যে সুবিধাগুলো রয়েছে ক্লাউড কম্পিউটিংয়ে

আপডেট : ১১ জুন ২০১৯, ২০:৩৯

মোজাহেদুল ইসলাম

 

 

ক্লাউড কম্পিউটিং

এক সময় মানুষ পার্সোনাল কম্পিউটারেরই প্রয়োজন বোধ করত না, তত্কালীন মানুষের মতে কম্পিউটার কখনোই বাড়িতে ব্যবহার করার দরকার পড়বে না, এরকমটা মানা হতো। কিন্তু আজ ইন্টারনেটের মারাত্মক উন্নতির ফলে ক্লাউড কম্পিউটিং নামক টপিকটির সঙ্গে আমাদের পরিচিত হতে হচ্ছে।

আচ্ছা, আপনি কম্পিউটিং বলতে কী বোঝেন? নিশ্চয় আপনার একটি কম্পিউটার রয়েছে, মানে একটি ফিজিক্যাল ডিভাইজ যেটার হার্ডওয়্যার আপনার টেবিলের ওপরে অবস্থতি তারপরে সেটার সাহায্যে আপনি নানান টাইপের কম্পিউটিং টাস্ক সম্পন্ন করে থাকেন?  কিন্তু ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি হচ্ছে আপনার কম্পিউটারের ফিজিক্যাল মেশিনটি আপনার টেবিলে না থেকে দুনিয়ার আরেক প্রান্তে থাকতে পারে, আর সেটাকে আপনি ইন্টারনেট এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ ও কম্পিউটিং করতে পারবেন। এখানে ‘ক্লাউড’ বলতে ইন্টারনেটকে নির্দেশ করা হয়েছে!

এখনো ব্যাপারটি বুঝতে কষ্ট হচ্ছে? আচ্ছা, চলুন আরো পরিষ্কার করার চেষ্টা করা যাক, আসলে ক্লাউড কম্পিউটিং এই টার্মটি একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকমের হতে পারে, একেবারে পানির মতো পরিষ্কার করার জন্য কিছু উদাহরণ নেওয়া যেতে পারে!

 

যে কারণে প্রয়োজন ক্লাউড কম্পিউটিং

এবার এক্কেবারে কাজের প্রশ্নটি করেছেন, ক্লাউড কম্পিউটিং এর কেন এতো গুরুত্ব রয়েছে? আচ্ছা মনে করুন আমি আপনাকে ফোনে একটি এসএমএস সেন্ড করেছি, যেটা সাধারণত আপনার মোবাইল ফোনে লোকালভাবে স্টোরড রয়েছে। ধরুন, আপনি মোবাইলটি বাসায় ফেলে আসলেন, এখন বলুন তো আপনি এসএমএসটি কীভাবে আক্সেস করবেন? আপনাকে বাসায় যেতে হবে এবং ফোনটি আনতে হবে, কেন না শুধু এভাবেই ডাটাটি আক্সেস করা যেতে পারে।

কিন্তু আমি যদি আপনাকে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে ম্যাসেজটি সেন্ড করতাম, সে ক্ষেত্রে আপনি আপনার ফোনটি বাসায় ফেলে আসলেও সমস্যা নেই। আপনি জাস্ট যে কারো ফোন থেকে আপনার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লগইন করতেন আর চট করে ম্যাসেজটি পেয়ে যেতেন। কেনো না ফেসবুকের মাধ্যমে কোনো মেসেজ সেন্ড করলে সেটা আপনার লোকাল ডিভাইজে নয় বরং ফেসবুক সার্ভারে স্টোরড থাকে, আর সার্ভার থেকে ইন্টারনেট ইউজ করে দুনিয়ার যে কোনো প্রান্ত থেকেই তা আক্সেস করা সম্ভব?

