মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

জয়ের পরও শান্তিতে নেই পুতিন

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২৪, ০৩:৩০

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে টানা পঞ্চম মেয়াদে ক্ষমতায় এসেছেন ভ্লাদিমির পুতিন। নতুন মেয়াদে আরও ছয় বছর তথা ২০৩০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতা পাকাপোক্ত হয়েছে ৭১ বছর বয়সী এই প্রতাপশালী রুশ নেতার। আর এর মধ্য দিয়ে ২০০ বছরের মধ্যে রাশিয়ায় সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা নেতা হয়ে উঠেছেন ১৯৯৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা সাবেক গোয়েন্দা প্রধান পুতিন।

নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর পুতিন ও তার সমর্থকরা উদ্দাম উদ্যাপনে মেতে উঠবেন, সেটাই স্বাভাবিক। তবে এতে বাগড়া হয়ে দাঁড়ায় ভয়াবহ ‘মস্কো হামলা’। মস্কোর উপকণ্ঠের ক্রাসনোগরস্ক শহরের ক্রোকাস সিটি কনসার্ট হলে জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট-খোরাসান বা আইএস-এর হামলায় ১৩৭ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় পুতিনের আরামের ঘুম যে হারাম হয়ে যায়, সে কথা বলাই বাহুল্য। উপরন্তু এ ঘটনা ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিনকে বেকায়দায় ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা, যা রুশ স্বৈরশাসকের জন্য খারাপ খবরই বটে।

আইএস-এর হামলা পুতিনের মাথাব্যথার বড় কারণ হয়ে উঠেছে কেন? বস্তুত এর মধ্য দিয়ে পুতিন প্রশাসনের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। প্রায় দুই দশকের মধ্যে মস্কোয় সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে বড় ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে এ হামলাকে। মস্কো হামলার ঘটনায় এটাই প্রমাণিত হয় যে, রাশিয়ার রাজধানী শহর কতটা অরক্ষিত, দুর্বল! অন্য সব এলাকাতেও যে একই ধরনের নাজুক অবস্থা বিরাজমান নয়, কে বলতে পারবে?

লক্ষ করার বিষয়, রাশিয়ার মূল নিরাপত্তা সংস্থানগুলো ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। ফলে দেশের অভ্যন্তরের নিরাপত্তার দিকে তাকানোর মতো যথেষ্ট ফুরসত পাচ্ছে না নিরাপত্তা বাহিনী। মাস কয়েক আগে রাশিয়ার ভাড়াটে সেনা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওয়াগনার গ্রুপের বিদ্রোহী সদস্যরা যখন বিনা বাধায় মস্কোর দিকে ধেয়ে আসছিল, তখনই বোঝা গিয়েছিল কতটা ভঙ্গুর হয়ে উঠেছে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ওয়াগনার বিদ্রোহের রেশ কাটতে না কাটতেই মস্কো হামলা প্রত্যক্ষ করল রাশিয়ার জনগণ। এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে পুতিন প্রশাসনের নতুন এই দুর্বলতা অনেক কিছুর ইঙ্গিত বহন করে।

এ প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার, ওয়াগনার বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধের গতিপথ পালটে যায় অনেকখানি। রুশ নিরাপত্তা পরিষেবা ও ঊর্ধ্বতন সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মধ্যে চলমান টানাপড়েনও প্রকাশ পায় এর মধ্য দিয়ে।

যাহোক, গত বছরের তুলনায় বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া ভালো অবস্থানে আছে বলেই মনে হচ্ছে। ঠিক এমন একটা মুহূর্তে শাসনব্যবস্থার ভঙ্গুর দশা প্রকাশ হওয়াটা পুতিনের জন্য অস্বস্তিকরই বটে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পুতিন কম কিছু করেননি। বলতে হয়, অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েই রাজনৈতিক ক্যারিয়ার সুরক্ষিত করে চলেছেন তিনি।

