বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

জামিনে বেরিয়ে ফের ভয়ংকর অপরাধে জড়াচ্ছে হত্যা মামলার আসামিরা

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২২, ০৮:০৫

২০০৯ সালে চট্টগ্রামের ইপিজেড এলাকায় এরশাদ নামে এক ব্যক্তিকে খুন করেন দুর্বৃত্তরা। সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরেই ঘটে ঐ হত্যাকাণ্ড। এই খুনের ঘটনায় ইরানসহ তিন আসামিকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এক বছরের বেশি সময় হাজতবাসের পর জামিনে বেরিয়ে যান আসামিরা। জামিনে বেরিয়েই হত্যা মামলার সাক্ষী লায়লা নামের এক নারীকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে খুন করেন আসামিরা। পরে আসামি ইরানকে গ্রেফতার করে র‍্যাব।

২০১৫ সালে ডাকাতের ছুরিকাঘাতে মারা যান ট্যুরিস্ট পুলিশের কনস্টেবল পারভেজ হাসান। খুন ও ডাকাতির এই মামলায় গত বছরের মে মাসে জামিন পান আসামি আবু তাহের। জামিনে বেরিয়েই ঐ বছরের ১৬ আগস্ট তিনি খুন করেন কক্সবাজার পৌরসভার ১১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নূর মোহাম্মদের ছেলে শাহজাহান সেজানকে। এক সপ্তাহ পর এই আসামিকে সাভার এলাকা থেকে গ্রেফতার করে সিআইডি।

মো. রাসেল ওরফে কাটা রাসেলের (৩১) বিরুদ্ধে খুন, অস্ত্র আইন, দস্যুতা, চাঁদাবাজি, চুরি, নারী নির্যাতনসহ এক ডজনের বেশি মামলা রয়েছে। সর্বশেষ মামলায় জামিনে বেরিয়ে চলতি বছরের পহেলা জুন নাটোর রেলওয়ে স্টেশনের ওভার ব্রিজের ওপর সে হত্যা করে তার বন্ধু রাকিবকে। পরে অভিযান চালিয়ে ঐ আসামিকে ১৪ জুন গ্রেফতার করে সিআইডি। জিজ্ঞাসাবাদে আসামি জানিয়েছে, জেলে থাকাবস্থায় তার স্ত্রীকে বন্ধু রাকিব বিয়ে করায় প্রতিশোধ নিতেই সে খুনের ঘটনা ঘটায়।

হত্যা মামলাসহ গুরুতর অপরাধের মামলার অনেক আসামি জামিন পেয়েই আবারও খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজিসহ নানা ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। শুধু চট্টগ্রাম, কক্সবাজার বা নাটোরেই নয় দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। ফলে মামলার বাদী, সাক্ষী ও অপরাধ সংঘটন এলাকার বাসিন্দারা থাকছেন আতঙ্কে। এমনকি ভয়ভীতিও দেখানো হচ্ছে সাক্ষীদের। ফলে সাক্ষীরা মামলার সাক্ষ্য দিতে গরহাজির থাকছেন। হত্যাকাণ্ডসহ গুরুতর অপরাধে জড়িত আসামিরা যেন জামিন পেয়েই আবার অপরাধ সংঘটন করতে না পারে, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এ ধরনের আসামির জামিন বিবেচনা করার ক্ষেত্রে আরো বেশি সতর্ক থাকা দরকার।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত আসামিদের জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে আরো বেশি সতর্ক হতে হবে। জামিন বিবেচনার ক্ষেত্রে সতর্ক হলে পরবর্তীকালে এ ধরনের অপরাধ সংঘটনের হাত থেকে রেহাই পাবে সাধারণ মানুষ। তিনি বলেন, যারা হত্যাসহ নানা গুরুতর অপরাধ সংঘটন করেন তারা জামিনে বেরিয়ে বাদী বা সাক্ষীর ক্ষতি করতে চায়। এ ধরনের আসামিকে জামিন না দেওয়ার বিষয়টি কঠোরভাবে বিবেচনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের গাইডলাইন রয়েছে। ঐ গাইডলাইন অনুসরণ করা হলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জামিন দেওয়ার এখতিয়ার একমাত্র বিচারকের। কিন্তু অনেক সময় মামলার তদন্তে ধীরগতি, আসামির বিরুদ্ধে এজাহারে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকা, সাক্ষী হাজির না হওয়ায় বিচার বিলম্বসহ নানা কারণেই জামিন পান আসামিরা। জামিন পেয়ে কোনো আসামি যদি আবারও একই ধরনের অপরাধ সংঘটন করেন তাহলে রাষ্ট্রপক্ষের উচিত সংশ্লিষ্ট আসামির জামিন বাতিলে আদালতে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া। কারণ মামলার বাদী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

  • জামিন বাতিলের উদ্যোগ নিতে হবে রাষ্ট্রপক্ষকে : সারওয়ার আহমেদ

এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট সারওয়ার আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, গুরুতর অপরাধের মামলার কোনো আসামি জামিন পেয়ে যখন আবার অপরাধ সংঘটন করেন বা মামলার সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখান তখন থানায় জিডি করতে হয়। ঐ জিডির কপি সংযুক্ত করে সংশ্লিষ্ট আদালতে আসামির জামিন বাতিলের আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটরের (পিপি) নজরে আনতে হবে। যাতে তিনি জামিন বাতিলের উদ্যোগ নিতে পারেন। তবে অসুস্থ, বয়স্ক ও নারী আসামিরা জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা পেয়ে থাকেন।

  • তথ্য-উপাত্ত দিয়ে জামিনের বিরোধিতা করতে হবে : খুরশীদ আলম

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও ঢাকা ল’ রিপোর্টস (ডিএলআর) এর সম্পাদক অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান ইত্তেফাককে বলেন, জামিন দেওয়ার এখতিয়ার বিচারকের। কিন্তু যখন গুরুতর অপরাধের মামলার আসামি জামিন চাচ্ছে তখন রাষ্ট্রপক্ষকে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত নিয়ে জামিনের বিরোধিতা করতে হবে, যাতে জামিন না হয়। আর যদি জামিন হয় তখন ঐ জামিন বাতিলে রাষ্ট্রপক্ষকে উদ্যোগী হয়ে উচ্চতর আদালতে আপিল করতে হবে। তিনি বলেন, গুরুতর অপরাধের মামলায় জামিন না দেওয়ার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের অনেক গাইডলাইন রয়েছে। শুনানিতে এসব গাইডলাইন আদালতে তুলে ধরার দায়িত্বও রাষ্ট্রপক্ষের। তাহলে সুফল মিলতে পারে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পাবলিক রিলেশন্স ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান ডিসি মোহাম্মদ ফারুক হোসেন বলেন, যারা পেশাদার অপরাধী তাদের বিরুদ্ধে কতগুলো মামলা রয়েছে তা চার্জশীটে উল্লেখ থাকে। এ ধরনের অপরাধীদের যদি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কারাগারে আটকে রাখা যায় তাহলে এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে।

ইত্তেফাক/ইআ