তাহলে ভেবে  দেখেন ক্লাউড কম্পিউটিং কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ? আসলে এটা ম্যানেজড, এটা পোর্টেবল, এটা অন-ডিম্যান্ড, এটা পাবলিক/প্রাইভেট সেবা।

 

অন-ডিম্যান্ড সেবা

আপনার পিসিতে কোনো ফটো এডিট করতে চাইলে কি করতে হবে? আপনাকে ভালো হার্ডওয়্যার যুক্ত একটি পিসি বিল্ড করতে হবে যেটা ফটো এডিটর সফটওয়্যারকে হ্যান্ডেল করতে সক্ষম। তারপরে পিসিতে ফটোশপ ইন্সটল করতে হবে, লাইসেন্স কিনতে হবে, তারপরে ফটো এডিট শুরু করতে পারবেন। কিন্তু আপনি fotor.com থেকেও ফটো এডিট করতে পারবেন, সে ক্ষেত্রে আপনার প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার লাগবে না, কোনো সফটওয়্যার ইন্সটল করতে হবে না, কোনো লাইসেন্স নিতে হবে না, জাস্ট ব্রাউজার ওপেন করুন আর ফটো এডিট করতে শুরু করে দিন!

হ্যাঁ, এর মানে এটা নয় কোথাও কোনো সফটওয়্যার ইন্সটল করাই নেই, এডিটর সফটওয়্যার ইন্সটল করা রয়েছে আর সেটা চলতে কম্পিউটিং পাওয়ার ও লাগছে কিন্তু সেটা আপনার কম্পিউটারে নয়, fotor.com এর সার্ভার কম্পিউটারে! তো কি বুঝলেন? —ক্লাউড কম্পিউটিং ম্যানেজড সার্ভিস প্রদান করে, আপনাকে কিছুই করতে হবে না, শুধুমাত্র কানেক্ট করুন, আর ব্যবহার করুন।

 

যখন যতোটুকু দরকার

ধরুন, আপনি কম্পিউটারে শুধু মিউজিক আর বেসিক ওয়েব ব্রাউজিং করেন, সে ক্ষেত্রে ৪ জিবি র্যাম লাগানো রয়েছে আপনার সিস্টেমে। একদিন হঠাত্ করে একটা ভিডিও এডিট করার দরকার পড়ল, এখন ভিডিও এডিট করতে ৮ জিবি র্যাম সিস্টেমে থাকা আবশ্যক, তাহলে কি একটা ভিডিও এডিট করতে আবার ৮ জিবি র্যাম কিনে লাগাবেন?

ক্লাউডে ব্যাপারটা অনেক সহজ, আপনি সর্বদা কম রিসোর্স ভাড়া নিতে পারেন, এতে কম টাকা লাগবে, আবার যখন দরকার কেবল নির্দিষ্ট কিছু সময়ের জন্য রিসোর্স বারিয়ে নিতে পারবেন, কয়েক ক্লিকের মাধ্যমে সেই কাজ করা সম্ভব হবে।

আপনার ৮ জিবি র্যাম দরকার হলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভাড়া নিলেন, কাজ শেষে আবার পূর্বের কনফিগারে ফেরত আসলেন। কারণ, ক্লাউড ‘pay-as-you go’ অথবা সাবস্ক্রিপশন সিস্টেমে কাজ করে।

মানে ক্লাউড কম্পিউটিং ব্যাপারটা আপনার মোবাইলের বিল বা বিদ্যুতের বিলের মতোই। ঠিক যতোটুকু ব্যবহার করবেন তার জন্য বিল প্রদান করতে হবে। বিদ্যুত্ ব্যবহার  না করলে বিলও আসবে না, কথা না বললে ফোনের টাকাও কাটবে না, যতোটুকু কথা ততোটুকু মোবাইল বিল।ঠিক একইভাবে এটাও।

 

প্রাইভেট/পাবলিক কম্পিউটিং

আপনার পিসি আপনার ডেস্কের উপরে বসে রয়েছে, তাই না? আপনার কম্পিউটার সিস্টেমের উপরে আপনার সম্পূর্ণ কন্ট্রোল রয়েছে, কেউ চাইলেই বাইরে থেকে আপনার কম্পিউটার আক্সেস করতে পারবে না। ঠিক তেমনই, ক্লাউড কম্পিউটিং এর ক্ষেত্রেও প্রাইভেট ও পাবলিক ক্লাউড বলে দুইটি আলাদা আলাদা ফ্লেভার রয়েছে।

