বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সুবর্ণচরে তরমুজ চাষে লাভবান কৃষক, বাড়ছে আবাদ 

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২২, ১১:৩৬

নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় লবনাক্ত জমি এবং ডোবা-নালাতে গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষ করে লাভবান হচ্ছেন কৃষকেরা। এতে করে সম্প্রসারিত হচ্ছে আবাদ, কম সময়ে বেশি ফলন পাওয়ায় গ্রীষ্মকালীন এ তরমুজ চাষে ঝুঁকছেন চরাঞ্চলের কৃষকেরা। 

উপজেলার চরবাটা ইউনিয়নের শিবচর এলাকার  শ্রীবাস দাস একজন কৃষক। তিনি জানান, তার লবনাক্ত জমি খালি পড়ে থাকতো, তিনি জমিতে চাষ করতে পারেন, ফলন হবে, লাভবান হবেন, তা ছিল কল্পনার বাইরে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার অনুপ্রেরণায় এখন তার জমি থেকে আয়ের মুখ দেখেছেন। 

চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে এ প্রথমবার ৫০ শতক জমিতে তরমুজ চাষ করেন তিনি। ভালো ফলন হয়েছে। এ জমিতে চাষে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা। এখনো পর্যন্ত (গতকাল সোমবার) তার তরমুজ বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। বাগানে থাকা তরমুজ সামনের কয়েক দিনে আরও ২০-৩০ হাজার টাকা বিক্রি হবে বলে আশা করছেন তিনি। তরমুজ চাষ করে তিনি মহাখুশি। আগামী মৌসুমে আরও জমিতে তরমুজ চাষ করবেন বলে জানান শ্রীবাস দাস।

দক্ষিণ চর মজিদের কৃষক মো. সিরাজ মিয়া গত মৌসুমেও তরমুজ চাষ করেছেন ৬০ শতক জমিতে। খরচ হয়েছে তার ৩০ হাজার টাকা। গত বছর ফলন ভালো হয়েছে,  লাভ পেয়েছেন ৭০ হাজার টাকা। এবার একই জমিতে চাষেও একই টাকা খরচ হয়েছ। বাগানে ফলন ভালো হয়েছে। এ পর্যন্ত (গতকাল সোমবার) তার বিক্রি হয়েছে ১৬ হাজার টাকা। সামনে ১০-১৫ দিনের মধ্যে বিক্রি হবে বাগানের সব তরমুজ। এবারও অনেক টাকা লাভের আশা করছেন তিনি। 

সিরাজ মিয়া বলেন, কৃষি কর্মকর্তার অনুপ্রেরণায় আমি তরমুজ চাষ করতে উৎসাহী হয়েছি। এতে আমার আর্থিক সচ্ছলতা বেড়ে স্বাবলম্বী হয়েছি। তরমুজের ভালো ফলন ও লাভ দেখে এলাকায় আরও কয়েকজন কৃষক তরমুজ চাষ করেছেন। 

মো. হানিফ দক্ষিণ চরমজিদের আরেকজন কৃষক। তার এলাকার মো. সিরাজ মিয়ার তরমুজ চাষে লাভ দেখে এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার অনুপ্রেরণায় তিনি ৯০ শতক অনাবাদি জমিতে এ মৌসুমে তরমুজ চাষ করেছেন। এতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। তার ফলন আসতে আরও ১৫-২০ দিন সময় লাগবে। 

ফলন ভালো হয়েছে। জানালেন অনেক টাকা লাভের আশা করছেন তিনি। তার শ্যালক ফারুকও দক্ষিণ চর মজিদে ৫০ শতক জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। ভালো লাভ করবেন বলে জানালেন মো. হানিফ।

