এক বছর আগে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে তালেবান। প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তারা মধ্যপন্থি নীতি পালনের কথা বলায় সারা বিশ্ব অবাক হয়েছিল। তাদের মূল অঙ্গীকার ছিল নারীর অধিকার। কিন্তু সেই কথা কি তারা রেখেছে?
শরিয়তি আইন মেনে নারীর অধিকার
২০২১ সালের আগস্টে ক্ষমতায় এসে তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ শরিয়তি বিধান মেনে নারীর অধিকার রক্ষার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ডয়চে ভেলের ফ্যাক্ট চেক টিম বলছে, সেটা হয়নি। কারণ বাড়ির বাইরে গেলে মেয়েদের আপাদমস্তক ঢেকে রাখতে বলা হয়েছে। রাস্তায় বেরিয়ে মুখ না ঢাকলে পরিবারের পুরুষ বাবা, ভাই বা স্বামী সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকছেন। পুরুষ অভিভাবক ছাড়া বিমানেও ওঠা যায় না।
মেয়েদের হাইস্কুলে যেতে দিচ্ছে না
তালেবান মুখপাত্র মুজাহিদের দাবি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় মেয়েদের হাই স্কুলে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে। অথচ মার্চে একদিন স্কুল খুলেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এর পক্ষে যুক্তি হিসেবে মন্ত্রণালয় শিক্ষকের অভাব ও স্কুল ইউনিফর্মের সমস্যাকে সামনে নিয়ে এসেছে। তালেবানের দাবি, ইসলামি আইন এবং আফগান সংস্কৃতি মেনে পরিকল্পনা তৈরি হলে মেয়েরা আবার স্কুলে যাবে। কিন্তু কোনো বদল হয়নি।
প্রাক্তন শত্রুদের ক্ষমা?
মুজাহিদের দাবি ছিল, ‘‘কোনো প্রতিশোধ নয়। ২০ বছর ধরে যুদ্ধ করা হাজারো সেনাকে ক্ষমা করা হয়েছে।’’ কিন্তু ডিডাব্লিউর ফ্যাক্ট চেক টিম বলছে, এ দাবিও মিথ্যা। আফগানিস্তানে জাতিসংঘ বলছে, ২০২১ সালের ১৫ অগাস্ট থেকে ২০২২ সালের ১৫ জুনের মধ্যে তালেবান কর্তৃপক্ষ ১৬০টি বিচারবহির্ভূত হত্যা, ১৭৮টি নির্বিচারে গ্রেপ্তার, ২৩টি আচমকা গ্রেপ্তার এবং প্রাক্তন সরকার ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের নির্যাতনের ৫৬টি ঘটনা ঘটিয়েছে।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা
তালেবানের ‘সাংস্কৃতিক কাঠামোতে’ হস্তক্ষেপ না করলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বজায় থাকবে বলে জানিয়েছিলেন মুজাহিদ। বাস্তবে ক্ষমতায় এসেই ডয়চে ভেলের সাংবাদিকের আত্মীয়কে হত্যা করে তারা। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ জার্নালিস্টস জানিয়েছে, ২০২১-এর সেপ্টেম্বরে তালেবান এবং ন্যাশনাল রেজিস্টেন্স ফ্রন্ট অফ আফগানিস্তানের যোদ্ধাদের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হন আফগানিস্তানের জাতীয় সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রধান ফাহিম দাশতি।
পরিসংখ্যান কী বলছে
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের প্রতিবেদন বলছে, ২০২১ সালের জুলাই মাসে আফগানিস্তানে নিউজরুমে ১০ হাজার জন কাজ করতেন। ডিসেম্বরে কাজ করেছেন চার হাজার ৩৬০ জন। তালেবান শাসনের প্রথম তিন মাসে ৫৪৩টির মধ্যে ২৩১টি সংবাদমাধ্যম আচমকা উধাও হয়ে গিয়েছে। অধিকার সংস্থাগুলো বলছে, তালেবানদের হাতে সাংবাদিকদের হত্যার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তাদের কাছে নেই।
যা বলছে উল্টো করছে
মার্চ মাসে ডয়চে ভেলে, বিবিসি, ভয়েস অফ আমেরিকাসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সম্প্রচার বন্ধ করে তালেবান। এপ্রিলে এক ডজন সাংবাদিক গ্রেপ্তার হন। সাংবাদিকদের নির্বিচারে আটক বন্ধ করার আহ্বান করেছে জাতিসংঘ। অথচ ডয়চে ভেলেকে জানুয়ারি মাসে তালেবান মুখপাত্র বলেন, কোনো সংবাদমাধ্যম বন্ধ করেননি। তিনি স্বীকার করেন পশ্চিমা গণমাধ্যমকে তালেবানের কিছু নিয়ম মানতে হবে, যাকে পশ্চিমা দুনিয়া নিয়ন্ত্রণ ভাবতে পারে।
মাদক উৎপাদন নয়
ক্ষমতায় এসে তালেবান মুখপাত্র মাদক উৎপাদন না করার অঙ্গীকার করেছিলেন। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তালেবানকে উদ্যোগী দেখা যাচ্ছে। গত এপ্রিলে আফিম চাষ ও ফসল কাটা নিষিদ্ধ করে তারা।
