বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৩ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

হিস্টেরিয়া একটি মানসিক সমস্যা

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২২, ০৪:৩২

ঢাকার স্বনামধন্য কলেজ থেকে সদ্য এইচএসসি পাশ করা একটা ছেলেকে নিয়ে তার বাবা-মা চেম্বারে আসেন। ছেলেটির বয়স ১৮, তেমন আই কন্টাক করে না, মুখভঙ্গি খুব বিষণ²। বাবা সরকারি কর্মকর্তা আর মা হলেন গৃহিণী। ছেলেটির বর্তমান সমস্যা, সে বারবার অজ্ঞান হয়ে যায়, ডান হাত ও ডান পা সব সময় বাঁকা থাকে, ডান পা দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে, ডান হাত দিয়ে কোনো কাজই করতে পারে না, কয়েক দিন আগেও ভালোভাবে এইচএসসি পাশ করল সেই হাত দিয়ে আর লিখতে পারে না, ডান চোখ দিয়ে কম দেখে। ছেলেটির বাবা-মা ঢাকায় কিছুদিন চিকিত্সা করিয়ে তাকে সিঙ্গাপুর নিয়ে গিয়েছিলেন। সিঙ্গাপুরে সব পরীক্ষানিরীক্ষা করে সাইকোলজিস্টের চেম্বারে পাঠায়, সেখানে সিরিয়াল পেতে আরো ১৫ দিন অপেক্ষা করতে হবে। তার বাবার চাকরির কারণে সিঙ্গাপুরে থাকা সম্ভব হয়নি। অগত্যা বাংলাদেশে ফিরে এসে একজন অধ্যাপককে দেখান। তিনি পরবর্তীকালে সাইকোলজিক্যাল থেরাপির জন্য রেফার করেন। বাংলাদেশ এমনকি সিঙ্গাপুরেও সব পরীক্ষা করে চিকিত্সক নিশ্চিত হন, তার রোগের শারীরিক কোনো ভিত্তি নেই, অর্থাৎ এই রোগটি হলো মানসিক। বর্তমানে সাইকোথেরাপি নিয়ে ভালোই আছে এবং একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে।

কনভার্শন ও ডিসোসিয়েটিভ ডিজঅর্ডার একসময়ে হিস্টেরিয়া নামেই বেশি পরিচিত ছিল। যে কোনো কারণে মনের ভেতর চেপে রাখা কোনো মানসিক চাপ, কষ্ট কিংবা মানসিক দ্বন্দ্ব হঠাত্ করে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক বা স্নায়বিক লক্ষণ আকারে প্রকাশ পায় তখন এই সমস্যাটিকে কনভার্শন ডিজঅর্ডার বা হিস্টেরিয়া বলে। এই রোগের জন্য ডাক্তারি পরীক্ষা করে কোনো কারণ পাওয়া যায় না। অনেকেই বিশেষত, গ্রাম অঞ্চলে এটি জিন-ভূতের আছর মনে করে। তবে বর্তমানে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে, এটি জিন-ভূতের আছর নয়, বরং মৃদু বা নিউরোসিস জাতীয় মানসিক সমস্যা। এই রোগে ব্যক্তির মানসিক চাপ বা দ্বন্দ্বের কারণে নানান ধরনের শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়।

হিস্টেরিয়ার কারণ: সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষণ তত্ত্ব অনুযায়ী, মানবমন সচেতন, প্রাক-সচেতন ও অবচেতন—এই তিনটি স্তর নিয়ে গঠিত। অবচেতন স্তরে সহজাত প্রবৃত্তি অনুযায়ী ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন চাওয়া-পাওয়া, ইচ্ছা, ক্ষোভ, না পাওয়া, বিভিন্ন মানসিক দ্বন্দ্ব, মানসিক চাপ ও জটিলতা অবদমিত হতে থাকে। এই অবদমনকারী প্রক্রিয়া কোনো কারণে দুর্বল হয়ে পড়লে, অবদমিত মানসিক চাপ, দ্বন্দ্ব বা মানসিক যন্ত্রণাগুলো সচেতন মনে চলে আসে, যার বহিঃপ্রকাশ হয় বিভিন্ন শারীরিক উপসর্গের মাধ্যমে।

হিস্টেরিয়ার লক্ষণ: এই রোগের লক্ষণগুলো সাধারণত নাটকীয়ভাবে উপস্হিত হয়। তবে মনোযোগ পেলে এই লক্ষণগুলোর প্রকটতা বেড়ে যায়। রোগীর যত্নকারী ব্যক্তিরা রোগের লক্ষণগুলো নিয়ে যতই বিচলিত থাকুক না কেন, এই রোগীরা কিন্তু ততটা উদ্বিগ্ন হন না।

