সাগরে নিষেধাজ্ঞায় জেলে ও চিংড়ি চাষিরা চরম সংকটে

আপডেট : ১০ জুন ২০১৯, ২২:৫৭

বঙ্গোপসাগরে দুই মাস ৫ দিন বাগদা চিংড়িসহ সকল ধরনের মাছ আহরণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারির পর চরম সংকটে পড়েছেন ঘের মালিক ও চিংড়ি চাষিরা। আয় রোজগার বন্ধ থাকায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন উপকূলীয় ১২ জেলার চার লক্ষাধিক জেলে পরিবার। এই প্রথমবারের মতো জ্যৈষ্ঠ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত মাছ ধরার ভরা মৌসুমে সাগরে নামতে পারছেন না জেলেরা। ফলে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, ভান্ডারিয়া, বরগুনা, পাথরঘাটা, পটুয়াখালী, ভোলা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, লক্ষ্মীপুরসহ উপকূলবর্তী এলাকাগুলোর জেলে পল্লিতে চলছে হাহাকার। খেয়ে-না খেয়ে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবিতে গত ১ জুন থেকে মত্স্যজীবীরা আন্দোলন শুরু করেছেন। চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন, মিছিল, সভা সমাবেশ, প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি, সড়ক অবরোধ, করেছেন তারা। রবিবার ফৌজদারহাট এলাকায় পরিবার পরিজন নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরুদ্ধ করে রাখেন। আরো কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। অভিযোগ করছেন, অসহায় ও বেকার জেলেদের পুনর্বাসনে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণ সহায়তা একেবারে অপর্যাপ্ত। পাথরঘাটা বিএফডিসি মত্স্য ঘাটের জেলে নুর মোহাম্মাদ বলেন, ৬৫ দিন মাছ না ধরতে পাইরা ধার দেনা কইরা এক বেলা কইরা খাইয়া জীবন বাচাইতেয়াছি। মাইয়া-পোয়া লইয়া খয়রাত (ভিক্ষা) করার অবস্থা হইছে। হের চাইতে মোগো এন্ডি (বিষ) দেউক, খাইয়া মইরা যাই।’

এদিকে ২০ মে থেকে সাগরে মাছ ধরা বন্ধের পর বাজারে মাছের সংকট চলছে। এখন বাজারে সামুদ্রিক মাছ নেই। খাল-বিল-খামার ও পুকুরে উত্পাদিত মাছ বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। জানা যায়, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মত্স্য-২ (আইন) অধিশাখা দেশের সামুদ্রিক মত্স্য সম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৫ সালের মত্স্য আইন অনুযায়ী বঙ্গোপসাগরে ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত মাছ আহরণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই আইনটি পাস হওয়ার তিন বছর পর এ বছর কার্যকর করেছে সরকার। গত দুই বছর শুধু চট্টগ্রামের বড় বড় ফিশিং জাহাজের জন্য এই আইনটি কার্যকর ছিল। এ বছর গোটা উপকূলীয় জেলেদের ওপর বঙ্গোপসাগরে ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

এদিকে এই নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক খাত চিংড়ি খাত পড়েছে ভয়াবহ সংকটে। চিংড়ি উত্পাদনের এই ভরা মৌসুমে সাগরে মাদার চিংড়ি  (মা চিংড়ি) আহরণ বন্ধ থাকায় খুলনাসহ দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের চিংড়ি চাষিরা ঘেরে পোনা ছাড়তে পারছেন না। এই সুযোগে চোরাই পথে বা থাইল্যান্ড থেকে নিম্নমানের ও বাংলাদেশের পানির জন্য অনুপযুক্ত বাগদা চিংড়ির পোনা অবাধে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। অধিক মূল্যে এই চিংড়ি পোনা কিনে ঘেরে ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন চিংড়ি চাষিরা। ফলে একদিকে চিংড়ি চাষিরা যেমন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন, অপরদিকে চিংড়ির ভাইরাস আতঙ্কে রয়েছেন। এতে চিংড়ি খাত চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

জানা যায়, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও কক্সবাজারসহ দেশের উপকূলীয় এলাকার ২ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে প্রতিবছর বাগদা চিংড়ির চাষ হয়। এই চিংড়ি চাষের সঙ্গে ৩ লক্ষাধিক মত্স্য চাষিসহ হাজার হাজার মানুষ জড়িত।

একজন রেণু ব্যবসায়ী জানান, প্রতিবেশী কোনো দেশে এভাবে মাছ আহরণ বন্ধ থাকে না।

খুলনার পাইকগাছা উপজেলার চিংড়ি চাষি নাজমুস সাদাত সিদ্দিকী সুমন বলেন, ‘খুলনা অঞ্চলের অধিকাংশ চিংড়ি চাষি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ঘেরে বাগদা চিংড়ির চাষ করেন। নিষেধাজ্ঞা জারির পর দেশীয় বাগদা রেণু পোনার সংকট দেখা দিয়েছে। দেশের হ্যাচারিগুলোতে যে রেণু পোনা আছে তাও বড়জোর সপ্তাহ খানেক থাকতে পারে। এরপর পোনার তীব্র সংকট সৃষ্টি হবে। সাগরে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির আগে প্রতি হাজার বাগদা চিংড়ির পোনা ২৫০ টাকা থেকে ৩০০টাকা মূল্যে কিনে ঘেরে ছাড়া হয়েছে। কিন্তু ঈদের পর সেই পোনা ৫০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।

খুলনা বিভাগীয় চিংড়ি পোনা ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া রিপন জানান, বৃহত্তর খুলনার উপকূলীয় অঞ্চলের মধ্যে পাইকগাছা ও কয়রা এলাকায় সবচেয়ে বেশি বাগদা চিংড়ির চাষ হয়ে থাকে। বর্তমানে শুধুমাত্র পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলার জন্য প্রতিদিন এক কোটিরও বেশি পোনার চাহিদা রয়েছে। অসাধু পোনা ব্যবসায়ীরা পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে নিম্নমানের নপলি এনে পোনা উত্পাদন করে ঘের মালিকদের কাছে উচ্চমূল্যে সরবরাহ করছে। যার ফলে ভাইরাসসহ বিভিন্ন রোগ-বালাইয়ে ঘেরের চিংড়ি মারা যাচ্ছে।

ফিস ফার্ম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশে (খোয়াব) কেন্দ্রীয় সভাপতি মোল্লা শামসুর রহমান শাহীন বলেন, অবিলম্বে সাগরে মাছ আহরণে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করলে চিংড়ি চাষে বিপর্যয় নেমে আসবে।