সরকারি হাসপাতালে সারা বছরই যন্ত্রপাতি কেনার ধুম পড়ে। কিন্তু যারা এই যন্ত্রপাতি ব্যবহার করবেন, সেই টেকনিশিয়ান নিয়োগে কোনো মাথাব্যথা নেই। টেকনিশিয়ান নিয়োগে অদৃশ্য কারণে দেখা যায় অনীহা। সারা দেশের জেলা ও উপজেলা সরকারি হাসপাতালে সব ধরনের অবকাঠামো রয়েছে, কিন্তু হেলথ টেকনোলজিস্ট সংকটের কারণে হাসপাতালের বেশির ভাগ যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। এতে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
কোনো কোনো হাসপাতালে এক্সরে, প্যাথলজি পরীক্ষার যন্ত্রপাতি, আলট্রাসনোগ্রাফি, ল্যাপারোস্কপি, স্টেরিলাইজার, অটোক্লেভ, ডায়াথামিসহ অত্যাধুনিক বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ধরে বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। স্বাস্থ্যে দুর্নীতিগ্রস্ত একটি চক্র যন্ত্রপাতি ক্রয়ে অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। তারা সব সময় যন্ত্রপাতি কেনায় ব্যস্ত থাকে। আর যারা কেনাকাটায় দুর্নীতি করছে, তারাই জনবল নিয়োগে জটিলতার সৃষ্টি করছে। কোভিডের সময় হেলথ টেকনোলজিস্ট নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু দুর্নীতির কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। এক বছর আগে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও এখনো নিয়োগ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক দ্রুত নিয়োগ দিতে বলেছেন। কিন্তু নিয়োগ জটিলতা আর কাটছে না।
স্বাস্থ্যে একশ্রেণির নীতিনির্ধারক আছেন, যাঁরা মুখে বলেন প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হবে, কিন্তু তাদের অন্তরে শুধুই দুর্নীতির গন্ধ। জনবল নিয়োগে উদ্যোগ শুরু হলে সেখানেও দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সৃষ্টি করেন প্রতিবন্ধকতা। মুখে সততার কথা, জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য দেন সব সময়, কিন্তু কাজে দুর্নীতি ও অনিয়ম করে পকেট ভারী করেন। তাদের এই অপকর্মের কারণে দেশের অসহায় দরিদ্র রোগীরা প্রাইভেট ক্লিনিকে যেতে বাধ্য হচ্ছে। দেশের বেশির ভাগ জেলা-উপজেলায় সরকারি হাসাপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ থাকায় দালালেরা রোগীদের বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে ৩০ থেকে ৪০ ভাগ কমিশন পাচ্ছেন। একশ্রেণির সিভিল সার্জন ও বিভাগীয় পরিচালক ও তার কার্যালয়ের কর্মকর্তারা এই বাণিজ্যের নিয়মিত ভাগ পান।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গাইডলাইন অনুযায়ী এক জন চিকিৎসকের বিপরীতে থাকতে হবে পাঁচ জন হেলথ টেকনোলজিস্ট। দেশে বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রায় ৪০ হাজার চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন। সেই হিসাবে হেলথ টেকনোলজিস্ট থাকার কথা ২ লাখ। কিন্তু বাংলাদেশ মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বলছে, বর্তমানে হেলথ টেকনোলজিস্টের পদ আছে মাত্র ৭ হাজার ৯২০টি। সেখানে কর্মরত আছেন প্রায় ৫ হাজার জন। পদ শূন্য আছে প্রায় ১ হাজার ৯০০।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, হেলথ টেকনোলজিস্ট সংকটের কারণে রোগীরা সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এদের ছাড়া সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি হাসপাতালে জনবলের সংকটের কারণে বেশি কষ্ট পাচ্ছে দরিদ্র মানুষ। বছরের পর বছর এভাবে চলে আসছে, কিন্তু সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। হেলথ টেকনোলজিস্ট সংকটের কারণে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যাচ্ছে না। কোনো হাসপাতালে এক্সরে বন্ধ, আবার কোনো হাসপাতালে প্যাথলজি বন্ধ কিংবা এনেসথেসিওলজিস্ট আছেন, কিন্তু অপারেশন থিয়েটার বন্ধ। এই সুযোগে অজ্ঞানকারী চিকিৎসকেরা বেশির ভাগ সময় বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করছেন। অথচ দেশে এখন ২৫ হাজারের মতো মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট বেকার বসে আছেন।
চিকিৎসাসেবার পূর্বশর্ত হলো সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়। এই রোগ নির্ণয় করতে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করেন টেকনোলজিস্টরা। স্বাস্থ্য সার্ভিসের গুরুত্বপূর্ণ কর্মী তারা। এক্সরে, ইসিজি ও প্যাথলজির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন হেলথ টেকনোলজিস্টরা। অথচ তাদের নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে নানান জটিলতা।
দীর্ঘদিন ধরে সরকারি হাসপাতালে হেলথ টেকনোলজিস্ট নিয়োগে নানা জটিলতা চলছে। মামলা-পালটা মামলা আর কমিটির পর কমিটি সুপারিশ ও চিঠি চালাচালি চললেও সুষ্ঠু সমাধান আসেনি। এক্ষেত্রে অনেকটা অসহায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার মতে, জেলা-উপজেলায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে জনবলের মহাসংকট। হেলথ টেকনোলজিস্ট না থাকায় পরীক্ষানিরীক্ষা প্রায় বন্ধ রয়েছে। করোনাকালে ৮ হাজার নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৬ হাজার। কিন্তু এক জনও টেকনোশিয়ান নেয়নি। শুধু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করার জন্য ২০২ টেকনোলজিস্টকে বিশেষ বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে রাজধানী পর্যন্ত কোনো সরকারি হাসপাতাল নেই, যেখানে টেকনোলজিস্টের পদ শূন্য নেই। কোনো কোনো হাসপাতালে অর্ধেকের বেশি পদ শূন্য। আবার কোনো কোনো হাসপাতালে ৮০ থেকে ৯০ ভাগ হেলথ টেকনোলজিস্ট নেই।
