটা এখন আমার কাছে স্পষ্ট যে আমার এমপিরা আমাকে দল বা দেশের নেতা হিসেবে দেখতে চান না।’
জনসন জানিয়ে দিয়েছেন, নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। এক সপ্তাহের মধ্যে পুরো কর্মসূচি সামনে আসবে। আগামী সপ্তাহে সম্পূর্ণ সূচি প্রকাশ করা হবে। জনসন বলেছেন, বিশ্বের সেরা পদ ছেড়ে দিতে হওয়ায় তিনি দুঃখিত। বরিস জানিয়েছেন, তিনি মন্ত্রীদের বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন, সরকার যাতে চলে তার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সফল হননি। নিজের পদত্যাগের কথা ঘোষণা করার সময় জনসন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তার সাফল্যের কথাও শুনিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ব্রেক্সিট, করোনা ভাইরাসের মোকাবিলা, সবচেয়ে আগে লকডাউন তুলে নেওয়া, রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইউরোপের নেতৃত্ব দেওয়ার কাজ তিনি করেছেন। তবে সেই সঙ্গে এটাও স্বীকার করে নিয়েছেন, অনেক পরিকল্পনা তিনি রূপায়ণ করতে পারলেন না। সেজন্য তিনি দুঃখিত। তবে তার আশা, নতুন প্রধানমন্ত্রী সেই কাজ শেষ করবেন। আর নতুন নেতাকে সাহায্য করবেন। যদিও সাবেক প্রধানমন্ত্রী জন মেজর বলেছেন, দেশের মঙ্গলের জন্য বরিসের আর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকা উচিত নয়।
চাপের কাছে নতি স্বীকার
মঙ্গলবার বরিস জনসনের দুই গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাজিদ জাভেদ এবং অর্থমন্ত্রী ঋষি সুনাক ইস্তফা দিয়েছিলেন। তারপরেও জনসন পার্লামেন্টারি কমিটিতে জানিয়েছিলেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না। কিন্তু তারপর একের পর এক মন্ত্রী ও কর্মকর্তা পদত্যাগ করতে শুরু করেন। সবমিলিয়ে মোট ৫৭ জন মন্ত্রী ও কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন। তার প্রতি এই অনাস্হার প্রকাশ দেখে চাপের মুখে পড়ে জনসনও অবশেষে সিদ্ধান্ত বদল করেন। মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রী পদে নিয়োগ করা অর্থমন্ত্রীসহ তার ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও ডাউনিং স্ট্রিটে গিয়ে দেখা করেন এবং তাকে সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগ করতে বলেন। বরিস পুরো প্রতিনিধি দলের সঙ্গে দেখা না করে একজন একজন করে মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত করেন। কিন্তু সবাই তার সরে যাওয়ার পক্ষে মত দেন। তবে একটি প্রতিনিধি দল তাকে ক্ষমতায় থেকে যেতে আহ্বান জানালেও অধিকাংশ মিত্র পাশে না থাকায় তাকে সিদ্ধান্ত বদল করতে হয়।
এর আগে বরিস বলেছিলেন, ‘আমি এখন পদত্যাগ করছি না। কারণ, দেশ এখন নির্বাচন চায় না। আমি সেই সব বিষয়ের উপর নজর দিচ্ছি যা দেশের জন্য জরুরি। ইউরোপে গত ৮০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় যুদ্ধের দিকে আমি মনোনিবেশ করছি।’ প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে জনসন পার্লামেন্টে বলেন, ২০১৯ সালের নির্বাচনে তিনি বিপুল জনরায় পেয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। সেই ম্যান্ডেটের জোরেই শাসন জারি রাখবেন তিনি। পার্লামেন্টারি কমিটিতে জনসন বলেছেন, ‘আমি সব সমস্যার মুখোমুখি হতে চাই, পালিয়ে যেতে চাই না।’ এরপর তিনি আবাসন মন্ত্রী মাইকেল গোভকে ডেকে পাঠিয়ে পদত্যাগ করতে বলেন। ব্রেক্সিট নিয়ে মাইকেল গোভ সরকারের তরফে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন। কিন্তু বুধবার তিনি বলেন, দেশ ও দলের স্বার্থে জনসনের পদত্যাগ করা উচিত। জনসনের পার্লামেন্টের সচিব জেমস ডাডরিজ স্কাই নিউজকে জানান, ‘মাইকেল গোভকে বরখাস্ত করেছেন জনসন। প্রধানমন্ত্রী রীতিমতো চনমনে আছেন এবং তিনি লড়াই চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর।’ কিন্তু সেই ক্ষমতায় থাকতে বদ্ধপরিকর প্রধানমন্ত্রীকেই ডাউনিং স্ট্রিটে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অস্থায়ী পোডিয়ামে গতকাল নিজের বিদায়ের ঘোষণা দিতে হয়।
