শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বৈশ্বিক সংকট ও অনিশ্চয়তার আবর্তে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির চ্যালেঞ্জ

ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বকে অধিকতর বিভক্ত করেছে এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে বিকাশমান কৌশলগত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বাংলাদেশ এরই মধ্যে তার পররাষ্ট্রনীতিতে বিভিন্ন সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সফলতা দেখিয়েছে। উন্নয়ন ও নিরাপত্তার প্রশ্নে দেশে বৈশ্বিক শক্তিকে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত; যেখানে চলমান সংকটে স্বার্থ ও কৌশলগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করছে অন্যান্য দেশ

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২২, ০৬:৪৫

বিশ্বব্যবস্থা এক কঠিন সময় পার করছে। ১৯৯১ সালে স্নায়ুযুদ্ধের পরিসমাপ্তির মধ্য দিয়ে তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ একটি নতুন বিশ্বব্যবস্হা ঘোষণা করেন, যার মূল ভিত্তি ছিল পশ্চিমা উদারনীতির আধিপত্য। ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা ঘোষণা করেন তার ‘এন্ড অব হিস্ট্রি’। একই সময়কালে বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটনের হাত ধরে আসে ‘ক্লাস অব সিভিলাইজেশন’। হান্টিংটন ও ফুকুইয়ামা উভয়েই বিশ্ব সমাজব্যবস্হা ও জনগণের রৈখিক ও হ্রাসবাদী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য পশ্চিমা ও অপশ্চিমা বিশ্বে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিলেন। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বের ইতিহাস তাদের নির্বোধ ও ভুল হিসেবে প্রমাণ করে। ক্রাউথামারসহ কয়েক জন নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে ‘ইউনিপোলার পিরিয়ড’ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আকারে যুক্তি খাড়া করেছিলেন বটে, যদিও তা বিশ্বের ততটা মনোযোগ কাড়তে পারেনি। পশ্চিমের উদারপম্হী পণ্ডিতেরাও শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী যুগে কান্তিয়ানের ‘ডেমোক্রেটিক পিস’ ও ‘পিস ডিভিডেন্ড’ থিসিসকে সামনে আনতে চেষ্টা চালিয়েছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্পের চরম অসারতা ও শূন্যতা প্রদর্শনের দৃষ্টান্তও দেখেছে বিশ্ব। ক্যাপিটল হিলে ৬ জানুয়ারির বিদ্রোহ, ইউরোপে ডানপম্হী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, ব্রেক্সিট বিড়ম্বনা প্রভৃতির ফলে বৈশ্বিক পুরোনো গণতন্ত্রিক ব্যবস্থাগুলোকে ব্যাপকভাবে মধ্যযুগীয় সিনড্রোমে ভুগতে দেখছি আমরা। এসবের ফলে প্রশ্ন সামনে আসছে—পশ্চিমা শক্তিসমূহ বিশ্বের জন্য কী ধরনের ‘ব্যবস্থা’ নির্ধারণ করতে চলেছে?

স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষ, যাদের আমরা একসময় তৃতীয় বিশ্বের দেশ আখ্যায়িত করতাম, শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের সংকট ও অস্হিতিশীলতার মধ্য দিয়ে হাঁটছে নতুন করে। বলকান সংকট, প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ, আফগানিস্তান যুদ্ধ, সিরিয়া সংকট ও লিবিয়ার পরিস্হিতির পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমা আধিপত্যের বিশ্বব্যবস্হা বিশ্ববাসীর মধ্যে গভীর হতাশার সৃষ্টি করেছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা হস্তক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেছেন খোদ পশ্চিমেরই অনেক রাজনীতিবিদ ও পণ্ডিত। গৃহযুদ্ধ ও ঘরোয়া দ্বন্দ্বের দীর্ঘ স্পেল মূলত বাইরের হস্তক্ষেপের চূড়ান্ত ফলাফল। আফগানিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশই বহির্বিশ্বের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তাদের অভ্যন্তরীণ আদেশের ক্ষেত্রে কোনো গুণগত পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেনি। বরং এসব দেশের মানুষ ও সমাজব্যবস্হা রাজনৈতিক সংকটের লম্বা গোলকধাঁধায় জড়িয়ে পড়েছে ক্রমশ। দক্ষিণ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন সার্বভৌম রাষ্ট্র সৃষ্টির মাধ্যমে ইউরোপীয় মানচিত্র আঁকা হয়েছে বারবার। যুগোস্লাভিয়ার বিভক্তি, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি এবং চেকোস্লোভাকিয়ার বিভাজন ইউরোপে ১৪টি নতুন রাষ্ট্র যোগ করে। ন্যাটো ও ইইউ এই নতুন আবিভূ‌র্ত রাষ্ট্রগুলোর অনেককেই তাদের দলে ভিড়িয়েছে।

