মিয়ানমার সীমান্তে মাদক-মুদ্রায় চোরাচালান-২

পণ্যবাহী ট্রলারেই ঢোকে মাদক!

প্রতি ট্রিপে হেড মাঝি ৩ লাখ, সহযোগীরা পান ৩০-৪০ হাজার টাকা, পণ্যমূল্যের ৫০ শতাংশ আগাম হুন্ডির মাধ্যমে, বাকিটা পরিশোধ হয় ইয়াবা-আইস দিয়ে

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২৯

একসময় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে চোরাচালানের মূল উদ্দেশ্য ছিল পণ্য নিয়ে গিয়ে নগদ অর্থ পাওয়া। এখন সেখানে যুক্ত হচ্ছে আরেকটি স্তর—পণ্যের বিনিময়ে মাদক। এই ব্যবস্থায় চোরাকারবারিরা একবারের যাত্রায় দুই ধরনের মুনাফার সুযোগ পাচ্ছে। বাংলাদেশি পণ্য মিয়ানমারে চড়া দামে বিক্রির পর তারা মাদকও পাচ্ছে, যা বাংলাদেশে বিক্রি করে আবার নগদ অর্থে রূপান্তর করা সম্ভব। নগদ অর্থের পাশাপাশি মাদক দিয়ে পণ্যের মূল্য পরিশোধের এই প্রবণতাকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন ‘নার্কো-কারেন্সি’ বা মাদক-মুদ্রা।

সামপ্রতিক একাধিক প্রতিবেদন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে সীমান্তের চোরাচালান এখন একমুখী নয়। বাংলাদেশ থেকে নিত্যপণ্য যাচ্ছে, আর একই ট্রলারে ঢুকছে মাদক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পণ্যের মূল্যের একটি অংশ হুন্ডির মাধ্যমে আগাম পরিশোধের পর বাকি অংশ মাদক দিয়ে সমন্বয় করা হচ্ছে।

একই নৌযানদুই ধরনের অবৈধ বাণিজ্য : চোরাচালান-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার সময় নৌযানে থাকে সিমেন্ট, চাল, ডাল, তেলসহ বিভিন্ন পণ্য। ফেরার সময় একই নৌযানে মাদক আসার অভিযোগ রয়েছে। এক জেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ও মিয়ানমারের মধ্যে চলাচলকারী একটি মাছ ধরার নৌযান মাসে একাধিকবার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে মিয়ানমারে যায় এবং ফেরার সময় ইয়াবা নিয়ে আসে। ঐ নৌযানের ওপরের অংশে মাছ ও মাছ ধরার সরঞ্জাম রাখা হয় বলে দাবি করেন তিনি।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কক্সবাজারের উপপরিচালক সোমেন মন্ডলও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে মাছ ধরার নৌকা পণ্য নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে এবং ফেরার সময় ইয়াবা নিয়ে আসে। তার ভাষ্য, আগে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের প্রবণতা বেশি থাকলেও এখন পণ্যের বিনিময়ে মাদক আসার ঘটনাও দেখা যাচ্ছে।

ট্রলার ভাড়া কত : একটি মাছ ধরার নৌযানের মালিক খলিল মাঝি জানান, তিনি ছয় মাসের জন্য নৌকাটি ভাড়া দিয়েছিলেন। পরে ভাড়াটে ব্যক্তি মাদক কারবারে জড়িত থাকার বিষয়টি জানতে পেরে নৌকাটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে তিনি নৌকাটি কত টাকায় ভাড়া দিয়েছিলেন, তা জানাতে অস্বীকার করেন এই প্রতিবেদকের কাছে। তবে তিনি বলেন, সাধারণত নৌযানের আকার, যাত্রার সময়, রুট, পণ্য বহনের সক্ষমতা এবং ঝুঁকির ওপর ভাড়ার অঙ্ক পরিবর্তিত হতে পারে। এটা কোনো নির্দিষ্ট রেট নেই।

প্রতি ট্রিপে হেড মাঝি ৩ লাখসহযোগীরা পায় ৩০-৪০ হাজার : আব্দুর রহমান নামের এক জেলের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার যাওয়া-আসায় একটি ট্রিপে প্রায় পাঁচ দিন সময় লাগে। প্রতিটি ট্রিপে হেড মাঝিকে প্রায় ৩ লাখ টাকা দেওয়া হয়। আর অন্য সহযোগী বা নৌযানকর্মীদের প্রত্যেককে ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয় বলে তার দাবি।

কীভাবে নির্ধারিত হয় ‘নার্কো-কারেন্সির মূল্য : চোরাচালানের এই ব্যবস্থায় মাদকের কোনো নির্দিষ্ট বিনিময়মূল্য নেই। পণ্যের দাম, রাখাইনে ঐ পণ্যের সংকট, মাদকের মান ও বাংলাদেশে তার পাইকারি বাজারদর—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে লেনদেনের হিসাব করা হয়। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, কোনো কোনো চালানের মোট মূল্যের প্রায় অর্ধেক হুন্ডির মাধ্যমে আগেই পরিশোধ করা হয়। আরো একটি অংশ পণ্য মিয়ানমারের মংডু, বুথিডং ও রাথিডং জেটি থেকে ছাড়ার পর পরিশোধ করা হয়। অবশিষ্ট অংশ মাদক দিয়ে সমন্বয় করার অভিযোগ রয়েছে। তবে এই হিসাব সব চালানের ক্ষেত্রে একই—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাত্, পণ্য সরবরাহকারীর কাছে মাদক শুধু পাচারের পণ্য নয়; সেটিই হয়ে উঠছে পাওনা অর্থের একটি অংশ। পরে বাংলাদেশে এনে ঐ মাদক বিক্রি করে নগদ অর্থে রূপান্তর করা হয়।

মাদক জব্দের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ : মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৪ কোটি ৩৫ লাখ ৬২ হাজার ৮১১টি অ্যামফিটামিন জাতীয় মাদক ট্যাবলেট ইয়াবা জব্দ করেছে। ২০২৪ সালে জব্দের পরিমাণ ছিল ২ কোটি ২৮ লাখ ৫৭ হাজার ৭৫১টি। অর্থাত্ এক বছরে জব্দের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৯০ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ ইত্তেফাককে বলেন, সীমান্তে চোরাচালানের চরিত্র সব সময় পরিবর্তন হয়। কক্সবাজার সীমান্তে বিজিবি ও কোস্ট গার্ড এদেশ থেকে পণ্য পাচারের সময় সিমেন্ট, আলু, ডাল ও ওষুধ জব্দ করেছে। মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো ইয়াবাকে ‘নার্কো-কারেন্সি’ হিসেবে ব্যবহার করায় এর সরবরাহ বেড়েছে।

প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়াচ্ছে সীমান্তরক্ষীরা : বিজিবি জানিয়েছে, টেকনাফ সীমান্তে নজরদারির জন্য রাডার, ড্রোন ও নাইট-ভিশন ক্যামেরাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি নদীপথেও সন্দেহজনক নৌযানের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিজিবির ২ টেকনাফ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল হানিফুর রহমান ভূঁইয়া ইত্তেফাককে বলেন, ‘নার্কো-কারেন্সি’সহ সম্ভাব্য সকল ধরনের অবৈধ বিনিময় ব্যবস্থাকে বিজিবি গোয়েন্দা ও অভিযানিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও যাচাই করছে।

ইত্তেফাক/এনএন