বুধবার, ১৭ আগস্ট ২০২২, ১ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

মধ্যরাতে ভয়ংকর হয়ে ওঠে যে সড়ক

টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক সড়কে বাস ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ বাড়ছেই 
ভাইঘাট পুলিশ ফাঁড়ি প্রত্যাহারে ক্ষোভ, পাহারায় যানবাহন পারাপারও বন্ধ

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২২, ০৩:০০

টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কের এলেঙ্গা থেকে রসুলপুর ৬৫ কিলোমিটার এলাকায় গভীর রাতে বাস ডাকাতি, চলন্ত বাসে ধর্ষণ এবং যাত্রী খুন নতুন কিছু নয়। বিগত ১০ বছরে এ সড়কে সংঘটিত বেশ কয়েকটি ঘটনা সারা দেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার পর কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা থেকে ডানে চার লেনের সড়ক ঢাকা এবং বামে বৃহত্তর ময়মনসিংহের আঞ্চলিক সড়ক চলে গেছে। এ সড়ক মধুপুরে এসে আবার বামে জামালপুর ও শেরপুর এবং ডানে ময়মনসিংহ গেছে। এসব সড়কে প্রায়ই বাস ডাকাতির ঘটনা ঘটছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৯২ থেকে ’৯৮ পর্যন্ত জামালপুরের দিগপাইত থেকে মধুপুর উপজেলার গোলাবাড়ী পর্যন্ত সাতবার বাস ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। আবার ’৯১ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত মধুপুর উপজেলা সদর থেকে রসুলপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ২০ কিলোমিটার সড়কে ৬ বার বাসে ডাকাতি হয়। এ সড়কের ১০ কিলোমিটার মধুপুর বনাঞ্চলে অবস্হিত।

জানা গেছে, এসব সড়কে বেশ কয়েকটি ভয়ংকর ডাকাতি সংঘটনের পর টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ প্রশাসন মধুপুর-ধনবাড়ী উপজেলার সীমান্তে অবস্হিত ভাইঘাট বাসস্ট্যান্ডে একটি হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি স্হাপন করেছিল। ফাঁড়ির পুলিশ ভাইঘাট থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত রাতে ডিউটি করত। আর মধুপুর থেকে রসুলপুর পর্যন্ত বনাঞ্চল ভেদ করে যাওয়া ১০ কিলোমিটার সড়কে সন্ধ্যার পর মধুপুর থানা পুলিশের পাহারায় যানবাহন পারাপার হতো। বর্তমানে বনাঞ্চল এলাকায় পুলিশি পাহারায় যানবাহন পারাপার বন্ধ রয়েছে। আর সাত বছর আগে ভাইঘাট থেকে ফাঁড়িটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্টরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তবে পুলিশ রাতের বেলা এখানে ডিউটি করেন বলে মধুপুর উপজেলার জলছত্র ফাঁড়ির পুলিশ দাবি করেছে।

একের পর এক ডাকাতি

মধুপুর উপজেলার গায়রা গ্রামের গারো নেতা ইউজিন নকরেক জানান, চার বছর আগে তার গ্রামের স্কুল শিক্ষক বাসন্তী মাংসাং জলছত্র মিশন থেকে বাড়ি ফেরার জন্য প্রান্িতক পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন। এতিমখানা নামক স্হানে যাত্রীবেশী ডাকাতরা তার নিকট থাকা টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার নেওয়ার পর চলন্ত বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। এরপর চালকের সহযোগিতায় বাস থামিয়ে জঙ্গলে নেমে গা ঢাকা দেয়। বাসন্তীর স্বজনরা সে সময় বাসচালক ও হেলপারদের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ তুললেও মধুপুর থানা পুলিশ তা কানে তোলেনি। শেষ পর্যন্ত চালক ও হেলপারদের বাদ দিয়ে পুলিশ আদালতে অভিযোগ পত্র দাখিল করে। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাটি এখনো আদালতে চলমান।

২০১৪ সালে বনাঞ্চলের টেলকি নামক স্হানে বগুড়াগামী একটি বাসে ডাকাতি হয়। ডাকাতের ছুরিকাঘাতে গাইবান্ধার এক কলেজশিক্ষক গুরুতর আহত হন। ঐ কলেজশিক্ষকের বরাত দিয়ে দৈনিক ইত্তেফাকসহ কিছু মিডিয়ায় ডাকাতির সঙ্গে চালক-হেলপাররা জড়িত ছিলেন বলে খবর ছাপা হয়। ঐ ঘটনায় যাত্রীরা মধুপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেই মামলার চূড়ান্ত ফল কী হয়েছে কেউ বলতে পারছেন না।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বগুড়া-ময়মনসিংহগামী একটি বাসে চালক ও তিন হেলপারের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হন এক নারী যাত্রী। ধর্ষকরা পরে তাকে মধুপুর বনাঞ্চলের এতিমখানা নামক স্হানে চলন্ত বাস থেকে জঙ্গলে ফেলে দেয়। ঐ মামলায় চালকসহ চার জনকে মৃতু্যদণ্ড এবং একজনকে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে। ২০০৭ ও ২০০৯ সালে দুটি পৃথক ঘটনায় বিনিময় পরিবহনের দুটি বাসে দুই গার্মেন্টস কর্মী স্টাফদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হন। একটিতে মধুপুর থানায় মামলায় হয়। অপরটি সালিশি বৈঠকের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। মামলায় সাক্ষীর অভাবে সেটি পরে খারিজ হয়ে যায়।

সর্বশেষ বাস ডাকাতিতেও চালক-হেলপার জড়িত!

গত মঙ্গলবার রাতে কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী ঈগল পরিবহনের বাসে যে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে সেটির সঙ্গেও চালক ও হেলপাররা জড়িত বলে পুলিশের ধারণা। ডিবি পুলিশের হাতে আটক ঘটনার অনত্যম হোতা রাজা মিয়া পেশায় টাঙ্গাইল-ঢাকা সড়কে ঝটিকা পরিবহনের একজন ড্রাইভার। ডাকাতির সময় ঈগলের চালককে সরিয়ে দিয়ে রাজা নিজেই গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। এরপর টানা তিন ঘণ্টা নানা স্হানে বাসটি এলোমেলো চালিয়ে সর্বস্ব লুণ্ঠন এবং নারী যাত্রীকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে।

বাসের যাত্রী কুষ্টিয়ার আবুল হোসেন জানান, ডাকাতির ঘটনা তার কাছে পরিকল্পিত মনে হয়েছে। কারণ সিরাজগঞ্জ থেকে যাত্রী উঠানোর আগে গাড়ির হেলপাররা তাদের সঙ্গে কানাকানি করেছে। মধুপুর উপজেলার ব্যবসায়ী সোহেল রানা জানান, সাত বছর আগে ভাইঘাট থেকে হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গায় স্হানান্তর করা হয়। যেটি এখনো হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি মধুপুর রিজিয়ন নামে পরিচিত। এ ফাঁড়ি স্হানান্তরের পর টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক সড়কে বাস ডাকাতির ঘটনা বেড়ে যায়।

ঐ হাইওয়ে ফাঁড়ির ওসি আনিসুর রহমান জানান, এলেঙ্গা ফাঁড়ির পুলিশ এখন টাঙ্গাইল-ঢাকা চার লেনে ডিউটি করে। উত্তর টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক সড়কে ধনবাড়ী, মধুপুর, ঘাটাইল ও কালিহাতী থানা পুলিশ টহল দিয়ে থাকে। তবে রক্তিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আবুল হোসেন জানান, গত মঙ্গলবারের ওই ঘটনার সময় আঞ্চলিক সড়কে পুলিশের কোনো টহল ছিল না। তাই ডাকাতরা একই সড়কে টানা তিন ঘণ্টা এলোমেলো বাস চালিয়ে নির্বিঘ্নে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়ে চম্পট দেয়।

এ ব্যাপারে ঘাটাইল থানার ওসি আজাহারুল ইসলাম জানান, জনবল থাকলেও গাড়ির অভাবে থানা পুলিশ সব সময় হাইওয়ে ডিউটি করতে পারে না। ধনবাড়ী থানার ওসি চান মিয়া জানান, ভাইঘাট হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি এলেঙ্গায় সরিয়ে নেওয়ার পর থানা পুলিশকে বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হয়। মধুপুর থানার ওসি মো. মাজহারুল আমিন জানান, পুলিশ সঠিকভাবেই দায়িত্ব পালন করছে। মধুপুর বনাঞ্চলের সড়কে রাতের বেলায় এখনো জলছত্র ফাঁড়ির পুলিশ পাহারা দেয় বলে তিনি দাবি করেন। 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি