দেশে করোনা সংক্রমণের চতুর্থ ঢেউ আসার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার সবার জন্য মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করলেও সেই নির্দেশনা মানছে না বেশির ভাগ মানুষ। ঈদযাত্রা ও পশুর হাটসহ সর্বত্র স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত। রাস্তাঘাট, মার্কেট, লঞ্চ, বাস ও রেল স্টেশনসহ সব জায়গাতেই দেখা গেছে মানুষের বেপরোয়া চলাচল। কোথাও মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি। রাজধানীসহ দেশের প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জেও পশুর হাট জমে উঠেছে।
তবে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে ব্যাপক উদাসীনতা দেখা গেছে। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলারও কোনো বালাই নেই। অধিকাংশই মাস্ক পরছে না, স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। কারো-কারো সঙ্গে মাস্ক থাকলেও না পরে সেটি পকেটে, হাতে বা গলায় ঝুলিয়ে রাখছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা সংক্রমণকে উপেক্ষা ঈদ-পরবর্তীতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সবকিছু এমন ঢিলেঢালা চললে ভবিষ্যতে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। সংক্রমণ ব্যাপক হারে বেড়ে যেতে পারে। তাই করোনা সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে জনগণকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তারা।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, ইতিমধ্যে সারা দেশে ঘরে ঘরে জ্বর, সর্দি-কাশি দেখা দিয়েছে। ঈদযাত্রায়ও মানুষের বেপরোয়াভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে সরকার একটি নির্দেশনা দিয়েছে, তবে তার বাস্তবায়ন চোখে পড়েনি। নো মাস্ক, নো সার্ভিস নির্দেশনা বাস্তবায়নে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। একই সঙ্গে জনগণকে সচেতন হতে হবে। নইলে তৃতীয় ঢেউয়ের চেয়ে চতুর্থ ঢেউয়ে মারাত্মক বিপর্যয় দেখা দেবে। চিকিৎসা পেতে আইসিইউয়ের জন্য আবারও হাহাকার শুরু হবে।
করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ বলেন, দেশে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। ঈদুল আজহা উপলক্ষে গরুর হাট ও ঈদযাত্রায় স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত। এতে সংক্রমণ আরো বাড়তে পারে। তাই সব জায়গায় স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, করোনার এক ডোজ নিয়ে অনেকে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও দ্বিতীয় ডোজ নেননি। এ তালিকাও সরকারের কাছে আছে। তাদের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার জন্য যা যা করার দরকার প্রশাসনকে তাই করতে হবে। আর যারা বুস্টার ডোজ নিয়েছেন তাদের পূর্ণাঙ্গ ডোজ নেওয়া হয়েছে, এক্ষেত্রে তাদের ঝুঁকি অনেক কম। তবে যারা এখনো বুস্টার ডোজ নেননি, তাদের দ্রুত বুস্টার ডোজ নিতে হবে। অন্যদিকে যারা কোনো টিকা নেননি, তাদের প্রথম ডোজ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, সবার মাস্ক পরতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। নইলে সংক্রমণ ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়বে। আগের মতো আইসিইউয়ে সিট সংকট দেখা দেবে। একই সঙ্গে তিনি সবার সময়মতো করোনা ভাইরাসের টিকা গ্রহণের পরামর্শ দেন।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল ঈদ সামনে রেখে সবার স্বাস্হ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়ে বলেন, স্বাস্থ্যবিধি না মানলে আমাদের ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে।
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর বলেন, দেশে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। যেহেতু স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না, তাই সংক্রমণ সামনে আরো বাড়বে। উপসর্গ থাকলেও অনেকে পরীক্ষা করছেন না। এটা খুবই বিপজ্জনক। সামনে সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম মূল কারণ হবে এটি। কারণ উপসর্গ দেখা দিলে সংক্রমিত হতে, এক্ষেত্রে সে অন্যকে সংক্রমিত করছে। পরীক্ষা না করালে ঘরে বসে থাকুক। উপসর্গ দেখা দিলে পরীক্ষা করে নিরাপদে থাকতে হবে। অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে, স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে।
দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন সাত জন। আগের দিন এই সংখ্যা ছিল তিন। সে হিসাবে এক দিনের ব্যবধানেই মৃত্যু দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। করোনায় মৃত্যু বাড়লেও একই সময়ে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ কমেছে। আগের দিন করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল ১ হাজার ৭৯০ জনের শরীরে। গত ২৪ ঘণ্টায় সংক্রমণ কমে হয়েছে ১ হাজার ৬১১। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ৯ হাজার ৫৮০টি নমুনা পরীক্ষায় করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৬১১ জনের শরীরে।