মস্কোয় আইএস-কের হামলা নিয়ে জোর আলোচনা হওয়ার কথা। আইএস-কে হল আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে সক্রিয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দায়েশের অন্যতম শাখা, যারা আফগানিস্তানে তালেবানদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। এই সংগঠন এখনো ‘পূর্ণ মাত্রার জঙ্গি গোষ্ঠী’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারেনি বটে, কিন্তু সমস্যা আছে অন্য জায়গায়। রাশিয়ার সঙ্গে এক ধরনের ঝামেলা আছে আইএস-এর। বেশকিছু রিপোর্টে উঠে এসেছে, অন্য যে কোনো অঞ্চলের চেয়ে সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র থেকে অনেক বেশি সংখ্যক বিদেশি যোদ্ধা দায়েশে যোগ দিয়েছে। এই দাবি যে সত্য, মস্কো হামলার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে। লক্ষণীয়, এই হামলার অধিকাংশ অপরাধীই তাজিকিস্তানের উগ্রবাদী নাগরিক।

মস্কো হামলাই যে রাশিয়ায় দায়েশের প্রথম হামলা, তা কিন্তু নয়। এর আগেও মস্কোর স্বার্থে বড় পরিসরে আক্রমণ চালাতে দেখা গেছে দায়েশকে। ২০১৫ সালের অক্টোবরের ঘটনার কথা মনে আছে নিশ্চয়ই? ২২৪ জন যাত্রী নিয়ে একটি রুশ বিমান মিশরের আকাশ সীমায় বিস্ফোরিত হয়, যেখানে সবাই নিহত হয়েছিল। পরের ঘটনা ২০১৭ সালের। সেন্ট পিটার্সবার্গ মেট্রো সিস্টেমে এক আত্মঘাতী বোমা হামলার মাধ্যমে উড়িয়ে দেওয়া হয় পাতাল রেল।

অবাক হওয়ার মতো বিষয়, সাম্প্রতিক সময়ে মস্কোর এক উপাসনালয়ে আরো একটি হামলার পরিকল্পনা করেছিল আইএস-কে। রাশিয়ার মিডিয়া এজেন্সি তাস জানিয়েছে, রুশ কর্তৃপক্ষ ঠেকিয়ে দিয়েছে সেই হামলা। তবে মস্কো হামলা ঠেকাতে না পারার কারণে হামলার ঘটনা প্রতিরোধে রাশিয়ান নিরাপত্তা ব্যবস্থার শক্তিমত্তা পড়েছে প্রশ্নের মুখে। পশ্চিমা নিরাপত্তা পরিষেবাগুলো এ হামলা সম্পর্কে আগেভাগেই রাশিয়াকে সতর্ক করেছিল বটে। তবে তা কানে তোলেনি পুতিন প্রশাসন।

কোনো সন্দেহ নেই, রাশিয়ার বিশেষ বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়েছে খোদ ঘরের মাটিতেই। এমনকি অনেক পুলিশ অফিসারকে ইউক্রেনে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর ফলে হাতে গোনা লোকজনকে দিয়েই রাশিয়ার অভ্যন্তরে মারাত্মক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমরা লক্ষ করেছি, মস্কো হামলার পর মাত্র দুই মাইল দূরের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে ন্যাশনাল গার্ড সেনাদের। নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা দুর্বল পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা এর মধ্য দিয়েই পরিষ্কার বোঝা যায়।

হামলার পর আইএস-কে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, অল্প কয়েক জন হামলাকারীই কীভাবে সফল আক্রমণ চালায়। কীভাবে এই হামলার পরিকল্পনা সাজানো হয়, সেই বিবরণও দিয়েছে আইএস-কে। একপ্রকার বিনা বাধায় কনসার্ট হলে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা।

