বৃহস্পতিবার, ১৮ আগস্ট ২০২২, ২ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

টেকনাফ দিয়ে মাদক আসা থামছেই না

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২২, ০৮:০৩

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা পদক্ষেপের পরও টেকনাফ দিয়ে মাদক আসা থামছেই না। বিভিন্ন সময়ে অভিযানে মাদক কারবারি আটক ও মাদক উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু অধরা থেকে যাচ্ছে মাদকের গডফাদাররা। নানা কৌশলে তারা মাদকের এ অবৈধ ব্যবসা জিইয়ে রেখেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত শুধু টেকনাফ এলাকায় ৫৪ জন মাদক পাচারকারী গডফাদার রয়েছে। স্থানীয় সাবেক ও বর্তমান জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও বিভিন্ন পেশার মানুষ এই তালিকায় রয়েছে। তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে চলছে রমরমা বাণিজ্য। তাদের সঙ্গে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীর বাহিনীর এক শ্রেণির সদস্যদের সখ্য। প্রতিটি চালানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিতে হয় নির্ধারিত উত্কোচ। 

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, যে পরিমাণ আটক ও উদ্ধার হয়, তার ১০ গুণ মাদক দেশে ঢোকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক শ্রেণির সদস্য মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দিয়ে টেকনাফ এলাকায় পোস্টিং নেন। এক বছর চাকরি করলে সারা জীবনে আর কিছু করা লাগে না। স্থানীয় প্রশাসনের এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীও মাদকের টাকার ভাগ পান নিয়মিত। এভাবে মাদকের টাকায় কোটিপতি হয়েছেন অনেকে। গডফাদারদের অনেকেরই বিদেশে গাড়ি-বাড়ি রয়েছে। মাদকের টাকা তারা নানা কায়দায় বিদেশে পাচার করছেন। টেকনাফ দিয়ে দেশে মাদক প্রবেশ করে নৌপথ, স্থলপথ ও আকাশ পথ দিয়ে এবং তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানী থেকে শুরু করে সারা দেশের ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত চাইলেই মাদক পাওয়া যায়।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশে মাদকের ভয়াল আগ্রাসন চলছে। এটা একটা অদৃশ্য যুদ্ধ। যে যুদ্ধ তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। কি করে ধ্বংস করে দিচ্ছে—আমরা বিশেষজ্ঞরা এই যুদ্ধ সম্পর্কে জানি। কারণ আসক্তরা আমাদের কাছে আসে। কিন্তু অনেকে তা দেখতে পাচ্ছে না। এ যুদ্ধ থেকে রক্ষা পেতে হলে ঘরে ঘরে পালটা যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। নইলে নতুন প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যাবে। সমাজে অবক্ষয় নেমে আসবে।

বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষে মিয়ানমারের শত শত মাদক কারখানা।

সর্বনাশা মাদক ব্রেনসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ধ্বংস করে দিচ্ছে। পরিবার ধ্বংস করে দিচ্ছে। ভয়াল মাদক তারুণ্য, মেধা, বিবেক, লেখাপড়া, মনুষ্যত্ব সবকিছু ধ্বংস করে দিচ্ছে। এছাড়া উঠতি বয়সিরা নেশাগ্রস্ত হয়ে খুনখারাবিতে জড়িয়ে পড়ছে। স্কুল-কলেজ, মেডিক্যাল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়েপড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মাদকে আসক্তদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। যা দেশের মেধা ধ্বংসের বিপজ্জনক মাত্রা। মাদকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেশ আগেই ‘জিরো টলারেন্স’নীতি গ্রহণ করেছেন। সমাজ থেকে মাদক নির্মূলে দেশব্যাপী ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করে দেশবাসীর প্রশংসাও পেয়েছেন। মাদকের বিরুদ্ধে এ অভিযান এখনো অব্যাহত রেখেছে প্রশাসন। বাস্তবতা হলো, প্রশাসনের এই অভিযানের পরও ভয়ংকর মাদকের পাচার বন্ধ করা যায়নি। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ছে চালান। টেকনাফে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) অভিযান চালিয়ে ৪.২৭৮ কেজি ক্রিস্টাল মেথ (আইস) ও ১ লাখ ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে। বিজিবির টেকনাফ ব্যাটালিয়ন শনিবার রাতে অভিযানটি পরিচালনা করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, উদ্ধার করা এসব মাদকদ্রব্যর মূল্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের অভিমত, শুধু অভিযানেই বন্ধ হবে না মাদক প্রবেশ। এটি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে অভিযানের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সীমান্তে নিশ্ছিদ্র প্রহরা, রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের বাইরে যাতায়াত বন্ধ, মাদকের চাহিদা হ্রাস, মাদকসেবীদের পুনর্বাসনসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া একক কোনো বাহিনীকে দায়িত্ব না দিয়ে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করে অভিযান পরিচালনা করলে মাদক নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তারা। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মিলিয়ে টাস্কফোর্সও রয়েছে। কিন্তু তাদের কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়।

