ইউক্রেন যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে খেরসন

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২২, ০৬:০৪

গত দুই সপ্তাহে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী নিপ্রো নদীর ওপর কয়েকটি ব্রিজ বোমা মেরে ব্যবহার অনুপযোগী করে দিয়েছে। এর ফলে খেরসনে বিপাকে পড়তে চলেছে রুশ বাহিনী। খেরসান নগরী ঘিরে ধরছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। আশা করছে, কিছু দিনের মধ্যে নিজেদের পুনঃনিয়ন্ত্রণে নিতে পারবে। বন্দরনগরী খেরসন মার্চ থেকে রুশ বাহিনীর দখলে। কৌশলগতভাবে বন্দরনগরীটির অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। খেরসন লড়াইয়ে ইউক্রেনের বাহিনী সফল হলে সেটি হবে ২৪ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর এ পর্যন্ত তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বদলাতে শুরু করেছে। প্রথম থেকে যুদ্ধের কেন্দ্র ছিল ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চল। সেটা এখন দক্ষিণ দিকে সরছে। খেরসন একটি আঞ্চলিক রাজধানী। যুদ্ধ শুরুর একমাসের মধ্যেই রুশ বাহিনী দখল করে এটি। এর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে ইউক্রেনের বাহিনী কয়েক মাস ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে। 

পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে পাওয়া হাই মবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেমসের (এইচআইএমএআরএস) মতো ভারী অস্ত্র ইউক্রেনের যোদ্ধাদের ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিতে কয়েক মাস লেগে যায়। খেরসনের দিকে তারা ধীরে অগ্রসর হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ৪৪টি গ্রাম ও কয়েক শহরতলী এলাকা তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, ‘খেরসন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী জানিয়ে দিতে চায় যে, এই যুদ্ধে চূড়ান্তভাবে জেতার ক্ষমতা তাদের রয়েছে’। অনেকে মনে করে, এটা যুদ্ধে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে দিতে পারে। ব্রিজ ধবংস করে দিয়ে ইউক্রেন নগরীরর দখল নিতে পারলে রুশ বাহিনীর দক্ষিণ থেকে অগ্রসর হওয়ার পথ বন্ধ করে দিতে পারে। অন্যদিকে রাশিয়ার দিক থেকে দেখলে এই নগরীর ওপর দখল বজায় রাখতে পারলে তা ওডেসা বন্দর দখলের পথ সুগম করে দেবে।

ইউক্রেনের সৈন্যরা মে থেকেই খেরসন পুনরুদ্ধারের প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়। নগরীটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলে দেশের ভেতরে যেমন একইভাবে বাইরের দুনিয়ার কাছেও এই বার্তা পৌঁছানো যাবে যে, রুশ বাহিনী মোকাবিলার সামর্থ্য ইউক্রেনের সৈন্যদের রয়েছে। তাছাড়া সেটি রুশ প্রেসিডেন্টে ভ্লাদিমির পুতিনের জন্যও এক অপমানজনক বিষয় হবে। ভেঙে পড়তে পারে রুশ সৈন্যদের মনোবলও। কারণ তা হলে ওডেসা বন্দর তাদের কাছে অধরাই থেকে যাবে। ওডেসা ছাড়া কৃষ্ণসাগরের নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। খেরসন নিয়ে ইউক্রেন যে কোনো সর্বাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত হবে সেটা মনে হয় না। ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়ার নীতি তারা অনুসরণ করছে। বিশেষ করে নিপ্রো নদীর পশ্চিম দিক থেকে শত্রু বাহিনীকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে চাইছে। এটি করা গেলে রুশ বাহিনীর রসদ সরবরাহ লাইন ভেঙে পড়বে। জুলাইয়ের শুরু থেকে ইউক্রেন সেখানে ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ সেনা উপস্থিতি বাড়িয়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে তারা ইতিমধ্যেই অনেকগুলো গোলাবারুদ বহনকারী রুশ গাড়ি ধ্বংস ও কমান্ড পোস্ট গুঁড়িয়ে দিয়েছে। অতিসম্প্রতি তারা নিপ্রো নদীর ব্রিজগুলোর দিকে মনোযোগ দিয়েছে। খেরসনে পুতিনবাহিনীর জন্য এটি লাইফলাইন। রুশ বাহিনী অবশ্য নিপ্রো নদীতে পুরনো ফেরি সার্ভিস চালু করেছে। এ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, খেরসানের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

নতুন অস্ত্র ব্যবহারের জন্য ইউক্রেনের সৈন্যদের প্রশিক্ষণের জন্য যুদ্ধে একটি বিরতি দেওয়া প্রয়োজন বলে কোনো প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মনে করেন। তবে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী মনে করে, এখন তাদের আরো ট্যাংক ও সামরিক সরঞ্জামাদি প্রয়োজন। পশ্চিমা সহযোগিরা ঠিকমতো সহযোগিতা করছে না বলেই তারা মনে করে। লাখ লাখ ইউক্রেনীয় এখন রুশ আগ্রাসনের অধীনে। অরাজকতা ও নিরাপত্তাহীনতা তাদের নিত্যসঙ্গী। অবস্থা যত দীর্ঘায়িত হবে তাদের দুর্দশা ততই বাড়বে। রুশ অধিকৃত ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলে একটি গণভোট আয়োজনের চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখলের পর রাশিয়া যেভাবে সেখানে গণভোট করেছিল অনেকটা সেই রকম ভোট করতে চায় রাশিয়া।

ইউক্রেন যে খেরসনে লড়াই করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বিষয়টি কিন্তু রাশিয়ার হিসাবের মধ্যে আছে। এ কারণে মস্কো ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে নতুন সৈন্য মোতায়েন শুরু করেছে। বাইরের সাহায্যের আশায় ইউক্রেন যত দেরি করবে রুশ বাহিনীও পরবর্তী লড়াইয়ের জন্য প্রস্ত্তত হতে তত সময় পাবে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউক্রেনের সৈন্যরা খেরসনকে অন্যান্য অধিকৃত অঞ্চল থেকে সফলভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। তবে তারা খেরসন আসলেই দখলে নিতে পারবে কি না, সেটা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এদিকে খেরসনের দখল নিয়ে দুই পক্ষের লড়াইয়ের মধ্যে আটকা পড়েছে স্থানীয় বাসিন্দা।

ইত্তেফাক/ ইআ