শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আহসান মঞ্জিলে বাড়ছে দর্শনার্থীর ভিড়

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২২, ০৪:০২

রাজধানী ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনা আহসান মঞ্জিল। ১৮০০ শতকের এই নান্দনিক স্থাপনাটি বর্তমানে ঢাকার অন্যতম জাদুঘরে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী ভিড় জমায় প্রাচীন এই স্থাপনা দেখতে। রাজধানীর পুরান ঢাকার ইসলামপুরের কুমারটুলী এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে এর অবস্থান। এটি ছিল ঢাকার নবাবদের আবাসিক প্রাসাদ।

ঈদের এই সময়ে প্রাচীন এই স্থাপনাটি দেখতে কেউ পরিবার নিয়ে এসেছেন, কেউ আবার বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে এসেছেন। কেউ আবার এবারই প্রথম ঘুরতে এসেছেন। রাজধানীর যে কোনো প্রান্ত থেকে সর্বোচ্চ ঘণ্টাখানেক সময় লাগে আহসান মঞ্জিলে পৌঁছাতে। অন্য সময়ের চেয়ে ঈদের ছুটিতে এই স্থাপনা দেখতে ভিড় করেছেন সব শ্রেণিপেশার মানুষ। গতকাল বুধবার রাজধানীর সদরঘাট এলাকায় অবস্থিত আহসান মঞ্জিলে গিয়ে দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা যায়।

জানা যায়, আহসান মঞ্জিলকে ঘিরে দর্শনার্থীদের আগ্রহের কথা। এলাকার বাসিন্দা আনজির হোসেন ও মিরাজ মিয়া বলেন, পুরান ঢাকার ইতিহাস সমৃদ্ধ হওয়ার পেছনে আহসান মঞ্জিলের ভূমিকা অতুলনীয়। বর্তমান সময়ে মুক্ত পরিবেশে আড্ডা দেওয়ার উৎকৃষ্ট স্থানে পরিণত হয়েছে এই স্থাপনাটি। আহসান মঞ্জিল ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ প্রজন্মের কাছে আহসান মঞ্জিলের ইতিহাস ও এর সৌন্দর্য অনন্য। তারা বলেন, আহসান মঞ্জিল থেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পথ শুরু। ১৯০৬ সালে সেখান থেকেই মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। বনশ্রী থেকে আসা মাহি আলম বলেন, এখানে আসার আগে গুগলে সার্চ করে এই নবাবদের সম্পর্কে অনেক কিছুই জেনে নিয়েছি। যদিও আগেও জানতাম, কিন্তু আবার সেটা পড়ে নিয়েছি। অনেকবার বন্ধুদের সঙ্গে আসা হয়েছে। এবার আমার স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে আসলাম। সাধারণত সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত মঞ্জিল খোলা থাকে। কিন্তু এখন ঈদের ছুটির পাশাপাশি লোকজনের চাপ অনেক বেশি।

ইতিহাস থেকে জানা যায়—অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জামালপুরের জমিদার শেখ ইনায়েতউল্লাহ আহসান মঞ্জিলের স্থানে ‘রংমহল’ নামে একটি প্রমোদভবন তৈরি করেন। পরবর্তী সময়ে ঐ জমিদারের পুত্র শেখ মতিউল্লাহ রংমহলটি ফরাসি বণিকদের কাছে বিক্রি করে দেন। তখন ‘বাণিজ্য কুঠি’ হিসাবে এটি দীর্ঘ দিন পরিচিত ছিল। এরপর ১৮৩০ সালে বেগমবাজারে বসবাসকারী নওয়াব আবদুল গণির পিতা খাজা আলীমুল্লাহ এটি কিনে বসবাস শুরু করেন। এই বাসভবনকে কেন্দ্র করে খাজা আবদুল গণি মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানি নামক একটি ইউরোপীয় নির্মাণ ও প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেন। যার প্রধান ইমারত ছিল আহসান মঞ্জিল। ১৮৫৯ সালে নওয়াব আবদুল গণি প্রাসাদটি নির্মাণ শুরু করেন, যা ১৮৭২ সালে সমাপ্ত হয়। তিনি তার প্রিয় ছেলে খাজা আহসান উল্লাহর নামানুসারে এর নামকরণ করেন ‘আহসান মঞ্জিল’। ঐ যুগে নবনির্মিত প্রাসাদ ভবনটি রংমহল ও পুরোনো ভবনটি অন্দরমহল নামে পরিচিত ছিল।

১৮৮৮ সালের ৭ এপ্রিল প্রবল ভূমিকম্পে পুরো আহসান মঞ্জিলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ক্ষতিগ্রস্ত আহসান মঞ্জিল পুনঃনির্মাণ করা হয়। সে সময় বর্তমান উঁচু গম্বুজটি সংযোজন করা হয় বলে জানা যায়। সেই আমলে ঢাকা শহরে আহসান মঞ্জিলের মতো এমন নান্দনিক ভবন আর ছিল না, এই প্রাসাদের গম্বুজটি শহরের অন্যতম উঁচু চূড়া বলে বহুদূর থেকে এটি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করত।

দ্বিতীয়বারের মতো ১৮৯৭ সালে ১২ জুন ঢাকায় ভূমিকম্প আঘাত হানলে আহসান মঞ্জিলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। পরবর্তীকালে নবাব আহসানউল্লাহ তা পুনঃনির্মাণ করেন। ১৯৫২ সালে জমিদারি উচ্ছেদ আইনের আওতায় ঢাকা নওয়াব এস্টেট সরকার অধিগ্রহণ করে। কিন্তু নবাবদের আবাসিক ভবন আহসান মঞ্জিল এবং বাগানবাড়ি অধিগ্রহণের বাইরে থাকে। কালক্রমে অর্থাভাব ও নবাব পরিবারের প্রভাব কমে যাওয়ায় আহসান মঞ্জিলের রক্ষণাবেক্ষণ দুরূহ হয়ে পড়ে। আহসান মঞ্জিলের গম্বুজটি ভূমি থেকে উচ্চতা ২৭ দশমিক ১৩ মিটার। গম্বুজের সৌন্দর্য দর্শনার্থীদের মন ছুঁয়ে যায়। আহসান মঞ্জিলের প্রতিটি কক্ষ ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে এ যাবত সংগৃহীত নিদর্শন সংখ্যা মোট ৪০৭৭টি।

ইত্তেফাক/ইআ