মানবপাচার রোধে জনসচেতনতা

আপডেট : ১০ জুন ২০১৯, ২১:৫৭

বর্তমান সময়ে ‘মানবপাচার’ একটি অতি পরিচিত শব্দ। গত কয়েক মাসে সংঘটিত মানবপাচারের ঘটনা দেশের মস্তিষ্ককে নাড়া দিয়েছে। মানবপাচার যেকোনো দেশের জন্য বড়ই উদ্বেগের বিষয়। দেশের মৌলিক নাগরিক সম্পদ পাচার রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বেশি পাচারকবলিত দেশ বাংলাদেশ। প্রতি বছর আমাদের দেশ হতে লাখ লাখ মানুষ পাচার হচ্ছে। নানাবিধ কারণে দেশের মানবসম্পদ অন্য দেশে পাচার হওয়ায় বাড়ছে চিন্তা। এই সমস্যা সমাধানের নিমিত্তে সরকার নানাবিধ আইন পাস করলেও, আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় মানবপাচার রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই মানবপাচারের কারণ অন্বেষণ, সমাধানের চেষ্টার পাশাপাশি এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করতে যাওয়া লোক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম সারিতেই। প্রতি বছর সরকার প্রবাসীদের হতে পাহাড়সম রেমিট্যান্স আয় করলেও, বাংলাদেশের অভিবাসন ব্যবস্থায় যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে।

মানবপাচারের কারণসমূহের মধ্যে অতি দ্রুত পরিবারে সচ্ছলতা নিয়ে আসার চিন্তা অন্যতম। সাধারণত দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনবলের এরূপ স্বপ্ন দেখা-পাচারের ক্ষেত্রে বড়ই সহায়ক। তবে পাচারের কারণসমূহের মধ্যে বেকারত্ব সমস্যা অন্যতম। বর্তমানে সরকারি চাকরি পাওয়া যেন বিরাট ব্যাপার। দেশে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা হতে শিক্ষা শেষে অধিকাংশ তরুণ-যুবক চাহিদা অনুযায়ী কর্মসংস্থান না পাওয়ায়, তাদের উন্নত দেশের প্রতি বিশেষ ঝোঁক দেখা যায়।

বিশ্বের কোথাও না কোথাও প্রতিদিন মানুষ পাচারের শিকার হচ্ছে। যার মাঝে বাংলাদেশিদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। চাকরির প্রলোভন, উন্নত জীবনের স্বপ্ন, সুযোগ-সুবিধা প্রদান, ভালো পরিবেশের নিশ্চয়তা পাচারকারীদের মুখের বুলি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ হতে সাধারণত প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ সৌদি আরবে পাচারের ঘটনা দেখা যায়। সম্প্রতি মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে অভিবাসীদের গণকবর ও ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে বাংলাদেশিদের সলিলসমাধি-মানবপাচার সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। পাচার শিকার কেউ হয়ত ফিরে আসে, কেউ হয়ত কখনো ফিরে আসে না। অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকে তাদের স্বজনরা।

মানবপাচার নির্মূল করা সম্ভব না হলেও, একে সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য আমাদের প্রত্যেককে এগিয়ে আসতে হবে। মানবপাচার রোধে সর্বপ্রথম প্রয়োজন আত্মসচেতনতা। আত্মসচেতনতায় মানবপাচারকে রুখে দিতে পারে। বিদেশে গমনেচ্ছু কর্মীদের আত্মসচেতন হতে হবে। রাষ্ট্র কর্তৃক প্রাপ্ত অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া আবশ্যক। অজ্ঞতাকে ছুড়ে ফেলে প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগতভাবে এগিয়ে আসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরপর সামাজিক সচেতনতা মানবপাচার বন্ধে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

মানবপাচার রোধে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে গণমাধ্যম। মানবপাচারের সতর্কতা সংক্রান্ত বিষয়ে নানা সচেতনমূলক অনুষ্ঠান পরিবেশনের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করা সম্ভব। এসবের পাশাপাশি রাষ্ট্রেরও রয়েছে কতগুলো দায়িত্ব। সরকারি তদারকি মানবপাচার রোধে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। নাগরিকদের জীবনমুখী শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে একজন সুনাগরিকে পরিণত করা। প্রতিটি নাগরিক যেন নিজ অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয় সে সম্পর্কে সচেতন করা। মানবপাচারের অপরাধে শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা, যাতে এই জঘন্য অপরাধের সঙ্গে আর কেউ সম্পৃক্ত না হয়। পাচার হওয়া দেশের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করার মাধ্যমে বন্দিদের মুক্তি প্রদান ও দেশে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা। সর্বোপরি কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব সমস্যা সমাধান মানবপাচারকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ।