ধন-সম্পদের মোহ ও মনের পাশবিকতা দূরীকরণের মহান শিক্ষা নিয়ে প্রতি বছর আসে পবিত্র কোরবানি। কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং ইসলামের একটি অন্যতম ঐতিহ্য। প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার কোরবানি হয়। এর মাধ্যমে প্রথমত যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হলো—অর্থনৈতিক লেনদেন বৃদ্ধি পাওয়া। কোরবানির গরু ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে ধনীদের সম্পদের কিছু একটা অংশ দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছে। গরিব মানুষ সারা বছর গরু লালনপালন করে কোরবানির হাটে নিয়ে আসে। গরিব মানুষ একসঙ্গে গরুর টাকা পেয়ে তাদের চাহিদা পূরণ করে। গরিবের অর্থনৈতিক চাকা সচল হয়। তাদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ফলে গ্রামগঞ্জের বাজারগুলো সচল হয়ে ওঠে। এজন্য সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, ঈদুল আজহায় পশু কেনাবেচা বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি খুঁটি। (বিবিসি বাংলা)।
এবার ১ কোটিরও ওপরে কোরবানি করা হয়েছে। এই কোরবানিকে কেন্দ্র করে দেশে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, গবাদি পশু খামারি ও চামড়া শিল্পপ্রতিষ্ঠান। কোরবানির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের ট্যানারি শিল্পগুলো। এই শিল্পে বার্ষিক বিনিয়োগ প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। যার মধ্যে ৫০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়ে থাকে সরকারি ব্যাংক এবং ১০০ কোটি টাকার মতো বেসরকারি ব্যাংকগুলো। কোরবানির চামড়ার বহুমুখী উপকারিতা আমরা লক্ষ করি। একদিকে চামড়া ব্যবসায়ীরা উপকৃত হয়, অন্যদিকে গরিব অসহায় মানুষগুলোকে এই চামড়ার পুরো টাকাটা দান করতে হয়। এতেও গরিব মানুষ কোরবানির মাধ্যমে লাভবান হয়। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান। আবার কোরবানির মাংসের রান্নাবান্নার মসলার বাজার প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার মতো, গবাদি পশু আনা-নেওয়া, বাজারজাতকরণ, পশুখাদ্য, ঈদে ঘরমুখী মানুষের জন্য পরিবহনসুবিধা, কোরবানির ঈদকেন্দ্রিক কামারদের কর্মব্যস্ততা, ইলেকট্রনিক ব্যবসায়ীদেরও ব্যাপক বিনিয়োগ থাকে।
কোরবানির অন্যতম এক বিধান এটি যে, কোরবানির গোশতের এক-তৃতীয়াংশ আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে বিলি করতে হয়, এক-তৃতীয়াংশ গরিব-মিসকিনদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হয়। এর মাধ্যমে ধনীদের ঘরে সঞ্চিত সম্পদ থেকে কিছুটা হলেও ভাগ পায় গরিব মানুষ। গরিবের উনুন গোশতের ঘ্রাণে মুখরিত হয়ে ওঠে। গরিব শিশুরা কোরবানির গোশত পেয়ে যারপরনাই খুশি হয়। কোরবানির দিন গরিব-দুখী সকল মানুষের ঘরে গোশত রান্না হয়। সবাই একই ধরনের আহার গ্রহণ করতে পারে। কোরবানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক মহত্ত্ব এখানেই। ঊর্ধ্বমুখী বাজারের পাগলা ঘোড়ায় চড়ে এমন অনেক গরিব মানুষ আছেন, যারা সারা বছরে এক টুকরো গোশতের ঘ্রাণও নিতে পারে না। কোরবানির এই সুন্দর প্রথার কারণে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে পারস্পরিক মিল-মোহাব্বত আরো বৃদ্ধি পায়। সামাজিক ঐক্য ও সংহতি আরো মজবুত হয়। কোরবানির মাংস গরিব আত্মীয়স্বজন পাড়া-প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করার যে বিধান তার মধ্যে নিহিত রয়েছে সামাজিক সমতার মহান আদর্শ।
কোরবানির দিন পরিশ্রমী গরিব মানুষের চাহিদা থাকে অনেক বেশি। তারা সামর্থ্যবান ধনীদের কোরবানির গোশত কেটে দিয়ে নগদ পয়সা উপার্জন করে। উপরন্তু তারা অতিরিক্ত কিছু গোশতও পায়। ঈদের দিনে তাদের একদিকে আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে অতিরিক্ত গোশত খাওয়ার তথা পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভালো খাবারের আয়োজনেরও সুযোগ হয়। দেশে যত বেশি কোরবানি হবে, তত বেশি গরু-ছাগল খামারিদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হবে। কোরবানি বেশি হলে চামড়াশিল্পের বিকাশ দ্রুত হবে। কোরবানি হলো গরিব-অসহায়, দুঃখী-দুস্থদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। এভাবে কোরবানির বিষয়টি চিন্তা করলে দেখা যায় যে, কোরবানির রয়েছে বহুমুখী অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিধা। এর মাধ্যমে অর্থের কোনো অপচয় হয় না। কোরবানির প্রতিটি বিষয় মানুষের উপকারে আসে। গরিবের কল্যাণে আসে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
