শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ভরা মৌসুমেও মিলছে না ইলিশ

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২২, ১০:৩৯

চলছে ইলিশের ভরা মৌসুম। অথচ ভোলার মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর অভয়াশ্রমে পাওয়া যাচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। ফলে ইলিশ শূন্য মেঘনা তেঁতুলিয়া পাড়ের আড়তগুলো। ফলে বিভিন্ন আড়তদার আর এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া জেলেদের হতাশায় দিন কাটছে।

জেলে পল্লীতে সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। নদীতে চর জাগা, নাব্যতা সংকট, উজানের প্রবাহ কম থাকা এবং বৃষ্টি কম হওয়ায় নদীতে পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীর গতিপথ পরিবর্তন হওয়া, উজানে পাহাড়ি ঢল না থাকায় ভোলার নদীতে এখনো কাঙ্খিত রুপালি ইলিশ ধরা পড়ছে না বলে জানিয়েছে মৎস্য বিভাগ ও জেলেরা। তারা বলছেন, আষাঢ়-শ্রাবণ দুই মাস পুরো মৌসুম।  প্রতি বছর এ সময়ে  ইলিশ বেচাকেনায় দৌড়ঝাঁপ থাকত। অথচ এবছর ঘাটগুলোতে তার পুরোই বিপরীত চিত্র।

মৎস্য অফিস সূত্রে জানায়, দেশের মোট উৎপাদিত ইলিশের ৩০ থেকে ৪০ ভাগ আহরিত হয় ভোলা জেলা থেকে। মূলত শ্রাবণ-ভাদ্র এই দুই মাস ইলিশের ভরা মৌসুম। এসময় সাগর থেকে প্রচুর ইলিশ নদীতে আসে। আষাঢ় পেরিয়ে শ্রারণের ১২ দিনে এসেও একই অবস্থা। দুই মাস ঝাটকা সংরক্ষণ, ২২দিন মা ইলিশ রক্ষা অভিযান, সাগরে টানা ৬৫ দিনের অভিযান শেষে ইলিশ শিকারের আশায় জেলেরা প্রতিদিন দল বেঁধে ভোলার মেঘনা ও তেতুঁলিয়া নদীতে জাল ফেললেও মিলছে না কাঙ্খিত ইলিশ। 

সারাদিন নদীতে ঘুরে মাছ না পেয়ে জেলেদের পেরেশানি। অন্যদিকে, ব্যবসা না থাকায় আড়তদারদের দিন কাটছে হতাশায়। ২-৪টা পেলেও তা দিয়ে ট্রলারের তেলের খরচ উঠছে না। অনেক জেলে নদীতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। জেলেরা বলছেন, মাছ না পেলে নদীতে গিয়ে কোনো লাভ নেই। বরং ক্ষতি। তেলের দাম বাড়ায় খরচ বাড়ে। এদিকে, প্রতিদিনই মহাজনের দাদনের চাপ, ঋণের কিস্তি ও তেলের দোকানের দেনা পরিশোধের চাপে বিপাকে পড়তে হচ্ছে জেলেদের।

মেঘনা ও তেতুলিয়া নদীর পাড়ের কয়েকটি বড় মাছঘাটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নদীর পাড়ে জাল নৌকা, কেউ দাঁড়িয়ে আবার কেউবা চায়ের দোকানে বসে অলস সময় কাটাচ্ছেন।

মেঘনার পাড়ের আলিমুদ্দিন বাংলাবাজার ঘাটের জেলে রহিজল, মিজান, মির্জাকালু মাছঘাটের জেলে হাসান, আরিফ, তেঁতুলিয়া নদীর কালাম বর্দারের ঘাটের জেলে জুলহাস, রহমান, আকিব, নুর ইসলাম বলেন, নদীতে অহন মাছ পড়ে না। গাংগে (নদীতে) গেলে লোকসান। তেল খরচ, জাল খরচ লাগে। 

একই এলাকার জেলে খোকন বলেন, নদীতে অহন মাছ কম পড়ছে। আমি গত দুই দিন নদীতে গিয়েও তেমন মাছ পাইনি। মঙ্গলবার নদীতে গিয়ে মাত্র ৯০০ টাকার ছোট ছোট কয়েকটি ইলিশ মাছ পেয়েছি। এ দিয়ে ট্রলারের তেল খরচও পোষায় না।

তেঁতুলিয়া নদীর নয়নের খালের আড়তদার জুয়েল বলেন, মঙ্গলবার আমার মহলে কোনো ইলিশ মাছ আসেনি। ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ শিকারের আশায় প্রতিদিনই জাল, নৌকা, ট্রলার ও বরফ নিয়ে দল বেঁধে নদীতে ছুঁটছেন জেলেরা। ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত নদী চষে বেড়ালেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। ফলে অনেকটা হতাশা নিয়ে তীরে ফিরছেন তারা।

মেঘনার বড় মাছ ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর মাঝি, তেতুলিয়ার কালাম বর্দার, মোশারফ হোসেন বলেন, লাখ লাখ টাকা দাদন দিয়ে আমরা এখন অসহায়। নদীতে মাছ নেই। আমাদের ব্যবসাও নেই।

উপজেলা ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সমিতির সভাপতি আবু সাইদ মাঝি ও জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি শাহে আলম বলেন, এখন ইলিশের ভরা মৌসুম। তাই, সে অনুযায়ী নদীতে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ মাছ পড়ার কথা। নদীতে চর জাগা, উজানের প্রবাহ কম থাকা এবং বৃষ্টি কম হওয়ায় ভোলার নদীতে এখনো কাঙ্খিত রুপালি ইলিশ ধরা পড়ছে না।

বোরহানউদ্দিন উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা (অ দা) আলী আহম্মেদ আকন্দ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এ সমস্যা হতে পারে। নদীতে এখন ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা না পড়লেও জেলেদের জালে কিছু ইলিশ ধরা পড়ছে। আশা করছি আগামী মাসের প্রথম দিকে বৃষ্টি বেশি হলে জেলেদের জালে কাঙ্খিত রুপালি ইলিশ ধরা পড়বে।

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের সাবেক সহকারী পরিচালক এ,এফ,এম নাজমুস সালেহীন বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত বিশ্বব্যাপী উষ্ণায়ণের প্রভাব, তেঁতুলিয়া নদীর নাব্য সংকটে নদীর গতিপথ পরিবর্তণ, বৃষ্টি কম হওয়ায় সমুদ্র থেকে নদীর অভিমুখে পানির চাপ কম হওয়ায়  এসব সমস্যা হতে পারে। 

 

ইত্তেফাক/মাহি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন