বুধবার, ১৭ আগস্ট ২০২২, ১ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে বকশিশ বাণিজ্য! 

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২২, ১৫:২০

মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারসহ নানা বিভাগের নার্স, আয়া, ওয়ার্ডবয়, কর্মচারীদের বকশিশ বাণিজ্যে অতিষ্ঠ সাধারণ রোগীরা। এবিষয়ে জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী এক ব্যক্তি।

রোগীদের অভিযোগ, চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা ট্রলি, স্ট্রেচার ও হুইলচেয়ার ব্যবহার করলে টাকা দিতে হয় আয়া-ওয়ার্ডবয় ও নার্সদের। আর টাকা না দিলে সেগুলো ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না। 

টাকা দিলেই ব্যবহার করতে দেওয়া হয় এসব মেডিক্যাল সামগ্রী। এসব দেখেও দিনের পর দিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নীরব ভূমিকায় এভাবেই চলছে জোরপূর্বক বকশিশ আদায়।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ জুলাই ঘিওর উপজেলার বাইলজুরি গ্রামের রিপন মিয়া তার স্ত্রী তানিয়া আক্তারকে নিয়ে মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে আসেন। ওটিতে নিয়ে যাওয়ার পরেই শুরু হয় তার সঙ্গে নানা টালবাহানা। প্রথমে এক পরিচ্ছন্ন কর্মী এসে তাকে বলেন, আপনার স্ত্রীর সিজার করাতে ১০ হাজার টাকা লাগবে। পরদিন ২৮ জুলাই রিপনের স্ত্রীকে ডাক্তার ওটিতে পাঠানোর পর থেকে শুরু হয় টাকা খরচের পালা।

বর্তমান ওটি ইনচার্জ শামীমা সুলতানা ও ফাতেমা আক্তার সিজারের জন্য ৩ হাজার ১০০ টাকার ওষুধের একটি তালিকা তৈরি করে রিপন মিয়াকে আনতে বলেন। কোনো উপায় না পেয়ে দিনমজুর রিপন তাদের লিখিত ওষুধগুলো এনে দেন। সিজার শেষ হলে শুরু হয় বকশিশ বাণিজ্য। ওটির আয়া, ওয়ার্ডবয়, পরিচ্ছন্ন কর্মী থেকে শুরু করে নাম না জানা আরও অনেককেই বকশিস দিতে হয় প্রায় ৩৯০০ টাকা।

রিপনের শাশুড়ি নবজাতক নাতিকে কোলে নিতে গেলে এক ওয়ার্ডবয়কে দিতে হয় ৪৫০ টাকা। এভাবেই প্রতিদিন অপারেশন থিয়েটারে জোরপূর্বক বকশিশ আদায় করছে নার্স, আয়া, ওয়ার্ডবয় ও কর্মচারীরা।

এবিষয়ে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের দায়িত্বরত ইনচার্জ শামীমা সুলতানা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমরা সবাইকে সেবা দিচ্ছি। এর বিনিময়ে কোনো টাকা-পয়সা নেই না। ওষুধ হাসপাতাল থেকে দেওয়া হয়। তবে যেসব ওষুধ হাসপাতালে সাপ্লাই নেই, সেগুলো বাইরে থেকে আনতে হয়। আমরা কোনো বকশিশ নেই না।’

ভুক্তভোগী রোগীরা জানান, স্ট্রেচার, হুইলচেয়ার ও ট্রলি সেবা দিয়ে জোরপূবর্ক অর্থ আদায়ের মতো হয়রানি ও অনিয়ম হাসপাতালে নিত্য দিনের ঘটনা। এমনকি বাড়তি উপাজর্ন করতে অনেক নার্স, আয়া ও পরিচ্ছন্নকর্মী হুইলচেয়ার নিজের জিম্মায় রাখছে।

রোগীরা অভিযোগ করে বলেন, এদিকে মৃত ব্যক্তির মরদেহ বহনের ক্ষেত্রেও ছাড় দেন না কর্মরত কর্মচারীরা। হাসপাতালের কমর্চারী নেতাদের একটি সিন্ডিকেট এ ইনকামের সুযোগ করে দিচ্ছেন। 

হাসপাতালে জরুরি বিভাগ থেকে ব্যাথার রোগী, শ্বাসকষ্টের রোগীসহ বিভিন্ন ধরনের রোগীর ৮ তলা ভবনে বিভিন্ন ইউনিটে যেতে হুইলচেয়ারের প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে আয়া ও ওয়ার্ডবয়দের সহায়তা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবার ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে দিতে হচ্ছে। এই টাকা না দিলে রোগীকে ছুঁয়েও দেখে না তারা।

এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী মো. রিপন মিয়া বলেন, ‘মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সরকারি জেনারেল হাসপাতালে আমার স্ত্রীর সিজার করার জন্য ৩ হাজার ১০০ টাকার ওষুধ কিনে আনতে হয়েছে। আর সিজারের পর অপারেশন থিয়েটারের কর্মরত ওয়ার্ডবয় স্বপন বকশিশের নামে জোরপূর্বক নিয়েছে ৪৫০ টাকা, ওটিবয় তানজিম ২০০ টাকা ও ট্রলিম্যান নিয়েছে ১০০ টাকা।’

রিপন বলেন, ‘এছাড়া নাম না জানা আরও কয়েকজন মিলে ৩ হাজার ১৫০ টাকা বকশিশ আদায় করেছে। সরকারি হাসপাতালে একটি সিজার করতে যদি ৭ হাজার টাকা খরচ হয়, তবে সরকারি হাসপাতালে আসার দরকার কী? এই টাকা দিয়ে তো প্রাইভেট হাসপাতালেই সিজার করানো যায়। আমি এ বিষয়ে ৩১ জুলাই হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।’

এবিষয়ে হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. একেএম রাসেল বলেন, ‘হাসপাতালে বকশিশের নামে কোনো টাকা আদায়ের বিধান নেই। এবিষয়ে আমরা একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগটি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বরাবর পাঠানো হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ইত্তেফাক/মাহি