ইউরোপে নতুন রাষ্ট্রের সৃষ্টি, ন্যাটো ও ইইউর সম্প্রসারণ এবং পশ্চিমের পতন একটি নতুন কৌশলগত মানচিত্রের সূত্রপাত ঘটায় ইউরোপে। একই সঙ্গে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় চীন, ভারত ও কয়েক ডজন আঞ্চলিক শক্তির উত্থান পশ্চিমা আধিপত্যের বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে একটি সমতল অঙ্গনে এনে দাঁড় করায়। এসব প্রেক্ষাপটে পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়া পশ্চিমাদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে ব্যবধান আরো প্রশস্ত করে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নব্য রক্ষণশীল ও জনতুষ্টিবাদী প্রেসিডেন্ট বিশ্বব্যাপী রাজনীতিতে বিভাজন, দ্বন্দ্ব ও ‘শক্তির রাজনীতি’ প্রক্রিয়া সংহত করেছে, যা বিশ্বের ডানপম্হী শক্তিগুলোকে জুগিয়েছে শক্তি। এসবের ফলশ্রুতিতে বিশ্বব্যবস্হা অস্বচ্ছ ও একমুখী হওয়ার ফলে প্রাসঙ্গিকতা ও আবেদন হারিয়েছে। ফিলিস্তিনিদের ঐতিহাসিক যন্ত্রণা, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ, ইয়েমেন যুদ্ধ, আফগানিস্তান সংকট, ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ার পরিস্থিতি বিশ্বব্যবস্থার ভঙ্গুরতা ও অসারতা প্রদর্শন করে চলেছে। যদিও মানবাধিকার ও উদার গণতন্ত্রের স্লোগান উঠেছে সমানতালে।

চলমান ইউক্রেন যুদ্ধ কফিনে চূড়ান্ত পেরেক বলে মনে হচ্ছে। রাশিয়া একে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ আখ্যা দিয়ে ইউক্রেনে আক্রমণ করে চলেছে। বহু হতাহত হয়েছে, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে প্রায় ৪০ মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশ ইউক্রেন। শক্তিশালী রাশিয়ান সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ইউক্রেনীয়দের প্রবল প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে চলমান যুদ্ধটি অর্ধবছরকাল পার করতে চলেছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পশ্চিমা বিশ্ব ও রাশিয়া উভয়েই এই যুদ্ধকে তাদের নিরাপত্তাবলয় প্রসারিত করার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশেষ করে এই যুদ্ধ রাশিয়া এবং তার বন্ধু ও মিত্রদের একপেশে করে পশ্চিমাদের বিশ্বব্যাপী আধিপত্য পুনঃ প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। ১৯৯১ সালে স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর আঞ্চলিক সম্মিলিত নিরাপত্তা জোট ন্যাটোর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এর সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে, বিশেষ করে ১৯৯৭ সাল থেকে। ২০২২ সালে এসে ন্যাটো তার সদস্যদের ভৌগোলিক ও সামরিক শক্তিকে রাশিয়ার সীমান্ত পর্যন্ত প্রসারিত করতে চেষ্টা করছে। প্রকৃতপক্ষে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পুরো ইউরোপ থমকে গেছে। বিশ্লেষক, রাজনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা সম্পর্কে কথা বলছেন। নিষেধাজ্ঞার পর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে রাশিয়ার ওপর। ব্যাপক হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও এই যুদ্ধ বিশ্বরাজনীতিতে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে একটি নতুন যুগের সৃষ্টি করে চলেছে। পশ্চিমের অপ্রতিরোধ্য প্রতিক্রিয়া এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য রাশিয়ার দৃঢ় সংকল্প স্নায়ুযুদ্ধের নতুন যুগের প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা বিশ্ব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে প্রত্যক্ষ করেছিল। আন্তঃরাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিটি যুদ্ধ বা সংঘাতই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বৈশ্বিক ব্যবস্থায় যেকোনো দেশের জন্যই নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। কেননা, প্রতিটি দেশ ও তার অর্থনীতি ও সংস্কৃতি এই বিশ্বায়নের ফ্রেমে গভীরভাবে একীভূত। বিশ্ব সম্প্রদায়ের সক্রিয় সদস্য হিসেবে স্বভাবতই বাংলাদেশও আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক উন্নয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। কাজেই, ইউক্রেন যুদ্ধের পরিণতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে—বলাই বাহুল্য।

আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ ছিল যুদ্ধের বিষয়ে তার অবস্হান প্রকাশ করা। মূলত এটি শুধু পশ্চিম, রাশিয়া ও ইউক্রেনের বিরোধপূর্ণ স্বার্থের একটি জটিল ম্যাট্রিক্সের সঙ্গেই সম্পৃক্ত নয়, বিশ্বব্যাপী প্রভাব গণনা করার একটি সমস্যাও বটে। দৃশ্যত, রাশিয়ার আক্রমণ ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা লঙ্ঘন করেছে; কিন্তু বাস্তবে রাশিয়ার এমন ঝুঁকি নেওয়ার জন্য বাধ্য করে পূর্ব দিকে কয়েক দশক ধরে ন্যাটোর সম্প্রসারণ। এরূপ বিস্ময়কর পরিস্হিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ এই যুদ্ধের ইসু্যতে স্বাধীন অবস্হান নিয়েছে। ২ মার্চ অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিশেষ জরুরি অধিবেশনের প্রস্তাবে বাংলাদেশ সমর্থনদানে বিরত থাকলেও ২৪ মার্চ যুদ্ধ শেষ করার আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবকে সমর্থন করে। বাংলাদেশের অবস্হান অনেককে বিভ্রান্ত করতে পারে, কিন্তু এটি পরিষ্কার যে, এই সিদ্ধান্ত দেশের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অবস্হানকেই প্রদর্শন করেছে।

