ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছে মানুষ। তবে গণপরিবহনগুলোতে আদায় করা হচ্ছে গলাকাটা ভাড়া। তার পরও বাধ্য হয়ে বেশি ভাড়া দিয়েই গন্তব্যস্থলে ফিরছে লোকজন। এদিকে বাস মালিক ও সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকা থেকে বাস খালি আসার কারণে কিছু টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।
গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী ও গুলিস্তানের বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কর্মজীবীরা পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকায় আসছেন। বিশেষ করে, যাদের ছুটি হয়েছে তারা কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে ঢাকায় ফিরছেন। এ নিয়ে কেউ কেউ আক্ষেপ করে বলেন, এভাবে তিন দিনের জন্য বাড়িতে গিয়ে কষ্ট আরো বেড়েছে।
মোশাররফ হোসেন, আবুল কালাম, সুবোধ সরকার— মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার সুলতানপুরে তাদের গ্রামের বাড়ি। সবাই বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের চতুর্থ শ্রেণির চাকরিজীবী। ঈদের ছুটি শেষে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকামুখী হন। বালিরটেক কালিগঙ্গা সেতুর পশ্চিম পাশ থেকে শুকতারা সার্ভিসে ওঠেন। তারা জানান, ঢাকায় ফেরার তাড়া দেখে সুযোগ নিচ্ছেন বাসচালকরা। ৭৫ টাকার ভাড়ার স্থলে তাদের দিতে হলো ১৫০ টাকা। অতিরিক্তি ভাড়া তাদের মধ্যে গাড়ির কনডাক্টর ও হেলপারের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে হাতাহাতি পর্যন্তও হয়েছে। গাবতলী এসে পুলিশ কন্ট্রোলকে জানান তারা। কিন্তু পুলিশ কিছুই করতে পারে নাই। এ কারণে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ঢাকায় ফেরত আসতে হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেন।
শুধু গাবতলী হরিরামপুর বাস সার্ভিস নয়। পুরো আন্তঃজেলা বাস সার্ভিসগুলোতেও একই চিত্রের খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে, ঢাকা-পাটুরিয়া, ঢাকা-গাজীপুর, ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ, ঢাকা-নরসিংদীসহ বিভিন্ন আন্তঃজেলার চলাচলরত গণপরিবহনে ঈদে ঘরমুখী হতে এবং ঢাকায় ফেরত আসতে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েই যাওয়া-আসা করতে হচ্ছে রাজধানীর কর্মজীবী মানুষদের।
এদিকে করোনার স্বাস্থ্যবিধি মানছে না গণপরিবহন ও নৌপথের যাত্রীরা। ঈদের আগে যেভাবে ঢাকা ছেড়েছেন নগরবাসী। ঈদ শেষে একইভাবে ঢাকা ফিরছেন তারা। অনেককে আবার ঈদের পরে গ্রামের বাড়িতে যেতে দেখা গেছে। ঈদের সময় মানুষের চাপ বেশি থাকায় ঈদের পরে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যেতে দেখা গেছে অনেককেই। এছাড়া নৌযাত্রীদের স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিটি লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে ঢাকায় ফিরতে দেখা গেছে। সামাজিক দূরত্ব তো দূরের কথা, অনেক যাত্রীর মুখে মাস্ক পর্যন্ত ছিল না।
সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েই প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ-আনন্দ ভাগাভাগি করতে গ্রামে গিয়েছিলেন হাজারো কর্মজীবী। ছুটি শেষে আবারও তারা কর্মস্থল ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছেন। এ কারণে দেশের সড়ক-মহাসড়ক, নৌবন্দরসহ অন্যান্য টার্মিনালে রাজধানীমুখী মানুষের চাপ দেখা গেছে। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর টোল প্লাজায় টোল আদায়ে ধীর গতি হওয়ায় যানজট লেগে যায়। এছাড়া পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরিঘাটেও দেখা গেছে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। বেশির ভাগ বাসে মানা হচ্ছে না কোনো স্বাস্থ্যবিধি। রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় আশরাফুল নামের কুমিল্লার এক যাত্রী বলেন, করোনার আগে ঢাকা-কুমিল্লার ভাড়া ছিল ১২০-১৫০ টাকা। কিন্তু এখন ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২৫০-৩০০ টাকা। সিটিং বাসে দাঁড়িয়ে যাত্রী নেওয়ার কথা নয়। তার পরও অতিরিক্ত যাত্রী দাঁড় করিয়ে ঢাকায় আনা হচ্ছে। ঈদের কথা বলে ভাড়া বেশি নেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রতিবাদ করলে তারা জানায়, গাড়ি কম তাই এখন এভাবে যেতে হবে।
ছিদ্দিকুর রহমান নামের খুলনার এক যাত্রী বলেন, গতকাল মঙ্গলবার থেকে অফিস খুলেছে। ঈদের পরে কোনো ছুটি নেই। তাই গতকাল ঢাকায় এলাম। পরিবারের অন্যদের বাড়িতে রেখে এসেছি। আরো কয়েক দিন বেড়াবে। এরপর আসবে। কারণ এখন এলে যাত্রীদের যে চাপ তাতে দুর্ভোগের পাশাপাশি করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে।
ঢাকায় ফেরার তাড়ার সুযোগ নিচ্ছেন চালকরা—এমন অভিযোগ করেছেন আমিনবাজারগামী আশরাফ আলী খান। তিনি বলেন, যাত্রীদের জিম্মি করে প্রকাশ্যে বাড়তি ভাড়া আদায় করছে, অথচ প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। বিষয়টি কেমন যেন লাগছে। যাত্রীদের কথা চিন্তা করে চালকদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। বাড়তি ভাড়া তো আদায় করছেই, সেই সঙ্গে খারাপ ব্যবহারও করছে। বাড়ি থেকে ফিরতে এমনিতেই মন-মেজাজ খারাপ থাকে। তার মধ্যে বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, পদ্মা সেতু হয়ে যাতায়াতকারী প্রতিটি রুটে বিভিন্ন নন ব্র্যান্ডের বাসে দ্বিগুণ ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চলছে। এছাড়াও খ্যাতনামা ব্যান্ডের বাসগুলো বিদ্যমান ভাড়ায় যাত্রী বহন করলেও কোনো কোনো পথে যাত্রীসাধারণকে স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের ক্ষেত্রে বেশি দূরত্বের টিকিট কিনতে বাধ্য করছে। এতে করে নিম্ন আয়ের মানুষ, শ্রমজীবী, কর্মজীবী, দিনমজুর—এ ধরনের স্বল্প আয়ের মানুষজনকে পণ্যবাহী ট্রাকে-পিকআপে স্বল্পভাড়ায় যাতায়াতে বাধ্য হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের তদারকি প্রয়োজন।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যাত্রী হয়রানির বিষয়টি স্বীকার করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ্ বলেন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না করা ও যাত্রীদের হয়রানি বন্ধ করতে ঈদের আগেই পরিবহন অফিসগুলোতে নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। গড় হারে সবাই অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছে না, কিছু অসৎ লোক সুযোগ বুঝে এ ভাড়া আদায় করছে।