২০০৮ সালের পর হেলথ টেকনোলজিস্ট পদে আর কোনো নিয়োগ হয়নি। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল কোর্টের স্থগিতাদেশ। করোনা মহামারি শুরু হলে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্থবিরতা কেটে গিয়ে দেখা দেয় আশার আলো। ৩ হাজার টেকনোলজিস্ট নিয়োগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী ২০২০ সালের ২৯ জুন ২ হাজার ৬৮৯টি পদে (মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট ৮৮৯টি, মেডিক্যাল টেকনিশিয়ান ১ হাজার ৬৫০টি, ১৫০টি কার্ডিওগ্রাফার) নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এসব পদে লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ২০২১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু বন্ধ হয়ে যায় নিয়োগ প্রক্রিয়া। এবার নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম ও ঘুষের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সেই নিয়োগ বাতিল করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হেলথ টেকনোলজিস্ট পদে দ্রুত নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। তবে নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে নিয়োগ দিতে বিলম্ব হচ্ছে। নিয়োগের জটিলতা কাটাতে অধিদপ্তর থেকে সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাচিপের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ বলেন, হেলথ টেকনোলজিস্টদের বাদ দিয়ে হাসপাতাল পরিচালনা চিন্তাই করা যায় না। তারা রোগ নির্ণয়ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের নির্দেশনা দিয়েছেন। এক বছর আগে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এখনো নিয়োগ হয়নি। আমরা উলটো পথে হাঁটছি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. সামিউল ইসলাম বলেন, হেলথ টেকনোলজিস্টের মধ্যে গ্রুপিং আছে। নিয়োগ নিয়ে দুটি মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। তবে এখন হেলথ টেকনোলজিস্টদের নিয়োগ বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে। বিভাগীয় পরিচালক নিয়োগ কমিটির সভাপতি, সদস্য সচিব সিভিল সার্জন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন প্রতিনিধি সদস্য থাকবেন। জেলা-উপজেলায় শূন্য পদে নিয়োগ দিয়ে দেবেন। তবে তার আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র নিতে হবে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে নিয়োগ কার্যক্রম দৃশ্যমান হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বরিশাল অফিস জানায়, বরিশাল বিভাগে ৩৪টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ছয়টি জেলা হাসপাতাল রয়েছে। জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ল্যাবঃ) ১৩১টি পদের মধ্যে ৭৬টি পদ শূন্য রয়েছে। মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ডেন্টাল) পদের ৪৮টির মধ্যে ১৮টি পদ শূন্য রয়েছে। মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (রেডিওগ্রাফি) ৫০টি পদের মধ্যে ২৮টি পদ শূন্য। মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাপি) ২৩টি পদের মধ্যে ২২টি পদ শূন্য এবং মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (রেডিওথেরাপি) দুইটি পদের মধ্যে একটি শূন্য রয়েছে। বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর জানান, বিভাগের আট জেলার হাসপাতালসহ ৫৮টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫ হাজার ৩০২টি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট ২১৩টি পদের বিপরীতে আছে ১৩৬ জন, ডেন্টাল ৩২ জনের মধ্যে আছেন ৩১ জন, ফিজিওথেরাপি ৫১ জনের মধ্যে আছেন চার জন, ৪৭ জন শূন্য, রেডিওলজিস্ট ৭৬ জনের মধ্যে ৩০ জন নেই। রংপুর ও দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সিটি স্ক্যান ও এমআরআই মেশিন থাকলেও তদারকির অভাবে অচল হয়ে পড়ে আছে। জেলা-উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ২০২টি আলট্রাসনোগ্রাম, ৩৪৫টি ইসিজি, ২২১টি উন্নতমানের এক্সরের মেশিন দেওয়া হয়েছে। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রায় সব মেশিনই তালাবন্ধ হয়ে পড়ে আছে।
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, কুমিল্লায় সরকারি হাসপাতালে প্যাথলজি, এক্সরে ও ইসিজি টেকনিশিয়ানের তিনটি পদের অর্ধেক পদই শূন্য রয়েছে। এই তিনটি পদে ৭২ জনের মধ্যে ৩৬টি জনের পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি থাকায় সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তবে এসব পদে শিগ্গিরই লোক নিয়োগের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও একটি জেনারেল হাসপাতালে দীর্ঘ সময় ধরে ডেন্টাল, ল্যাব টেকনোলজিস্ট, রেডিওগ্রাফার, ফিজিওথেরাপিস্টের পদ শূন্য থাকায় পরীক্ষানিরীক্ষা করাসহ নূ্যনতম স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মানুষজন। ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্সরে মেশিনটি বিদ্যুৎ সংযোগের ত্রুটির কারণে চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