সাধারণত শীত মৌসুমে তরমুজের চাষ হয়ে থাকে। গ্রীষ্ম অথবা বর্ষার মৌসুমে তরমুজ চাষের মৌসুম নয়। গ্রীস্মের মৌসুমে পতিতও অনাবদী জায়গায় কৃষকদের তরমুজের চাষ করতে উৎসাহিত করেছে কৃষি বিভাগ। গত বছর উপজেলা কৃষি বিভাগ পরীক্ষামূলকভাবে উপজেলার চরবাটা, পূর্ব চরবাটা, চরক্লার্ক, চরজুবলি ও ওয়াপদা ইউনিয়ন এলাকায় ৪ হেক্টর জমিতে ইয়োলো ড্রাগন, ব্ল্যাক কুইন ও  ব্ল্যাক হানি জাতের তরমুজ চাষ করে। এই উৎপাদিত তরমুজ বিক্রি করে লাভবান হওয়ায় চরাঞ্চলে কৃষকদের মাঝে সাড়া জাগে এবং চাষে ব্যাপকভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠেন সবাই। ফলে চলতি মৌসুমে ১০ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে সুবর্ণচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশীদ বলেন, ৯৯ ভাগ সরকারি অর্থায়নে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এসএসিপি প্রকল্পের আওতায় বীজ, সার ও ঔষধ সরবরাহ করে গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এখানকার মাটি ও আবহাওয়া গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষে উপযোগী।

এপ্রিল অথবা মে মাসে মালচিং, স্বজন, পেপার ব্যবহার, সমতল জমিতে মাচা পদ্ধতি ব্যবহার করে তরমুজের বীজ বপন করা হয়। এর দুই মাস পর ফলন পাওয়া যায়। পরের এক মাসের মধ্যে ফলন বিক্রি শেষ হয়। উৎপাদিত এই তরমুজ চড়া দামে বিক্রি করে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। বাজারে এ তরমুজের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পাইকারী দামে প্রতি কেজি তরমুজ বিক্রি হচ্ছে ৬০-৭০ টাকায়। খূচরা বাজারে ৮০-১০০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। 

তরমুজের ফলনে খুশি কৃষক

এ তরমুজ শীতকালীন তরমুজের চেয়েও অনেক বেশি সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে ভিটামিন এ, বি, সি, ডি ও বিভিন্ন খনিজ পদার্থ। তরমুজ চাষে মালচিং, স্বজন, পেপার ব্যবহার, সমতল জমিতে মাচা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করে ভালো ফলন পাওয়া গেছে। এবার উৎপাদিত তরমুজ জেলার বাইরে ঢাকাতেও সরবরাহ করা হয়েছে।

তিনি জানান, ১০ হেক্টর জমির মধ্যে পূর্ব চরবাটা ৫০ ভাগ, চরবাটা ২৫ ভাগ, চরক্লার্কে ১৫ ভাগ এবং চরজুবলিতে ১০ ভাগ জমিতে তরমুজের চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে উৎপাদন খরচ ধরা হয়েছে ৮২ হাজার ২৪০ টাকা। এতে উৎপাদন ফসলের লাভ ধরা হয়েছে (৬০ টাকা দামে) ১ লাখ ৯২ হাজার টাকা। 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশীদ আরও বলেন, গতানুগতি ধারায় শশা চাষ করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা যদি এ মৌসুমে সর্জন (মাছ+সবজি) পদ্ধতিতে গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষ করে তাহলে তারা আরো লাভবান হবেন। গত মৌসুমে ১২ জন এবং চলতি মৌসুমে ৩৬ জন কৃষক তরমুজ চাষ করেছেন। সামনে চাষীর সংখ্যা আরো বাড়বে। 

কৃষি বিভাগের লক্ষ্য হচ্ছে পতিত জমি চাষের আওতায় এনে তা সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকদের লাভবান করা। এখনাকার উৎপাদিত  তরমুজ ভবিষতে সুবর্ণচরের চাহিদা মিটিয়ে সারাদেশে সরবরাহ করতে পারবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

ইত্তেফাক/মাহি