নজরদারির আওতায় ৬৭ হাজার দেশি মাছ ধরার নৌকা
সৈয়দ আবদুল ওয়াজেদ, চট্টগ্রাম অফিস
অজ্ঞতা ও আর্থিক অসচ্ছলতাই দীর্ঘদিন ধরে সামুদ্রিক সম্পদ ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় বিপুলসংখ্যক জেলে দেশি মাছ ধরার নৌকায় বঙ্গোপসাগরে এ কাজটিই করেছেন বলে সামুদ্রিক মত্স্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত। বিশেষজ্ঞরা জানান, সরকার এ পরিস্থিতির অবসানে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। গত ২০ মে থেকে আগামী ২৩ জুলাই পর্যন্ত টানা ৬৫ দিন সামুদ্রিক মাছ আহরণের উপর নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন—সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ, উত্পাদন ও আহরণে বিগত সময়ে কোনো নিয়ম-নীতির বালাই ছিলো না। অতীতে নিষেধাজ্ঞার সময়েও জেলেরা বঙ্গোপসাগরে বেপরোয়া মাছ শিকার করেছেন। ফলে এক পর্যায়ে সমুদ্রে নানা প্রজাতির মাছের পরিমাণও হ্রাস পায়। এটাকে বিশেষজ্ঞরা ‘ওভার ফিশিং’ আখ্যায়িত করে বলেন, এখন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম চলতে দেওয়া হবে না। সেই লক্ষ্যে সরকারও জেলেদের জীবনমানের উন্নয়ন ও পুনর্বাসনের কার্যক্রম শুরু করেছে। নজর রাখা হচ্ছে উপকূলীয় জেলেদের ব্যবহূত ৬৭ হাজার দেশি মাছ ধরার নৌকার উপর। সেই সঙ্গে নজর রাখা হচ্ছে চিংড়ি পোনা সংগ্রহের নামে উপকূলে বেহুন্দি ও মশারি জাল ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা ধ্বংসকারী মৌসুমি মাছ শিকারিদের উপরও।
এদিকে বঙ্গোপসাগরের মাছ ও সামুদ্রিক সম্পদের সুরক্ষায় প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা আর্থিক বরাদ্দে সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রজেক্ট নামের একটি প্রকল্প কাজ শুরু করেছে। বাংলাদেশের মত্স্য সেক্টরে গৃহীত প্রকল্পের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় প্রকল্প। সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পের উপ-পরিচালক অধীর চন্দ্র দাশ ইত্তেফাককে বলেন, নীতিমালার আলোকে প্রকল্পের অধীনে দেশের উপকূলীয় ৫৪ হাজার সামুদ্রিক মাছ শিকারী জেলেকে স্বাবলম্বী করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে করা হবে তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। এ ব্যাপারে ধাপে ধাপে প্রথমে প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং পরে জেলেদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা হবে। এরমধ্যে প্রথমে একটি জেলে পরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে ১ জন প্রবীণ সদস্যই সমুদ্রে মাছ ধরতে যাবেন। অন্য নারী-পুরুষ সদস্যকে প্রচলিত শিক্ষায় শিক্ষিত করা হবে। তাদেরকে যুক্ত করা হবে বিকল্প জীবিকা ও পেশায়। যাতে তাদের পারিবারিক সচ্ছলতা ও মানোন্নয়নে বহুমুখী উেসর দ্বার খুলে যায়।
উপ-পরিচালক অধীর চন্দ্র দাশ জানান, দেশের সমুদ্র সীমানা এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার। গবেষণা জাহাজ ‘আরভি মীন সন্ধানী’র মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরেও শুরু হয়েছে গবেষণা ও অনুসন্ধানের কাজ। গত তিন বছরে এই গবেষণা জাহাজটি যে গবেষণা ও অনুসন্ধান করেছে তার ‘কোয়ার্টারলি’ তথ্য উপাত্ত শীঘ্রই উপস্থাপন করা হবে। তবে এই ধরনের গবেষণার পূর্ণাঙ্গ ফলাফল পেতে কমপক্ষে ১০ বছর সময় লাগে। ফলে ‘মীন সন্ধানী’র এই প্রক্রিয়া আগামী আরো সাত বছর ধাপে ধাপে চলবে। আগামী ১৭ জুন বিশ্বব্যাংকের একটি বিশেষজ্ঞ টিম প্রকল্পের কর্মতত্পরতা পরিদর্শনে দেশ সফরে আসছে। বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (আইডিএ) এই প্রকল্পে মোট বরাদ্দের ৮৫ শতাংশ অর্থের যোগান দিচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার দিচ্ছে ১৫ শতাংশ অর্থ। এই প্রকল্পের শুরুতেই বঙ্গোপসাগরের মাছ ও সামুদ্রিক সম্পদের সুরক্ষায় উপকূলীয় বিভিন্ন ‘এন্ট্রি-এক্সিট’ পয়েন্টে ১৬টি মেরিন ফিশারিজ সার্ভিলেন্স চেকপোস্ট বসানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
সমুদ্রে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন প্রথম মাসের প্রান্তিকে গত তিন জুন প্রতিটি জেলে পরিবারকে ৪০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় মাসের বরাদ্দ কার্যক্রম শুরু হবে ১৯ জুনের পর থেকে। বঙ্গোপসাগরে সক্রিয়ভাবে মাছ ধরে এরকম চার লক্ষ ১৭ হাজারের বেশি জেলে পরিবারের সদস্যকে এ চাল প্রদান করা হচ্ছে। এতে জেলেরা উপকৃত হচ্ছেন এবং টাকার জন্য নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকছে।