আপনি যেকোনো স্থান থেকে আপনার মেইল ইনবক্স আক্সেস করতে পারছেন বা আর ম্যাসেজগুলো পড়তে পারছেন। এটা পাবলিক ক্লাউডের মধ্যে পরে। কিন্তু আপনার যদি বিজনেস থাকে, সেক্ষেত্রে আপনি নিশ্চয় চাইবেন না বিজনেসের ক্ষেত্রে ব্যবহূত ক্লাউড সার্ভারগুলোকে বাইরে থেকে কেউ আক্সেস করুক, তাই না? এজন্য রয়েছে প্রাইভেট ক্লাউড।

ক্লাউড প্রভাইডার যেমন- অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস, এরা প্রাইভেট ও পাবলিক দুই টাইপের ক্লাউডের সেবাই প্রদান করে থাকে। প্রাইভেট ক্লাউড আলাদা কোনো টার্ম নয় এটা পাবলিক ক্লাউড স্টাইলেই কাজ করে কিন্তু আপনি একটি নিরাপদ নেটওয়ার্ক থেকে বা আপনার নির্দিষ্ট নেটওয়ার্ক থেকেই কেবল সেসকল ক্লাউড আক্সেস করতে পারবেন। অনেক ক্লাউড প্রভাইডারগণেরায় ভার্চুয়াল প্রাইভেট ক্লাউড সেবা প্রদান করে থাকে।

 

ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের ধরণ

ক্লাউডের নানান প্রকার রয়েছে, ইতোমধ্যে এ বিষয়ে অনেক আলোচনা করা হয়েছে উপরোক্ত লেখায়। টেকনিক্যাল টার্ম থেকে বিবেচনা করতে ক্লাউড প্রধানত তিন প্রকারের।

ইনফ্রাসটাক্সার এজ এ সার্ভিস (আইএএএস) :এর মানে হচ্ছে, আপনি সম্পূর্ণ কম্পিউটার কিনছেন। আপনার ক্লাউড কম্পিউটারটি সম্পূর্ণই আপনার ডেস্কে বসে থাকা কম্পিউটারটির মতোই। আপনি সেখানে গেম খেলতে পারবেন, সফটওয়্যার ইন্সটল করতে পারবেন, অপারেটিং সিস্টেম পরিবর্তন করতে পারবেন। মানে ঠিক যেভাবে আপনি আপনার ফিজিক্যাল কম্পিউটারটির ক্ষেত্রে করে থাকেন। আপনাকে Pay-As-You-এর হিসেবে বিল নির্ধারণ করা হবে।

সফটওয়্যার এজ এ সার্ভিস (এসএএএস) :এখানে আপনাকে সম্পূর্ণ কম্পিউটার সিস্টেমটিকে দিয়ে দেওয়া হয় না, জাস্ট কোনো একটা স্পেশাল সফটওয়্যার রান করার পারমিশন দেওয়া হয়। যেমন আপনি যখন জি-মেইল ইউজ করেন জি-মেইল সফটওয়্যারটি গুগলের যে সার্ভার কম্পিউটারে ইনসটল থাকে সেই কম্পিউটারই সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে না দিয়ে শুধু জিমেইল অ্যাপটি ব্যবহার করার পারমিশন দেওয়া হয়।

প্লাটফর্ম এজ এ সার্ভিস (পিএএএস) : ধরুন আপনার ওয়েবসাইট রয়েছে, যেখানে সাইটটি অবশ্যই কোনো ওয়েব সার্ভারে হোস্ট করা রয়েছে, কিন্তু সাইটের পোস্টে লাইক করার জন্য বা কমেন্ট করার জন্য ফেসবুক এপিআই ইউজ করা হয়েছে, এ ক্ষেত্রে এটাকে Platform as a Service (PaaS) বলতে পারেন। যেমন ধরুন আপনার ই-কমার্স ওয়েবসাইটের কার্ট, চেকআউট ইত্যাদি জিনিসগুলো পেমেন্ট মার্চেন্ট সার্ভার থেকে হ্যান্ডেল করা হয়।