হিস্টেরিয়ার প্রধান লক্ষণগুলো হলো: বারবার খিঁচুনি হওয়া, ফিট হওয়া, জ্ঞান হারানো, হাত-পা বেঁকে যাওয়া। হঠাৎ করে কথা বলতে না পারা, চোখে দেখতে না পারা, কানে শুনতে না পারা। হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়া, শরীরে ব্যথা বা স্পর্শের অনুভূতি হ্রাস পাওয়া। হঠাৎ করে কোনো কারণ ছাড়াই শরীরের কোনো অঙ্গের কার্যক্ষমতা লোপ পাওয়া। যেমন—হাঁটতে না পারা, হাত দিয়ে লিখতে না পারা। অস্বাভাবিক আচরণ করা, যেমন—পরিচিত লোককে না চেনা, কোনো ঘটনা মনে করতে না পারা, ঢেউয়ের মতো হাত নাড়তে নাড়তে দেহে ঝাঁকুনি দিয়ে হাঁটা, অপরিচিত স্হানে চলে যাওয়া বা নিজের পরিচয় ভুলে যাওয়া।

মৃগী রোগের সঙ্গে হিস্টেরিয়ার পার্থক্য: আরেকটি সমস্যা আছে, যাকে অ্যাপিলেপসি বা মৃগী রোগ বলে, যেটার সঙ্গে হিস্টেরিয়ার অনেক মিল আছে। মৃগী রোগ মূলত স্নায়ুতন্ত্রের একটি দীর্ঘস্হায়ী রোগ। মস্তিষ্ক-কোষের ইলেকট্রিক্যাল অ্যাকটিভিটি অস্বাভাবিকতার কারণে এ রোগ হয়ে থাকে। অনেকেই মৃগী রোগের সঙ্গে হিস্টেরিয়াকে মিলিয়ে ফেলেন। তাই সংক্ষেপে মৃগী রোগ ও হিস্টেরিয়ার পার্থক্য দেওয়া হলো

— মৃগী রোগীর খিঁচুনি সাধারণত তিন-চার মিনিট স্হায়ী হয়। অন্যদিকে কনভার্শন বা হিস্টেরিয়া হলে অজ্ঞান হওয়া রোগীর অনেকক্ষণ ধরে খিঁচুনি হতে পারে।

- মৃগী রোগী অজ্ঞান হওয়ার সময় কোনো কথার উত্তর দেয় না, জ্ঞান ফেরার পর কিছুই মনে করতে পারে না। হিস্টেরিয়াতে রোগী একেবারে অজ্ঞান নাও হতে পারে।

- হিস্টেরিয়ার অজ্ঞানে রোগীর গায়ে কোনো ধরনের আঘাত বা চোট লাগে না। মৃগী রোগীরা হঠাত্ অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়ে শরীরে বা মাথায় আঘাত লাগতে পারে। ফিটের সময় নিজের দাঁতের কামড়ে জিভ কেটে যেতে পারে।

- হিস্টেরিয়াতে জ্ঞান ফেরার পর রোগী তাড়াতাড়ি সজাগ হয়ে যায়। তারপর দুর্বল বোধ করে। কিন্তু আশপাশে কী হচ্ছে সব বুঝতে পারে, লোকজনকে চিনতে পারে এবং কোনো ধরনের অসংলগ্ন ব্যবহার করে না। আর মৃগী রোগীর অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার পর অনেকেই কিছুক্ষণের জন্য ঘুমিয়ে পড়ে।

- মৃগী রোগীরা অজ্ঞান হয়ে গেলে সাধারণত রোগী কাপড়ে মল বা মূত্র ত্যাগ করে ফেলে। কিন্তু হিস্টেরিয়ায় এমন হয় না।

- হিস্টেরিয়া ফিটের সময় বা পরে পরীক্ষা করে নার্ভের অস্বাভাবিক কোনো সাইন পাওয়া যায় না। মৃগী রোগীর স্নায়ুর পরীক্ষায় বিশেষ কিছু সাইন পাওয়া যায়, তার থেকে বোঝা যায় যে এটা একটা স্নায়ুর রোগ।

চিকিত্সা: হিস্টেরিয়া একটি সাধারণ ও চিকিত্সাযোগ্য মানসিক সমস্যা। সময়মতো চিকিত্সা করতে পারলে রোগী সম্পূর্ণরূপে আরোগ্য লাভ করেন এবং স্বাভাবিক ও সুস্হ জীবনযাপন করেন। এই রোগীদের প্রথমে একজন রেজিস্টার্ড চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করতে হয়। পরীক্ষার ফলাফলে যদি কোনো অস্বাভাবিকতা না পাওয়া যায়, তাহলে নিশ্চিত হওয়া যায়, এই সমস্যাটি হিস্টেরিয়া। এই রোগের একমাত্র চিকিত্সা হলো সাইকোথেরাপি। অর্থাত্ সাইকোলজিক্যাল থিউরি ও নীতি অনুযায়ী রোগীকে চিকিত্সা করা।

সমাজে হিস্টেরিয়া রোগীরা পির, ফকির, ওঝা, কবিরাজের কাছে গিয়ে জিন-ভূতের আছরের বা বদ নজরের রোগী হিসেবে ভুল চিকিত্সা নিয়ে তাদের অবস্হা আরো খারাপ হচ্ছে। এই ধরনের রোগীদের সঠিক মনশ্চিকিত্সার আওতায় আনার জন্য সবাই মিলে কাজ করলে রোগীসহ অভিভাবকের যন্ত্রণা দ্রুত লাঘব হবে। তাই এই ধরনের রোগীদের চিহ্নিত করে দ্রুত মনোবৈজ্ঞানিক চিকিত্সার আওতায় আনা প্রয়োজন।

লেখক: ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন