মাদক ও মোবাইল আসক্তিতে বিপন্ন কিশোর-তরুণ সমাজ!

  • রাজধানী জুড়ে প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনা, সন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা
  • মাদকের সহজলভ্যতায় বাড়ছে কিশোর অপরাধ, সম্মিলিত প্রতিরোধের আহ্বান বিশেষজ্ঞদের
আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০৬

মাদকের ভয়াবহ ছোবলে দেশের কিশোর-তরুণ প্রজন্ম ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সরকার এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরবর্তী প্রজন্মও একই পরিণতির শিকার হতে পারে। রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত সহজলভ্য হয়ে উঠেছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক। কিশোর-তরুণদের মাদক বেচাকেনা ও সেবনে জড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি বাড়ছে বিভিন্ন অপরাধ। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি অভিভাবক, চিকিত্সক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

চিকিত্সকরা বলছেন, শিশু-কিশোরদের হাতে মোবাইল ফোনের অবাধ ব্যবহারও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করছে। মোবাইল ফোন ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক শিশু-কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এমনকি শিশু-কিশোর বয়সে গাঁজা ও ইয়াবায় আসক্ত হয়ে চিকিত্সার জন্য আসা রোগীর সংখ্যাও তাদের ভাবিয়ে তুলছে।

 স্কুলগামীদের মাদকাসক্তি নিয়ে উদ্বেগ : দেশের অন্যতম মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, মাদক ও মোবাইল ব্যবহারে একই ধরনের আসক্তি তৈরি হতে পারে। তাদের দ্বারা যে কোনো ধরনের নৃশংস ঘটনা ঘটানো সম্ভব। ব্যাপক হারে কিশোর থেকে তরুণ বয়সি সন্তানরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ায় চিকিত্সক হিসেবে তিনি উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, দুঃখজনক ব্যাপার হলো, বর্তমান কিশোর-তরুণ প্রজন্ম ধ্বংসের ঝুকিতে পড়েছে। এখনই রাষ্ট্র কঠোর না হলে আগামী প্রজন্মও একইভাবে ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত এমন কোনো এলাকা নেই, যেখানে হাত বাড়ালে মাদক পাওয়া যায় না।

অধ্যাপক মোহিত কামাল আরো বলেন, সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো বড় সংখ্যায় স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়া। এলাকায় বড় ভাইদের নির্দেশে তারা ইয়াবা বেচাকেনায় জড়িয়ে পড়ে। বন্ধুবান্ধবদের প্ররোচনায় ‘একটু এক্সপেরিমেন্ট’ করতে গিয়ে নিজেরাই আসক্ত হয়ে পড়ে। এ ধরনের অনেক শিক্ষার্থীকে অভিভাবকরা প্রতিদিন চিকিত্সকের কাছে নিয়ে আসছেন। সন্তানদের মাদক সেবন, মোবাইল আসক্তি ও নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার তথ্য জানাতে গিয়ে কোনো কোনো বাবা-মা কান্নায় ভেঙে পড়েন বলেও জানান তিনি। তাদের কেউ কেউ বলেন, সন্তান বেঁচে থাকলেও সামাজিকভাবে তাদের কাছে মৃত!

অভিভাবকদের উদ্দেশে এই চিকিত্সক আরো বলেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের হাতে মোবাইল না দেওয়ার পাশাপাশি তাদের নিয়মিত স্কুলে যাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মাদকাসক্ত তরুণদের আড্ডায় সন্তানরা যেন কোনোভাবেই যেতে না পারে, সে বিষয়ে নজর রাখতে হবে।

