প্রতিবাদ করলে ঘরবাড়ি ছাড়ার হুমকি

সিংগাইরে কারখানার আবর্জনা ও ধোঁয়ায় দুর্ভোগে এলাকাবাসী

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২২, ০১:৪৫

উপজেলার জামির্ত্তা ইউনিয়নের ডাউটিয়া বাজারে গড়ে উঠেছে এনআরকে নামে একটি অটো রাইস মিল। এর শব্দ ও বায়ুদূষণে শ্বাসকষ্টে ভুগছে গ্রামবাসী। জানা যায়, মিল চলাকালে ৫০০ মিটার এলাকা জুড়ে কালো কুঁড়া পড়তে থাকে কুয়াশার মতো। যা মানবদেহে প্রবেশ করছে অতি সহজে। তেমনি বাড়িঘরও আবর্জনায় ভরে যাচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে ঘরের জানালা দরজাসহ আসবাবপত্র।

কোনো কোনো এলাকায় এ সমস্যা থেকে বাঁচতে ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে থাকতে হচ্ছে। কায়সার হামিদ নামে এই মিল মালিক থানা আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক এবং স্থানীয় প্রভাবশালী বলে তার বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। এলাকাবাসী জানায়, এ ব্যাপারে অভিযোগ করা হলে—এলাকায় না থাকতে পারলে তার কাছে বাড়িঘর বিক্রি করে অন্যত্র চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা আবুল বাশার বলেন, এটা একটি জনবসতি গ্রাম। এখানে রয়েছে বাজার, স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা, কমিউনিটি ক্লিনিক। কি করে এখানে কারখানা হয়। স্কুলশিক্ষিকা রাবেয়া বেগম বলেন, তারা পাঠদান করতে পারছেন না। মাঠে খেলাধুলা করতে গেলে চোখে ধুলা গিয়ে ঝাপসা দেখছে শিশুরা। স্কুলের ওয়াশরুম ব্যবহার করা যায় না। কিছুক্ষণের মধ্যেই কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। কাঁচামাল ব্যবসায়ী আলী আকবর বলেন, ‘ভাই সহ্য করে যাচ্ছি। কিছু বললেই হুমকি দেয়। দোকানে বসতে পারি না।’ চায়ের দোকানদার হাবিবুর বলেন, ‘চা বানাই সংসার চালাই। রাতে ১০ কেজি দুধ ঘন করে জ্বাল দিয়ে সকাল বেলায় দেখি—দুধের ওপর তুষের কালি। সব ফেলে দেই। কীভাবে এই দুধ চা মানুষকে দেই। ’

সুমন আলী নামে এক জন জানান, ‘গ্রামের সবাই শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছে। ধানের কালো তুষ শরীরে মিশে যাচ্ছে। বসবাস করা যায় না। অতিষ্ঠ নারী-পুরুষ প্রতিবাদ জানিয়ে এই মিল বন্ধের দাবিতে গত ১৯ জুন তালা দেয় । পুলিশ এসে মিল মালিককে কিছু না বলে উলটো তার ভাতিজা সমীর উদ্দিনকে ধরে নিয়ে যায়। কখনো মিলের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া যাবে না এমন মুচলেকা দেওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। 

আমেনা বেগম ও বিলকিছ আক্তার নামে দুই গৃহিণী বলেন, ‘রান্না করা তরকারি, ভাত খাওয়া যায় না। কালিতে ভরে যায়। দরজা জানালা আটকে খাবার খেতে হয়। সবকিছু মুহূর্তেই কালো হয়ে যায়। চোখ মুখ ঢেকে রাখতে হয়।’ রোজিনা আক্তার জানান, ‘বই খাতা চেয়ার টেবিল কালিতে ভরে যায়। খাবার পানি ঢেকে রাখতে হয়। রান্না করা খাবার নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে তারা মিলের সামনে অবস্থান নেয়। অথচ পুলিশ তার ভাশুরকে ধরে নেয় এবং গ্রামের লোকদের শাসিয়ে যায়। এখন আমরা কোথায় যাব।’ গোলাপি বেগম নামে এক গৃহিণী জানান, ‘মিলের তুষে শ্বাসকষ্ট হয়ে আমার স্বামীকে বেশ কিছুদিন হাসপাতালে রাখা হয়। এখন বাড়ির সবাই অসুস্থ। বাতাস বইলে বাড়িতে থাকাই দায়। রোদে কাপড় শুকানো যায় না। মিল মালিক বলেন, থাকতে না পারলে অন্যত্র চলে যাও।’ একই কথা জানান, অসুস্থ হয়ে পড়া সুমন আলীসহ আরো অনেকে।

মিল মালিক কায়সার হামিদ বলেন, তার মিলের কারণে কারো ক্ষতি হচ্ছে না। এটা সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব । এছাড়া সোনালী ব্যাংক রাষ্ট্রীয়ভাবে অর্থায়ন করেছে। সরকারের ৫০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে এ মিলে। এক দিন অল্প সময়ের জন্য যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কিছু সময়ের সমস্যা দেখা দিলে একটি পরিবার প্রতিহিংসার জন্য এসব বলছে। তারাই মিলে তালা দেওয়ার পর থানায় মুচলেকা দেয়।

থানার ওসি সফিকুল ইসলাম মোল্যা বলেন, কোন ক্ষতি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ করবে। কিন্তু তা না করে গ্রেফতারকৃত সমীর উদ্দিন মাইকে লোক জড়ো করে মালিককে হুমকি দিয়ে মিলে তালা দিয়ে আন্দোলন করে। যেহেতু সেখানে খাবার উৎপাদন হয় এটা তারা বন্ধ করতে পারে না। এটা করতে দেওয়া হয়নি এবং তাকে থানায় আনার পর মুচলেকা নেওয়া হয়েছে খাবার উৎপাদনে বিরোধিতা না করার জন্য।

ইত্তেফাক/এএইচপি