রাশিয়ার ওপর পশ্চিমাদের অপ্রীতিকর নিষেধাজ্ঞার কারণে ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে খারাপ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্হার প্রশ্নে পশ্চিমারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক শাস্তিমূলক ব্যবস্হা নিয়েছে, যেন তারা রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত! সুইফট থেকে রাশিয়াকে বাদ দেওয়া, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, রাশিয়ার অর্থনীতির মন্দা, শেয়ারবাজারে অস্হিতিশীলতা এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে অন্যান্য পদক্ষেপ ইতিমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিকে ব্যাহত করে তুলেছে। আমরা জানি, রাশিয়া ও ইউক্রেন বিশ্বে খাদ্যশস্যের সবচেয়ে বড় উত্পাদক। বাংলাদেশ যেহেতু বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একীভূত, কাজেই প্রতিকূল অর্থনৈতিক অবস্হার ঢেউ আছড়ে পড়ছে এই দেশের মাটিতেও। দেশে পণ্যের দাম, জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বৈশ্বিক ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা ও বিশৃঙ্খলার সবচেয়ে বাজে প্রভাব হলো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্তরে তীব্র মেরুকরণের সঙ্গে কীভাবে খাপ খাওয়ানো যায়। ইউক্রেন যুদ্ধ নিঃসন্দেহে পশ্চিম এবং চীন ও রাশিয়ার মধ্যে মেরুকরণকে আরো ঘনীভূত করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাইডেন প্রশাসন ২০২১ সালে তার কার্যভার গ্রহণের পর থেকে চীন ও রাশিয়াকে ন্যাটো ও জি৭-এর মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন ও একপেশে করার নীতি তৈরি করে। এই উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে কোয়াড এবং অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা অকাসকেও। ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার হামলা পশ্চিমাদের জন্য ইউক্রেন-সংকটকে আন্তর্জাতিকীকরণ করা এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে পুতিন ও তার দেশকে আগ্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতীয়মান করার জন্য একটি বিশেষ সুযোগ এনে দিয়েছে। ক্রমবর্ধমান এই মেরুকরণের সঙ্গে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রগুলোর একই সঙ্গে পশ্চিম এবং রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে স্বভাবতই দ্বিধাগ্রস্ততার মুখোমুখি পড়তে হচ্ছে।

অর্থাত্, এরূপ যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দুটি প্রধান গোষ্ঠী বৈশ্বিক রাজনৈতিক অঙ্গনে মেরু হিসেবে আবিভূ‌র্ত হচ্ছে, তা হলো মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব ও তার মিত্ররা এবং রাশিয়া-চীন জোট নেতৃত্বাধীন শক্তি। অবশ্যই একটি বড়সংখ্যক দেশ নিরপেক্ষ ও জোটনিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করবে। এ ধরনের গঠনমূলক পর্যায়ে থাকা সত্ত্বেও এটি প্রায় নিশ্চিত যে ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কেন্দ্রস্হলে এসে পড়েছে। বাইপোলারিটির জটিল ছক বিশ্বায়ন, আন্তঃসংযোগ ও পরস্পর নির্ভরতার প্রশ্নে অবশ্যই পশ্চিমা ও রুশ-চীনা ব্লকের প্রধান পক্ষগুলোর আচরণকে সংযত করবে। স্বার্থের কূটনৈতিক ও কৌশলগত ম্যাট্রিক্সের উদ্ভাবন হেরফের হবে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো বিদ্যমান স্বাধীন ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি সংরক্ষণে থাকবে ক্রমাগত চাপের মধ্যে—এটাই বাস্তবতা।

ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বকে অধিকতর বিভক্ত করেছে এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে বিকাশমান কৌশলগত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। যদিও এই প্রবণতাগুলো তাত্পর্যপূর্ণ, তবে এগুলো বাংলাদেশের জন্য মোটেই নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশ এরই মধ্যে তার পররাষ্ট্রনীতিতে বিভিন্ন সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সফলতা দেখিয়েছে। উন্নয়ন ও নিরাপত্তার প্রশ্নে দেশে বৈশ্বিক শক্তিকে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত; যেখানে চলমান সংকটে স্বার্থ ও কৌশলগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করছে অন্যান্য দেশ। বাংলাদেশ বিশ্বকে দৃঢ়ভাবে ইঙ্গিত দিয়েছে যে, নতুন বাধ্যবাধকতা এবং পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত অবস্থান অনুসরণ করে যাবে।

লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য, বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)

ইত্তেফাক/এসটিএম