পুতিন অবশ্য কিয়েভের সঙ্গে হামলাকারীদের যোগসূত্র আছে বলে অভিযোগ করে আসছেন। এমনকি তিনি এ-ও বলেছেন, ‘হামলা শেষে সন্ত্রাসীরা ইউক্রেনে লুকানোর চেষ্টা করেছিল। তারা ইউক্রেন সীমান্তের বেশ কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল, যেখানে আগে থেকেই তাদের জন্য সীমান্ত অতিক্রম করার বন্দোবস্ত করে রাখা হয়েছিল।’ এমনকি তিনি আক্রমণকারীদের ‘নিঃস্ব’ হিসেবে অভিহিত করতেও ছাড়েননি। এসব কথাবার্তার মাধ্যমে তিনি নিজের দোষ ও ব্যর্থতা আড়াল করতে চাইছেন বটে, কিন্তু ঘটনা যা ঘটার তা-তো ঘটেই গেছে!

বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, মস্কো হামলাকে পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধে বৃহত্তর অভিযানের কারণ হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারেন আগামী দিনগুলোতে। ইউক্রেনে হামলা বাড়াতে পারেন। অবশ্য এ ধরনের প্রবণতা পুতিনের পুরোনো অভ্যাস। গুঞ্জন আছে, এই হামলার আগেই ইউক্রেনে আগ্রাসনের মাত্রা বাড়ানোর কথা চিন্তা করছিলেন পুতিন। ইউক্রেনের স্থল বাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওলেক্সান্ডার পাভলিউক এক ঘোষণায় জানিয়েছেন, নতুন করে আক্রমণ চালানোর জন্য ১ লাখ সেনা প্রস্তুত করেছে মস্কো। পুতিনের এই প্রবণতা যে যুদ্ধকে আরো ভয়ংকর করে তুলবে, তা সহজেই অনুমেয়।

যাহোক, ইউক্রেনের চেয়ে রাশিয়া যুদ্ধে এগিয়ে রয়েছে, এ কথা মানতেই হবে। যদিও উভয় পক্ষই ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। ফলে যুদ্ধ যত সামনের দিকে গড়াবে, দুই দেশই কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হবে। রাশিয়ার অর্থনীতি সেভাবে ধসে যায়নি, যতটা মনে করা হয়েছিল। তবে ইউক্রেন পড়েছে দোটানায়। কারণ, পশ্চিমারা অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা অব্যাহত রাখলেই কেবল যুদ্ধের ময়দানে টিকে থাকতে পারবে কিয়েভ।

যুদ্ধের চূড়ান্ত ফলাফলে কে জিতবে, তা এখনো বলা কঠিন। আগামী সপ্তাহগুলোতে হয়তো-বা আরো ‘বিস্ময়কর’ কিছু দেখা যেতে পারে এই সংঘাতে। পারমাণবিক আশঙ্কাও চলে গেছে, তেমন কথাও বলার মতো সময় আসেনি। সব মিলিয়ে এই যুদ্ধ আরো অনেক মাস চলবে বলেই মনে হচ্ছে। অনেক বড় লড়াই এক-দুই বছরেই শেষ হতে দেখেছি আমরা। তবে দুঃখজনক ভাবে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে পর্যায়ক্রমিক উত্তেজনা যেন কোনোভাবেই থামার নয়!

যুদ্ধ কবে নাগাদ বন্ধ হবে, সে কথায় না আসি। তবে ভয়াবহ মস্কো হামলার ঘটনা যে পুতিন প্রশাসনকে নাড়িয়ে দিয়েছে, সে কথা বলতেই হয়। এই হামলার মধ্য দিয়ে খোলা চোখে আমরা হয়তো-বা পুতিনের দুর্বলতাই লক্ষ করলাম, কিন্তু ধুরন্ধর এই রুশ শাসক নিজেকে ঠিক কতটা দুর্বল হিসেবে দেখছেন, তা কি জানার সুযোগ আছে? সত্যি বলতে, এই চতুর নেতা সম্পর্কে নিশ্চিত করে কোনো কিছুই বলতে পারা যায় না!

 লেখক : লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের সহযোগী অধ্যাপক

আরব নিউজ থেকে অনুবাদ : সুমৃত্ খান সুজন

ইত্তেফাক/এমএএম