পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এবং রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এতে চারজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে তিনজনকে নিজেদের কর্মী বলে দাবি করেছে বিজেপি। রাজ্যের মুখ্যমন্¿ী মমতা ব্যানার্জির পদত্যাগ দাবি করে রাজ্যজুড়ে আজ কালো দিবস পালনের ঘোষণা দিয়েছে বিজেপি। এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে দিল্লির স্বরাষ্ট্রমন্¿ণালয় মমতা ব্যানার্জিকে পরিস্থিতি শান্ত করার আহবান জানিয়েছে। প্রধানমন্¿ী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আজ রাজ্যপালের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
শনিবার বিকেলে উত্তর২৪ পরগনার সন্দেশখালির হাটগাছিতে তৃণমূলের প্রতিবাদ সভা ছিল। তৃণমূলের অভিযোগ, পতাকা লাগানোর সময় তাদের ওপর গুলি চালায় বিজেপি সমর্থকরা। এক তৃণমূল সমর্থকের মাথায় গুলি লাগে। তারপর তাকে টেনে নিয়ে গিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয়। অন্যদিকে বিজেপির অভিযোগ, স্থানীয় তৃণমূল নেতা শাহজাহান শেখের বাহিনী সন্ধ্যায় হামলা চালায়। বিজেপি নেতা সায়ন্তন বসুর দাবি, তৃণমূলের বৈঠকের পর বিজেপির পতাকা খুলতে শুরু করে তৃণমূল, এ থেকেই গোলমালের সূত্রপাত। বিজেপির অভিযোগ, বাড়ি বাড়ি গিয়ে গুলি করা হয়েছে বিজেপি কর্মীদের। এতে অন্তত ৫ বিজেপি কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। তার মধ্যে ৩ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। বাকি ২ জনের দেহ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূলের উত্তর২৪ পরগনা সভাপতি জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের অভিযোগ, বৈঠক শেষে মিছিল বের করেছিল তৃণমূল। সেখানে হামলা চালিয়ে তৃণমূল কর্মী কাইয়ুম মোল্লাকে গুলি করে ও কুপিয়ে খুন করা হয়। এ বিষয়ে বিজেপির দাবি, বেপরোয়া গুলি চালানোর সময়ে তৃণমূল সমর্থকদের গুলিতেই কাইয়ুম নিহত হয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিখোঁজ বিজেপি কর্মীদের দেহ ভেড়িতে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাইয়ুমকে গুলি করার পর প্রতিবাদে বিক্ষোভে নামে তৃণমূল কংগ্রেস। তারপরই ঘটনা সংঘর্ষে রূপ নেয়। রবিবারও থমথমে ছিল গোটা এলাকা। জারি ছিল ১৪৪ ধারা। রবিবার বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ এবং এমপি লকেট চ্যাটার্জি ঘটনাস্থলে যেতে চাইলে তাদের আটকে দেওয়া হয়। পরে অবশ্য বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ লাশ নিয়ে সন্দেশখালির উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু পথে আটকে দেওয়া হয়। দিলীপ ঘোষ জানান, পুলিশের সামনে আমাদের সমর্থকদের গুলি করে খুন করা হয়েছে। অথচ কলকাতায় দাহ করতে নিয়ে আসায় বাধা দেওয়া হচ্ছে। পরে বিজেপি নিহতদের মৃতদেহ তাদের গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বসিরহাটের প্রধান মেডিক্যাল কর্মকর্তা ডি মুখার্জি জানিয়েছেন, শনিবার রাতে বসিরহাট হাসপাতালে তিনজনের মৃতদেহ নিয়ে আসা হয়। তারা হলেন-সুকান্ত মন্ডল, প্রদীপ মন্ডল এবং কাইয়ুম মোল্লা। সুকান্ত এবং প্রদীপ বিজেপির কর্মী। এর আগে শনিবার রাতে রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক সায়ান্তন বসু দাবি করেন, সুকান্ত, প্রদীপ এবং শংকর নামে তাদের তিন কর্মী নিহত হয়েছেন। যদিও পুলিশ এবং প্রশাসন থেকে নিহতদের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
বিজেপি নেতা মুকুল রায় মমতা ব্যানার্জিকে দায়ী করে বলেন, তার উস্কানিমূলক বক্তব্যেই সংঘর্ষ হয়েছে। ঘটনার দায় তৃণমূল কংগ্রেসের ওপর চাপিয়ে মুখ্যমন্¿ী মমতা ব্যানার্জির পদত্যাগ দাবি করেছে বিজেপি। অন্যদিকে রাজ্য তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক পার্থ চ্যাটার্জি বলেন, লোকসভায় ৪২ আসনের মধ্যে ১৮টিতে জয়ী হয়েছে বিজেপি। মানুষ এখন তাদের ভোট দেওয়ার ফল পাচ্ছেন। বিজেপি কলকাতাসহ রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে গতকাল বিক্ষোভ করেছে। এ সময় ৬২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ যাদের মধ্যে ১১ জন নারী।
ঘটনাটি নিয়ে রিপোর্ট তলব করেছে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্¿ণালয়। পরিস্থিতি শান্ত করতে মুখ্যমন্¿ীর প্রতি আহবান জানিয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্¿ণালয়। আজ দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্¿ী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের বৈঠক। সেখানে বিষয়টি নিয়ে রাজ্যপাল রিপোর্ট দিতে পারেন বলে জানা গেছে। সন্দেশখালির পাশাপাশি গতকালও পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি জায়গায় তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সন্দেশখালির ঘটনার প্রতিবাদে আগামী বুধবার কলকাতায় লালবাজার অভিযান করবেন বিজেপির সদ্য জয়ী পশ্চিমবঙ্গের ১৮ এমপি। বসিরহাটে ধর্মঘট এবং রাজ্যজুড়ে আজ কালো দিবস পালনের ঘোষণা দিয়েছে দলটি। ঘটনার প্রেক্ষিতে শান্তি বজায় রাখার আবেদন জানিয়েছেন স্থানীয় এমপি নুসরত জাহান। এদিকে গতকাল পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রামেও বিজেপি এবং তৃণমূল সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সন্দেশখালির ঘটনার প্রতিবাদে রবিবার সন্ধ্যায় কোচবিহারের শিতলকুচিতে বিক্ষোভ মিছিল বের করে বিজেপি। অভিযোগ সেই মিছিল লক্ষ্য করে গুলি চলে। তাতে একজন গুলিবিদ্ধ এবং একজন আহত হয়েছেন। বিজেপির অভিযোগ তৃণমূল সমর্থকরা গুলি চালিয়েছে।