প্রায়ই বিজিবি জব্দ করছে বিপুল পরিমাণ মাদক।

দেশের নৌপথ, আকাশপথসহ সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে মাদক পাচার হচ্ছে। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী নাফ নদীর ওপর রয়েছে মাদকের শতাধিক কারখানা। সেখান থেকেই দেশে আসছে মাদক। মাদক যে পরিবারকে ধ্বংস করে দিচ্ছে তার উদাহরণ তুলে ধরে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ইত্তেফাককে বলেন, তার কাছে সন্তানকে নিয়ে আসেন একসময় সীমান্তবর্তী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বে থাকা এক জন কর্মকর্তা। তার ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন। ছুটিতে থাকার পর এসে দেখেন তার ছেলে মাদকাসক্ত। তার পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তিনি আক্ষেপ করে ঐ বিশেষজ্ঞকে বলেন, স্যার মাদকের কত চালান টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দিয়েছি। আজ আমার সন্তান ও পরিবার ধ্বংসের মুখে। মাদকের সঙ্গে জড়িতরা টাকার লোভে সাময়িকভাবে লাভবান হবে, কিন্তু ক্ষতি হবে অনেক বেশি। যা পাহাড়সম টাকা দিয়ে মূল্যায়ন করা যাবে না। এখন আমার সর্বনাশ হয়েছে। তার আহ্বান, কেউ যেন আমার মতো সন্তান ও পরিবারকে ধ্বংস না করে। এভাবে সমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী চিকিৎসার জন্য তার কাছে আসেন জানিয়ে ঐ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, মাদক পাচার বন্ধ না হওয়ার নেপথ্যে দেশের মেধাশূন্যের ষড়যন্ত্র কি না, সেটা ভেবে দেখতে হবে। যেহেতু অর্থের বিষয়টি জড়িত, তাই কিছুতেই পরোয়া করছে না মাদক কারবারিরা। আগামী প্রজন্মকে বাঁচাতে মাদককের বিরুদ্ধে কঠোর থেকে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, দেশে বিপুল পরিমাণ মাদক আসছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে প্রায় গ্রেফতার হলেও মাদক আসা বন্ধ হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার পক্ষে মাদক নির্মূল করা সম্ভব না। এক্ষেত্রে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ সিমান্ত ঘেঁষা নাফ নদী দিয়ে এসব ছোট ছোট নোয়কায় করে মিয়ানমান থেকে আনা হয় মাদক।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতীয় মাদক প্রতিরোধ উপদেষ্টা কমিটির সদস্য বিশিষ্ট মনোরোগ বিজ্ঞানী ডা. মোহিত কামাল বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাদক ধরছে ঠিকই, কিন্তু তারপরও মাদক পাচার বন্ধ হচ্ছে না। এটা একটি অদৃশ্য যুদ্ধ। তরুণ প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি সমাজের লোকেরা দেখে না, কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি। মাদকের কারণ মেধাবীদের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, সমাজে খুনখারাবি বাড়ছে। সন্তানের হাতে বাবা-মা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অনলাইনেও মাদক খাওয়ার ব্যাপারে অপপ্রচার চলছে। মাদক নিলে ক্ষতি নেই—এভাবে উত্সাহ দেওয়া হচ্ছে। এটা বন্ধ করা উচিত। একই সঙ্গে ঘরে ঘরে সচেতনতা সৃষ্টি করে মাদকের বিরুদ্ধে পালটা যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। নইলে এটা রোধ করা সম্ভব হবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিয়া রহমান বলেন, সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। এটা বাস্তবায়নের জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের সদিচ্ছা আছে কি না, সেটা দেখতে হবে। মাদকের গডফাদার ও ডিলাররা ধরা পড়ে না। ধরা পড়ে শুধু বহনকারীরা। গডফাদারদের জিরো টলারেন্সের আওতায় আনা না হলে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। কোন রাস্তা দিয়ে মাদক আসে, কীভাবে আসে, সবই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানে। এদের ধরতে না পারলে চলতেই থাকবে। টেকনাফ দিয়ে সর্বাধিক মাদক আসে। যুবসমাজ নীরবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তাই মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া উচিত। একই সঙ্গে মানুষের মধ্যে গণজাগরণের মতো সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

ইত্তেফাক/ইআ