বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৩ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ঢিলেঢালা নিরাপত্তায় বেপরোয়া অপরাধীরা, এক বছরে চবিতে আট ছাত্রীকে হেনস্তা

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২২, ০২:০৪

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও শাটল ট্রেনে গত এক বছরে ছাত্রীর যৌন হয়রানি ও হেনস্তার অন্তত আটটি ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগও গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়েছে। কিন্তু ভুক্তভোগীরা বলছেন, আজ পর্যন্ত একটিও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হয়নি। আলোর মুখ দেখেনি তদন্ত রিপোর্ট।

অভিযোগ রয়েছে, পেশাদার অপরাধীদের পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করেও ক্যাম্পাসে নানা ধরনের অপরাধমূলক ঘটনা ঘটছে। যৌন নিপীড়ন ও হেনস্তার ঘটনা তদন্তে উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই বছর আগে গঠিত হয় ‘যৌন হয়রানি নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্র’। কমিটির আহ্বায়ক হচ্ছেন উপাচার্য শিরীন আখতার। এ কমিটির কাছে তিনটি ঘটনার অভিযোগ জমা পড়লেও এখন পর্যন্ত একটিরও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি। কমিটির মেয়াদ পার হয়ে গেলেও নতুন করে আর কমিটি হয়নি।

এদিকে, নিজেদের পরিচিত ক্যাম্পাস ও শাটল ট্রেনে বারবার নিপীড়ন ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন ছাত্রীরা। ক্যাম্পাসে চলাফেরা করতে গিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন ছাত্রীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বারবার এসব ঘটনার পেছনে মূল কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অপ্রতুল নিরাপত্তা ব্যবস্হা। জানা গেছে, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্টে যত নিরাপত্তা কর্মী থাকা প্রয়োজন বাস্তবে তার অর্ধেকও নেই। বিশেষ করে বোটানিক্যাল গার্ডেন, ফরেস্ট্রির রাস্তা, হতাশার মোড়, ছাত্রী হল এলাকা, শহিদ মিনার, জীববিজ্ঞান অনুষদ ও মেরিন সায়েন্সেস এবং ফিশারিজ অনুষদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা ব্যবস্হা খুবই নাজুক। নেই পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা ও আলোর ব্যবস্হা। ক্যাম্পাসের অনেক পয়েন্টেই পুলিশ টহল দেয় না। সন্ধ্যা নামলেই ক্যাম্পাসে বিরাজ করে ভূতুড়ে অবস্হা। শুধু ছাত্রীদের শ্লীলতাহানিই নয়, বিভিন্ন সময়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে ক্যাম্পাসে। এসব সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা দপ্তরের প্রধান আব্দুর রাজ্জাক ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের সব জায়গায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গেলে আরো প্রচুর লোকবল প্রয়োজন। এই ক্যাম্পাস বিশাল। আমরা এখন চাইলেও সব জায়গায় নিরাপত্তা কর্মী দিতে পারি না। জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীন আখতার ইত্তেফাককে বলেন, ক্যাম্পাসে বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আমাদের ক্যাম্পাস বিশাল। আমরা পুরোটা সিসিটিভির আওতায় নিয়ে আসব। নিরাপত্তার ব্যাপারে যা যা পদক্ষেপ দরকার তা আমরা নেব।

এক বছরে যত ঘটনা

গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে হেনস্তার শিকার হন দুই ছাত্রী। জড়িত চার জনই শাখা ছাত্রলীগের উপগ্রুপ সিএফসির কর্মী। এর বিচারও ছিল তদন্ত কমিটি গঠন পর্যন্তই। এরপর গত ১১ অক্টোবর এক ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে এক নির্মাণশ্রমিককে আটক করেন শিক্ষার্থীরা। তাকে প্রক্টর অফিসে নিয়ে গেলে বিষয়টি স্বীকার করে সে। পরে তাকে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় ৩০ জুন ক্যাম্পাসের গোলচত্বর এলাকায় দুই ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করে এক অটোরিকশা চালক। এ ঘটনায় প্রক্টরিয়াল বডি একটি মুচলেকা নিয়ে চালককে ছেড়ে দেয়। একই দিন এক ছাত্রীকে হেনস্তার অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগের একজন কর্মীর বিরুদ্ধে। ঐ ছাত্রী প্রক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। তবে কোনো প্রতিকার পাননি। এর আগে গত ১৪ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ে শাটল ট্রেনে ধর্ষণচেষ্টার শিকার হন এক ছাত্রী। অজ্ঞাতনামা দুই যুবকের বিরুদ্ধে ঐ অভিযোগ ওঠে। সাড়ে তিন মাস হতে চললেও এখনো কাউকে শনাক্তই করা যায়নি।

সর্বশেষ, গত রবিবার রাতে প্রীতিলতা হল এলাকায় যৌন নিপীড়নের শিকার হন এক ছাত্রী। এ সময় তাকে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণও করা হয়। এর প্রতিবাদে ও নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে উত্তাল রয়েছে ক্যাম্পাস। এ ঘটনায় পাঁচ জনকে অভিযুক্ত করে মামলা হয়েছে হাটহাজারি থানায়। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও গঠন করেছে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি। এর সঙ্গে জড়িত দুই জন শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর ড. রবিউল হাসান ভুঁইয়া। তবে তদন্তের স্বার্থে তিনি তাদের পরিচয় জানাতে চাননি।

ইত্তেফাক/এএইচপি