একের পর এক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন বরিস। করোনার বিধিনিষেধ ভেঙে ডাউনিং স্ট্রিটে মদের পার্টি, সরকারি হেলিকপ্টার পরিবারের কাজে ব্যবহার, উপনির্বাচনে দলের হার তাকে হেয় করেছে। সম্প্রতি তিনি এমন একজনকে চিফ হুইপ করেছেন, যার বিরুদ্ধে যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগ রয়েছে। তা জেনেও জনসন তাকে চিফ হুইপ করায় দলে প্রচুর জলঘোলা হয়। এ নিয়ে ডাউনিং স্ট্রিট যে মিথ্যা তথ্য দিয়েছিল তাও প্রমাণিত হয়। এরপরই তার সংকট বাড়তে থাকে। বরিসের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, তিনি অর্থনীতিকে সংকটের মুখে নিয়ে গেছেন। যদিও গত মাসে আস্থা ভোটে পার পেয়ে গিয়েছিলেন বরিস। সাবেক মন্ত্রী সাজিদ জাভেদ বুধবার পার্লামেন্টে বলেন, ‘তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বরাবর টিম প্লেয়ার হিসাবে কাজ করে এসেছেন। কিন্তু যখন ক্যাপ্টেন ভালো হয়, তখন টিমও ভালো হয়। গত কয়েক মাস ধরে যা হচ্ছে, তাতে টিমে থাকা আর তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না।’
দলের নেতৃত্বে কে এগিয়ে
ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হবেন ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের নির্বাচিত কোনো নেতা। নিয়মানুযায়ী, প্রথমে রক্ষণশীল দল দুইজন প্রতিদ্বন্দ্বী বেছে নেবে। তারপর তাদের মধ্যে থেকে একজনকে নেতা বাছা হবে। তিনিই পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হবেন। এই নেতৃত্বের দৌঁড়ে এগিয়ে আছেন অনেকেই। এদের মধ্যে সদ্য বিদায়ী অর্থমন্ত্রী ঋষি সুনাক। ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি বহুজাতিক ইনফোসিসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নারায়ণমূর্তির জামাতা তিনি। এরপর আছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাস, প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস, সাবেক লেভেলিং আপ সেক্রেটারি মাইকেল গোভ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমন্ত্রী পেনি মোরডন্ট, ফরেন অ্যাফেয়ার্স চেয়ার টম টুগেনঢাট, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল, অর্থমন্ত্রী নাদিম জাহাউয়ি। এছাড়াও সাবেক মন্ত্রী জেরেমি হান্ট ও সাজিদ জাভেদ দু’জনেই আগেরবার কনজারভেটিভ পার্টির নেতা হওয়ার দৌড়ে ছিলেন। তাই তারা এবারও দৌঁড়ে থাকতে পারেন।
বিশ্ব নেতাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
বরিসের প্রধানমন্ত্রীত্ব পদ চলে যাওয়ায় বিশ্ব নেতৃবৃন্দ মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এর মধ্যে প্রেসিডেন্ট পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, ‘বরিস আমাদেরকে পছন্দ করতেন না, আমরাও করতাম না। আমরা আশা করি লন্ডনে এমন একজন প্রধানমন্ত্রী আসবেন যিনি আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবেন।’ তবে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাকারভ জানিয়েছেন, বরিসের অস্ত্রই বুমেরাং হয়ে তাকে আঘাত করেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বরিসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। তবে তিনি তাৎক্ষনিক কোনও মন্তব্য করেননি। যদিও তার অন্যতম উপদেষ্টা মিখাইলো পোডোলিয়াক ক্ষেপনাস্ত্র হামলা সত্ত্বেও কিয়েভ সফর করায় বরিস জনসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সাবেক ব্রেক্সিট সমন্বয়ক গাই ভারহফস্ট্যাডট বলেছেন, অসম্মানের সঙ্গেই বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো বরিসকে বিদায় নিতে হলো।
তিনি বলেন, জনসনের ব্রেক্সিটের কারণে ইইউ এবং যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইইউ এর সাবেক সমঝোতাকারী মিচেল বার্নিয়ের বলেন, বরিসের বিদায়ে ইইউ এবং যুক্তরাজ্যের সম্পর্কে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। আইরিশ প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিনও বলেছেন, জনসনের বিদায়ে ব্রিটেনের সঙ্গে তার সম্পর্ক নতুন করে শুরু হবে। তিনি স্বীকার করেন যে, বরিসের সঙ্গে তার মতের অনেক অমিল ছিল। তার বিদায়ে এখন সম্পর্ক ঝালাই করার সুযোগ তৈরি হলো। -বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, ডয়চেভেলে ও আলজাজিরা।

