কারসাজিতে জড়িত তিন পক্ষই

এক ব্যাংক থেকে ৮৫ কোটি টাকার ঋণ নিয়ে আরেক ব্যাংকের মাধ্যমে বিল উত্তোলন

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৯

২০২৬ সালের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপাতে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ওয়ার্ক অর্ডার দেখিয়ে গত বছর প্রিমিয়াম ব্যাংকের মতিঝিল শাখা থেকে ৮৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিংয়ের স্বত্বাধিকারী আবু নাসের সরকার (দুলাল)। কিন্তু এনসিটিবির বিলের টাকা অন্য ব্যাংকের মাধ্যমে উত্তোলন করেন। ১০ মাস ধরে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করছেন না।  এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এনসিটিবিতে লিখিত চিঠি দিয়েছে প্রিমিয়াম ব্যাংক মতিঝিল শাখা। চিঠির একটি কপি ইত্তেফাকের কাছে এসেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘ওয়ার্ক অর্ডার দেখিয়ে ঋণ নেওয়া হয়েছিল। বিলের টাকা জমা দিয়ে ঋণ পরিশোধের কথা ছিল। কিন্তু প্রতারণার মাধ্যমে বিলের টাকা জমা না দিয়ে অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হয়েছে।’

জানা গেছে, ২০২৬ সালে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ পেয়েছিল সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং। এদিকে ১৩০ কোটি টাকার ২০২৭ সালের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ পেয়েছে ছাপাখানাটি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রিমিয়াম ব্যাংকের টাকা পরিশোধ না করে দুলাল এনসিসি ব্যাংকের পান্থপথ শাখা থেকে পূর্বের মতো ওয়ার্ক অর্ডার দেখিয়ে ১১০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রিমিয়াম ব্যাংক এনসিটিবিকে চিঠি দিয়েছে।

২০২৭ সালের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ১৩৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। বই মুদ্রণে গতবারের চেয়ে এবার খরচ বাড়ানো হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। আবার সিন্ডিকেট করে প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ১০০ কোটি টাকা বেশি দর কাজ পেয়েছে ছাপাখানাগুলো। তার পরও অধিক মুনাফার লোভে রাতের আঁধারে নিম্নমানের পাঠ্যবই ছাপাচ্ছে কিছু ছাপাখানা। এনসিটিবির পরিদর্শন টিম সম্প্রতি সরেজমিন গিয়ে সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিংয়ের নিম্নমানের ১ লাখ কপি পাঠ্যবই জব্দ করেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে নিম্নমানের কাগজে পাঠ্যবই ছাপানো না হয়, সেজন্য সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিংয়ের স্বত্বাধিকারী আবু নাসের সরকারকে (দুলাল) সতর্ক করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র ইত্তেফাককে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান ও সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) বরাবর লেখা চিঠিতে প্রিমিয়াম ব্যাংক বলেছে, সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিংয়ের মালিক মো. আবু নাসের সরকার (দুলাল) প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি, মতিঝিল শাখার সঙ্গে দীর্ঘদিন আর্থিক লেদনদেন করে আসছে। প্রতি বছর জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের অধীনে দি প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি, মতিঝিল শাখা থেকে সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং ও এর অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে ওডি ওয়াকি অর্ডার ঋণ প্রদান করে থাকি। প্রতি বছরের ন্যায় ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য বই সরবরাহকারী বিভিন্ন মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে ঋণসুবিধা প্রদান করে। প্রিমিয়াম ব্যাংক মতিঝিল শাখার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, বিলের টাকা সরাসরি প্রিমিয়ার ব্যাংক মতিঝিল শাখায় দুলালের অ্যাকাউন্টে ঢোকার কথা ছিল। কিন্তু প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে অন্য ব্যাংকে টাকা ট্রান্সফার করা হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাংকের এই শাখাটি। ইতিমধ্যে দুলালকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সব কিছু ব্যাংকের হেড অফিসকে অবহিত করা হয়েছে। হেড অফিস থেকে নির্দেশনা এলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে মো. আবু নাসের সরকারের (দুলাল) প্রতারণার কারণে প্রিমিয়ার ব্যাংক এবার কোনো মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদান করেনি। এতে ভোগান্তিতে পড়ে অন্য ছাপাখানাগুলো। মাতুয়াইলের একটি ছাপাখানার মালিক গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘প্রতি বছর আমি প্রিমিয়াম ব্যাংক থেকে পাঠ্যবই ছাপানোর জন্য ঋণ গ্রহণ করি। এবারও নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এবার এখনো ঋণ দেওয়া হয়নি। দুলালের প্রতারণার কারণে আমরা কেন ক্ষতিগ্রস্ত হব?’ প্রিমিয়াম ব্যাংক মতিঝিল শাখা কর্তৃপক্ষের এনসিটিবিতে জমা দেওয়া চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, ‘সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিংয়ের প্রতারণার মাধ্যমে বিল স্থানান্তরের মতো কাজের কারণে দিন দিন ব্যাংকগুলো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই খাতে বিনিয়োগে নিরুত্সাহিত হচ্ছে এবং এই খাতের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যার প্রভাব সুনামধারী মুদ্রায়ন প্রতিষ্ঠানের ওপর পড়ছে। এমতাবস্থায়, সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিংয়ের বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করলে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই খাতের সুনাম অক্ষুণ্ন থাকবে, ফলে সুনামধারী মুদ্রায়ন প্রতিষ্ঠানসমূহ ব্যাংকের সঙ্গে তাদের ব্যাবসায়িক লেনদেন নির্বিঘ্নে সম্পাদন করতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছি।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিংয়ের স্বত্বাধিকারী আবু নাসের সরকার (দুলাল) গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ছাপাখানায় কিছু নষ্ট বই ছিল। সেগুলো এনসিটিবির পরিদর্শন টিম জব্দ করেছে। ব্যাংকের সঙ্গে প্রতারণার ব্যাপারে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। এনসিটিবির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, প্রিমিয়াম ব্যাংকের সঙ্গে প্রতারণা করা নিয়ে ব্যাংকটির চিঠি পেয়েছে এনসিটিবি। বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

ইত্তেফাক/এনএন