ভয়াবহ মোবাইল ফোন আসক্তি : এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে স্কুলপড়ুয়া শিশু-কিশোরদের হাতে মোবাইল ফোন দেওয়া নিষিদ্ধ। আরো কয়েকটি দেশে এমন প্রস্তুতি চলছে বলেও তারা জানান। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু-কিশোর বয়সে মোবাইল ফোন দেওয়ার ফলে লেখাপড়ার ক্ষতির পাশাপাশি তাদের জীবনও ধ্বংসের পথে যেতে পারে। এ বয়সে অনেক শিশু-কিশোর মাদকাসক্ত হওয়ার পাশাপাশি ভয়াবহ সব অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। মোবাইল ফোন তাদের এই বিপথে যাবার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশেও স্কুল পড়ুয়া শিশু-কিশোরদের হাতে মোবাইল ফোন না দিতে অভিভাবকদের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারিভাবেই স্কুলপড়ুয়াতের হাতে মোবাইল ফোন দেওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণার বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ডা. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ইশায়াত ওরফে অপ্রতিমের (১৩) নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশব্যাপী ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, একটি মোবাইল ফোনকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল‍্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, বাংলাদেশে কিশোরদের একটি বড় অংশ মাদকাসক্তের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ডিভাইস আসক্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে। মাদকে আসক্তরাই নানা ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে চুরি, ছিনতাই, অপহরণ, হত্যা, শারীরিক আক্রমণ, ভাঙচুরসহ বিভিন্ন অপরাধ রয়েছে। অন্যদিকে, ডিভাইসে আসক্ত তরুণরা সঠিকভাবে নিজেদের বিকাশ ও ব্যক্তিত্ব গঠন করতে পারছে না। বন্ধুত্ব তৈরি হচ্ছে অপরাধীদের সঙ্গেই। এ ধরনের তরুণরা সমাজের প্রত্যাশিত দায়িত্ব পালন করতে পারছে না এবং নিজেদের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে প্রস্তুত করতে পারছে না। ফলে শুরু হচ্ছে সংঘাত, সহিংসতা ও নানা ধরনের সামাজিক অস্থিরতামূলক ঘটনা।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রায়হানুল হক বলেন, ৭ থেকে ৮ বছর বয়সি শিশুরাও গাঁজা সেবন করে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে তার কাছে চিকিত্সার জন্য এসেছে। তরুণ থেকে শুরু করে শিশুরাও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। সামনে আরো একটি তরুণ প্রজন্ম ধ্বংসের ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। তিনি মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সমাজের সব স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। মাদক নির্মূলে সবাইকে একযোগে কাজ করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, আগে বলা হতো ‘দেশ বাঁচাও’। এখন সর্বনাশা মাদকের ছোবল থেকে শিশু-কিশোর ও তরুণ সমাজকে বাঁচাও—এই স্লোগান নিয়ে মাদক নির্মূলে নামতে হবে।

রাজধানী যেন মাদকের হাট : ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধি গত শনিবার ও রবিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প হয়ে বিভিন্ন গলিপথ, ঢাকা উদ্যান, নবীনগর, হাউজিং, বছিলা হয়ে রায়েরবাজার, হাজারীবাগ ও শহীদনগর এলাকায় ঘুরে প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনার দৃশ্য দেখতে পান। এসব এলাকায় পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চললেও প্রতিদিনই এমন দৃশ্য চোখে পড়ছে। এসব এলাকায় কিশোর গ্যাং ও তরুণরা ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক বেচাকেনার সময় পুলিশের ধাওয়া খেয়ে কেরানিগঞ্জ ও সাভার এলাকায় পালিয়ে যায়।

হাজারীবাগ এলাকায় কয়েক তরুণ ঐ প্রতিনিধিকে মাদক কেনার প্রস্তাব দেন। তাদের একজন বলেন, ‘ভাই, আপনাকে নতুন দেখছি এই এলাকায়, কন কয়টা লাগবে?’ মাদক প্রয়োজন নেই জানালে ঐ তরুণরা বলে, এখানে যারা আসে, ট্যাবলেট (ইয়াবা) কেনার জন্য আসে।

চিকিত্সক, অন্যান্য পেশার মানুষ, আশপাশের বাসিন্দা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অনেকে জেনেভা ক্যাম্পে প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে জেনেভা ক্যাম্পকে কোনো অবস্থাতেই মাদকের স্বর্গরাজ্য হিসেবে থাকা উচিত নয়। জেনেভা ক্যাম্পের আশপাশের কয়েক জন বাসিন্দা এই প্রতিনিধিকে জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে সেখানে প্রকাশ্যে ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক বেচাকেনার দৃশ্য দেখে আসছেন।

শুধু রাজধানীর এই অংশ নয়, মিরপুর, পল্লবী, উত্তরা, দক্ষিণাঞ্চল থেকে শুরু করে বুড়িগঙ্গা নদী পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক বেচাকেনা চলছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান : উপ-পুলিশ কমিশনার (তেজগাঁও বিভাগ) মো. ইবনে মিজান বলেন, তারা দিনরাত মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে আসছেন। এ সময় মাদকসহ ব্যক্তিদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্পরতার কারণে মাদক বেচাকেনা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও তিনি জানান।

আপসহীন অবস্থানের কথা এসআরবির : এসআরবির প্রধান অতিরিক্ত আইজি আহসান হাবীব পলাশ বলেন, মাদকের ক্ষেত্রে কোনো আপোস নেই। রাজধানীসহ দেশব্যাপী এসআরবির পক্ষ থেকে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিন মাদক উদ্ধার ও গ্রেফতার করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

অন্যদিকে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, দেশে যে হারে মাদক প্রবেশ করছে, সেই তুলনায় উদ্ধার ও গ্রেফতারের সংখ্যা কম। তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্পরতা ব্যাপক রয়েছে। তিনি বলেন, দেশে যেহেতু মাদকের চাহিদা রয়েছে, তাই বিভিন্নভাবে মাদক প্রবেশ করছে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত এক বছরে সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে প্রায় ১১০০ কোটি টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি সামনে রেখে সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ইত্তেফাক/এনএন