বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বাড়তি বাসভাড়া নিয়ে তর্কাতর্কি-বিশৃঙ্খলা

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২২, ০৫:০১

বাড়তি বাসভাড়া নিয়ে রাজধানীতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। সরকারনির্ধারিত হারে বর্ধিত ভাড়া নিচ্ছে না কোনো বাসই। এর মধ্যে আবার ‘ওয়েবিলের’ নামে যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। অনেক যাত্রী বর্ধিত অতিরিক্ত ভাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানালে বাসের স্টাফদের সঙ্গে তর্কাতর্কি হচ্ছে, কোথাও হাতাহাতিও। বিষয়টি যাদের দেখার কথা সেই বিআরটিএও ভাড়া নির্ধারণ করে বসে আছে। এটা কেউ মানছে কি না, তা দেখতে মাঠে দেখা যাচ্ছে না তাদের। তবে গতকাল সোমবার চট্টগ্রামে মোবাইল কোর্ট অভিযান চালিয়ে সাতটি বাসকে জরিমানা করেছে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি কোম্পানির ৮০-৯০টি বাসের মধ্যে একটি বাসকে জরিমানা করলে মালিকদের কী এসে যায়? এভাবে কাজ হবে না। খোদ রাজধানীতে এমন বিশৃঙ্খলায় বিআরটিএ নীরব কেন? এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর মেলেনি প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তার কাছ থেকে। যাত্রীরা কার কাছে বিচার চাইবে, তাও বুঝতে পারছে না। ফলে অধিকাংশ মানুষ বাসের মধ্যে কোনো ঝামেলায় না গিয়ে বাস স্টাফদের দাবি করা অতিরিক্ত টাকা দিয়েই নীরবে চলে যাচ্ছেন। দু-একজন যারা প্রতিবাদ করছেন তাদের বাসের স্টাফদের কাছে নাজেহালও হতে হচ্ছে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর থেকে রাজধানীতে বাস কমিয়ে দিয়েছেন মালিকরা। ফলে অতিরিক্ত টাকা দিয়েও বাস পাওয়া যাচ্ছে না।

রাজধানীর ফার্মগেটে বাসের জন্য অপেক্ষায় থাকা ব্যাংক কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মালিকরা ইচ্ছে করেই এখন বাস নামাচ্ছেন না। রাস্তায় বাস কম থাকলে যাত্রীরা অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে খুব বেশি উচ্চবাচ্য করবে না। এই সুযোগে তারা অতিরিক্ত ভাড়াটাকেই নিয়মিত ভাড়া বানিয়ে তারপর রাস্তায় নামাবে বাস। এগুলো আসলে দেখার দায়িত্ব কার? সাধারণ মানুষ এসব নিয়ে কার কাছে বিচার চাইবে? শুধুই হয়রানি বাড়ছে।’

বিআরটিএর নির্ধারণ করা মহানগরীতে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা। অর্থাৎ বর্ধিত ভাড়া অনুসারেই এই টাকায় ৪ কিলোমিটার পথ যাওয়ার কথা। মোহাম্মদপুর থেকে বনশ্রী রুটে চলাচল করা স্বাধীন পরিবহনের যাত্রী আমিরুল ইসলাম বললেন, মোহাম্মদপুর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত ৩ দশমিক ৩ কিলোমিটার। এখানে স্বাধীন পরিবহন ভাড়া আদায় নিচ্ছে ১৫ টাকা। যা এতদিন আদায় করা হতো ১০ টাকাই। সরকার নির্ধারিত হারে এই ভাড়া হওয়ার কথা টাকা। কিলোমিটারের বদলে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত আলাদা ভাড়া রাখার হিসাব করতে বসানো হয় ওয়েবিল। পুরো পথের জন্য কিলোমিটার হিসেবে একটি ভাড়া ঠিক করার পাশাপাশি সংক্ষিপ্ত পথের ভাড়া ঠিক করা হয় ওয়েবিল থেকে অন্য ওয়েবিল পর্যন্ত। এক ওয়েবিল থেকে আরেকটি পার হয়ে গেলেই ভাড়া নেওয়া হতে থাকে ১০ টাকা করে। কিন্তু এই ওয়েবিলগুলো ৪ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার দূর দূর বসানো হয়নি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বসানো হয় দুই কিলোমিটারের মধ্যে। ফলে প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া কার্যত পড়ে পাঁচ টাকা, যা ছিল সরকার নির্ধারিত হারের ২ দশমিক ৩২ গুণ।

আরেক জন যাত্রী রইসুল ইসলাম বললেন, মোহাম্মদপুর থেকে আগে মালিবাগ রেল গেটে ভাড়া নিত ২০ টাকা। এখন নিচ্ছে ৩০ টাকা। এরা ভাড়ার কোনো সামঞ্জস্য রাখছে না। যা খুশি নিচ্ছে। ভাড়া বাড়ার আগে এই রুটে আদায় করা হতো ২০ টাকা। এই পথের দূরত্ব ৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার। আগের হারে ভাড়া হয় ১৪ টাকা ৪০ পয়সা। বর্তমান হারে তা আসে ১৬ টাকা ৭৫ পয়সা। অর্থাৎ বাড়তি আদায় করা হচ্ছে ১৩ টাকা ২৫ পয়সা। আড়াই টাকা কিলোমিটারের বদলে আদায় করা হচ্ছে ৪ টাকা ৪৭ পয়সা হারে। এই চিত্র সবগুলো বাসেই।

যাত্রীদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সরকার ভাড়া বাড়িয়েছে কিলোমিটার হিসাবে। রাজধানীর বাসে ওয়েবিলে আগে যে বাড়তি ভাড়া নিত, তার সঙ্গে আবার নতুন করে পাঁচ থেকে ১০ টাকা যোগ করেছে। আমাদের অভিযোগটাও সেই জায়গায়। বিআরটিএর জরিমানায় কাজ হচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটা পরিবহনের বাস যদি ৮০টি হয়, একটি বাসকে জরিমানা করল, তাহলে বাকি ৭৯টি বাস তো নৈরাজ্য চালাচ্ছেই। অতীতে যে রকম লোক দেখানো অভিযান চালানো হয়েছে, ঐ ধরনের অভিযান দিয়ে এই অভিযোগ নিষ্পত্তি করা যাবে না। কোম্পানির প্রধানকে ধরে আনতে হবে। ধরে এনে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিতে হবে। বাস স্টপেজগুলোতে ডিজিটাল ভাড়ার তালিকা টানাতে হবে। বিআরটিএ যেটা ভাড়ার তালিকা দেয়, এটা তো সাধারণ যাত্রীরা বোঝে না। এই ধরনের গোঁজামিল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এই গোঁজামিল অতিরিক্ত ভাড়াকে উত্সাহিত করে।

লঞ্চভাড়ার সিদ্ধান্ত বুধবার :সোমবার সচিবালয়ে লঞ্চমালিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। তবে সেখানে ভাড়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোস্তফা কামাল বলেন, ‘মালিকপক্ষ যে প্রস্তাব দিয়েছে সেটিকে আমরা যৌক্তিক মনে করছি না। এজন্য একটি ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওয়ার্কিং কমিটি বুধবারের মধ্যে সরকারের কাছে প্রস্তাব দেবে। সে অনুযায়ী ভাড়া বাড়ানো হবে।

ইত্তেফাক/ইআ