অবশেষে বরফ গলেছে। রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে খাদ্যশস্য নিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার তুরস্কের ইস্তাম্বুলে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। এ সময় জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেস এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান উপস্থিত ছিলেন। চুক্তি স্বাক্ষরের খবরেই বিশ্ব বাজারে খাদ্যশস্য বিশেষ করে গমের দাম কমেছে। খবর বিবিসি ও আলজাজিরার।
খাদ্যশস্য নিয়ে চুক্তি: খাদ্যশস্য রপ্তানি নিয়ে গত বেশ কিছুদিন ধরে তুরস্কের মধ্যস্থতায় রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে বৈঠক চলছিল। কিন্তু কোনোপক্ষই সমাধানসূত্রে পৌঁছাতে পারছিল না। শেষ পর্যন্ত তারা সহমত পোষণ করে। এর ফলে ইউক্রেনে আটকে থাকা প্রায় ২০ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে দেওয়া যাবে। জাতিসংঘ এবং তুরস্ক এই বৈঠকে মধ্যস্থতার ভূমিকা নিয়েছিল। সেজন্যই চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার আগে তড়িঘড়ি তুরস্কে যান জাতিসংঘের প্রধান আন্তেনিও গুতেরেস। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানও চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ইউক্রেন সরাসরি রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেনি বলে জানিয়েছে। যদিও তাদের প্রতিনিধিরাও চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তি স্বাক্ষরের পর দুই দেশের প্রতিনিধিরা হাতও মেলাননি। ইউক্রেন বিশ্বে খাদ্যশস্য রপ্তানির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দেশ। কিন্তু ইউক্রেনে হামলার পর রাশিয়া কৃষ্ণ সাগর দিয়ে খাদ্যশস্য রপ্তানিতে বাধা দিচ্ছিল।
বিশ্বে খাদ্যের ১০ ভাগের এক ভাগ সরবরাহ করে রাশিয়া ও ইউক্রেন। বৈশ্বিক গম রপ্তানির ৩০ শতাংশের পাশাপাশি সূর্যমুখী তেলের ৬০ শতাংশ উৎপাদন করে তারা। অন্তত ২৬ দেশ তাদের অর্ধেকেরও বেশি খাদ্যশস্যের জন্য রাশিয়া-ইউক্রেনের ওপর নির্ভরশীল। এই চুক্তির ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রপ্তানি চালু করতে পারবে ইউক্রেন। দেশটিকে এ জন্য যথাযথ নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেবে রাশিয়া। এখন পর্যন্ত দেশটির ওডেসা বন্দর রুশ দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত আছে। সেখান দিয়েই এই পণ্য কৃষ্ণ সাগর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হবে।
চুক্তি অনুযায়ী খাদ্যশস্য রপ্তানির অজুহাতে জাহাজে অস্ত্র যায় কিনা সেই বিষয়টি নজরদারি করবে তুরস্ক। কারণ রাশিয়া এই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল বারবার। সেই উদ্বেগ নিরসনের অঙ্গীকার করায় রাশিয়া চুক্তি স্বাক্ষরে রাজি হয়। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেস চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি এই চুক্তিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং উন্নয়নশীল দেশের জন্য ‘আশার আলো’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এর মাধ্যমে ইউক্রেনই বেশি লাভবান হবে বলে তিনি জানান। তবে রাশিয়া চুক্তি ভঙ্গ করলে জাতিসংঘ দেশটিতে শাস্তি দিতে পারবে না বলেও জানান গুতেরেস। এই চুক্তি করাটা অনেক কঠিন ছিল বলে গুতেরেস জানান। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেছেন, এই চুক্তিটি লাখ লাখ মানুষকে দুর্ভিক্ষের হাত থেকে রক্ষা করবে। খাদ্যে মুদ্রাস্ফীতিও কমাতে সহায়তা করবে। শিগগিরই খাদ্যশস্য রপ্তানি শুরু হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পুতিন ও যুবরাজের ফোনালাপ
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান টেলিফোনে কথা বলেছেন। এ ফোনালাপে জ্বালানি তেলের বিশ্ব বাজার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সৌদি যুবরাজ সালমান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মধ্যে বৈঠকের এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে বৃহস্পতিবার পুতিন ও সৌদি শাসকের মধ্যে এই ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হলো।
রুশ সচিবালয় ক্রেমলিন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পুতিন ও সৌদি যুবরাজ বিশ্ব তেল বাজারের পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তারা ওপেক প্লাস গ্রুপের সহযোগিতা জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সৌদি নেতৃত্বাধীন ওপেক তেলের বাজার সমন্বয় ও ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে অনেক বছর ধরে রাশিয়াসহ অন্যান্য তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রেখে আসছে। ওপেক প্লাস গ্রুপটি করোনা ভাইরাস মহামারিকালে তেলের উৎপাদন হ্রাস করে তেলের বাজারে মূল্য ধস রোধ করে বাজার স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে।
করোনা বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের পরে বেশির ভাগ দেশে তেলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ওপেক প্লাস ধীরে ধীরে উৎপাদন বৃদ্ধি করে। ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযানের কারণে তেলের সরবরাহ নিয়ে আবার উদ্বেগ সৃষ্টি হয়, এতে তেলের দাম বেড়ে চলিত বছর ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়েছে। ক্রেমলিন বিবৃতিতে বলেছে, পুতিন ও সৌদি যুবরাজ ওপেক প্লাস সদস্যদের সহযোগিতায় বিশ্বে জ্বালানি তেলের বাজারে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে বলে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
