ইউএনওর ক্ষোভ প্রকাশ
মানবেন্দ্র চক্রবর্তী, সিংগাইর (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা
মানিকগঞ্জের সিংগাইরে চলতি বোরো মৌসুমে সরকারের চাল সংগ্রহ অভিযানে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সংগ্রহ অভিযান উদ্বোধনের আগেই স্থানীয়ভাবে চাল না কিনে বাইরে থেকে আনা ২৯২ মেট্রিক টন চাল গুদামজাত করে রাখা হয়েছে। অপরদিকে এলাকা থেকে এখন পর্যন্ত এক ছটাক ধানও কেনা হয়নি। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাহেলা রহমতউল্লাহর দৃষ্টিগোচর হলে তিনি এ ব্যাপারে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কৃষকদের কাছ থেকে চাল না কিনে অন্য জেলা থেকে অটোরাইস মিলের নিম্নমানের চাল কিনে অতি গোপনে গুদামজাত করার ঘটনায় এবং এখন পর্যন্ত ধান সংগ্রহ না করে কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকার কারণে সম্প্রতি খাদ্য কর্মকর্তা শাব্বির হোসেন মুরাদকে ভর্ত্সনা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
জানা গেছে, স্থানীয়ভাবে চাতাল কল মালিকদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকলেও সংশ্লিষ্টরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দিনাজপুর ও ঝিনাইদহ জেলা থেকে অটো রাইস মিলের চাল সংগ্রহ করছে। নিয়ম অনুযায়ী মিল-মালিকদের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে ধান সংগ্রহ করে সেই ধান থেকে চাল উত্পাদন করে সরকারি গোডাউনে সরবরাহ করার কথা। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা অন্য জেলা থেকে ট্রাকযোগে রাতের আঁধারে নিম্নমানের চাল গুদামে মজুত করেছে সরকারের অসাধু কর্তাদের ম্যানেজ করে। অথচ কাগজে-কলমে চুক্তিবদ্ধ মিলারদের নামে চাল সরবরাহ হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া মান পরীক্ষা করে প্রত্যয়নসহ খাদ্য গুদামে চাল সংগ্রহের বিধান থাকলেও তা মানা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, মিল-মালিকদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে সিন্ডিকেট করে ধান চাল সংগ্রহ করছে কতিপয় নেতা ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। যে কারণে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে মিলাররা অটো রাইস মিল থেকে কম দরের চাল কিনে গোডাউনে দিচ্ছে। ফলে এখানকার কৃষক সরকারের কাছে ধান চাল বিক্রির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। লাভবান হচ্ছে কেবল মুষ্টিমেয় কয়েকজন। সূত্রমতে, মিলাররা ধান বিক্রির সুবিধা পেতে নেতা ও কর্মকর্তাদের কেজি প্রতি ৪ টাকা করে দিচ্ছেন। মিলার হাফিজ খাঁ বলেন, ‘নেতা থেকে শুরু করে অফিসের সবাইকে টাকা দিতে হয় বলে ব্যবসার অবস্থা ভালো না। তবে আমরা টাকা দেই খালেক নেতার কাছে। তিনি কাকে কত দেন সেটা তিনিই বলতে পারবেন। কেজি প্রতি ৪ টাকা নয়, দুই টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করে মিলার আব্দুল খালেক বলেন, ‘সরকারি গুদাম কর্মকর্তাকে টাকা দেওয়ার রেওয়াজ তো পাকিস্তান আমল থেকেই চলে আসছে। তবে নেতারা কোনো টাকা চাননি।’
সরকারের চাল সংগ্রহ অভিযানে অনিয়মের সত্যতা স্বীকার করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাহেলা রহমতউল্লাহ বলেন, ‘আমার অনুমতি ছাড়া আগেই গোডাউনে নিম্নমানের ২৯২ মেট্রিক টন চাল মজুদ করে রাখা হয়েছে। এ উপজেলার জন্য ৪৪৬ মেট্রিক টন চাল এবং ৩১২ মেট্রিক টন ধান বরাদ্দ হয়। এতে্্্ ৩৬ টাকা কেজি দরে চাল্ এবং ২৬ টাকা কেজি করে ধানের দাম ধরা হয়েছে। ৬ মে থেকে শুরু করে ৩১ আগষ্ট পর্যন্ত ধান চাল সংগ্রহ চলবে। কিন্তু দেখলাম ৩টি মিলার যথাক্রমে ১১২, ৯০, ৯০ মেট্রিক টন চাল দিয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা দিনাজপুর থেকে অটো রাইস মিলের চাল দিয়েছে বলে স্বীকার করেছে এবং গোডাউনে গিয়েও সেই বস্তা দেখলাম। অথচ বিল করেছে এখান থেকেই চাল সংগ্রহ করার কথা বলে। অথচ এখন পর্যন্ত এখান থেকে এক ছটাক ধানও কেনা হয়নি। এই অনিয়ম বন্ধ না হলে চাষি বাঁচবে না।’
খাদ্য গুদামের (এলএসডি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো.মিজানুর রহমান কোনো টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘কৃষি অফিস আমাদের কাছে ধানের কোনো তালিকা দেয়নি এবং ধান কাটাও পুরোপুরি শুরু হয়নি। ফলে ধান কেনা হয়নি। বাইরে থেকে অটো রাইস মিলের চাল কেনার বিষয়ে তিনি বলেন, ক্রয় কমিটির সভাপতি ইউএনও। তার সঙ্গে মিটিং করে ও রেজুলেশন দিয়ে তাকে সব জানিয়েই তো এসব করেছি। এছাড়া প্রকৃত মিল-মালিকদের কাছ থেকেই ভালো চাল কিনেছি। তাদের প্রত্যয়ন পত্র ও চুক্তিপত্রের লাইসেন্স দেখে নিয়মতান্ত্রিকভাবে কিনেছি। এখন তারা চাল কোথা থেকে কিনে দেবে সেটাতো আমার দেখার বিষয় না। ধান কেনার ক্ষেত্রেও কৃষকের ব্যাংক একাউন্ট ও কৃষি কার্ড তালিকাভুক্ত রয়েছে। এসব যাচাই করে এখন কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন হাটবাজারে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সবাইকে অবগত করেছি। তাহলে অনিয়ম হলো কোথায়?’
