মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সিসি ক্যামেরা

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২২, ০০:০৪

ব্যাচেলর জীবনের ১০১টা সমস্যার মধ্যে প্রথম ও প্রধান সমস্যা হলো বুয়া সমস্যা। কোনো এক জ্ঞানী মানুষ বলেছিলেন, ‘শহরে বুয়া খুঁজে পাওয়ার চেয়ে সোনার খনি খুঁজে পাওয়া সহজসাধ্য!’ মাসখানেক হলো কর্মস্থল বদলিজনিত কারণে বাসা বদলেছি। নতুন বাসায় ওঠে বরাবরের মতোই বুয়াহীনতায় ভুগতে লাগলাম। প্রথম কয়েকটা দিন কোনোক্রমে বাইরে তিনবেলা খেয়ে কাটালাম। এরপর খুব চেষ্টা করে অফিসের এক কলিগের সহায়তায় একটা বুয়ার খোঁজ পেলাম। উনি যেদিন দেখা করতে এলেন, শুরুতেই তিনি তার একগাদা চাহিদা ও শর্ত তুলে ধরলেন। অবাক বিস্ময়ে তার চাহিদাগুলো শুনলাম—

এক. দিনে দুইবেলা রাঁধবেন, সপ্তাহে একদিন ছুটি।

দুই. অসুস্থতাজনিত কারণে সপ্তাহে দু-একদিন না এলেও কিছু বলা যাবে না।

তিন. একদিনে দুই ধরনের বেশি তরকারি রান্না করতে বলা যাবে না।

চার. বাসায় শাক আর ছোটমাছ নিয়ে আসা যাবে না।

পাঁচ. বাসার মেঝে মুছতে পারবেন না, মুছলেও সপ্তাহে বা পনেরো দিন পর একবার।

ছয়. বেতন-বোনাস এক তারিখের মধ্যেই চুকিয়ে দিতে হবে ইত্যাদি।

উপায় না পেয়ে নিতান্ত বাধ্য হয়েই বুয়ার চাহিদামতো তার সমস্ত শর্ত মেনে তাকে চূড়ান্ত করতে হলো। প্রথমে ভেবেছিলাম মহিলা খুব একটা কাজের হবেন না। কিন্তু দুইটা দিন যেতেই বুঝলাম—যা ভেবেছিলাম তা অনেকটাই ভুল, বেশ ভালো রান্না জানেন ভদ্রমহিলা।

অফিসে দিনের বেশিরভাগ সময় কাটাই। বুয়ার বাসায় আসতে অসুবিধে হবে ভেবে বাসার একটা চাবি তাকে দিয়ে রেখেছি। সকালে যখন উনি কাজে আসেন তখন ঘুমিয়ে থাকি, সন্ধ্যায় যখন আসেন তখন আমি অফিসে। সপ্তাহের ছয়টা দিনই উনার সাথে তেমন একটা দেখা হয় না। এ সুযোগটাই তিনি হয়ত নিয়েছেন। মাসের পনেরোটা দিন ভালোভাবেই পার হলেও হঠাৎ খেয়াল করলাম আগের তুলনায় একটু বেশিই জিনিসপাতি ফুরাচ্ছে, অলসতা ঠেলে বাজারেও দৌড়াতে হচ্ছে বেশি। একটু নজরদারি শুরু করতেই বুঝতে অসুবিধে হলো না বুয়ার বেশ হাতটানের অভ্যেস আছে। প্রথম কয়েকটা দিন ভালো চললেও এখন নিত্যদিন তেল, চাল, মসলা, মাছ, মাংসের প্রায় সবকিছুই তিনি একটু একটু করে সরান। বাসায় আমার সাথে যে ছেলেটা থাকে তার নজরও এড়ায়নি বিষয়টা। বুয়ার এমন আচরণে কী করে লাগাম টানা যায় তা মাথা এলো না। আবার তাকে ছাঁটাই করলেই আবার বুয়া খোঁজার ঝামেলা পোহাতে হবে। ওনাকে সরাসরি চুরির অভিযোগ জানাতেও আমার বিবেকে বাঁধল। ভেবে দেখলাম তার চুরির কথাটা বললে রাগে বা লজ্জায় হয়তো কাজও ছেড়ে দিতে পারেন। আবার দেখা যাবে নতুন যে বুয়া আসবে তার হাতটান তার থেকেও অনেক বেশি। অনেক ভেবে-চিন্তে মনে হলো কোনোভাবে বুয়ার চুরি রোধ করাটাই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। এতে সাপও মরবে, আবার লাঠিও ভাঙবে না!

বাসার একদম নিচে একটা ইলেক্ট্রনিকসের দোকান আছে। এখানে আসার পর দোকানের ছেলেটার সাথে বেশ সখ্যতা গড়ে ওঠেছে। প্রায় সন্ধ্যায় ওর দোকানে বসেই বেশ খানিকক্ষণ আড্ডা দিই, চা খাই। ওর দোকানে আড্ডা দিতে এসেও কী করে বুয়ার চুরি থামানো যায় সে বিষয়টাই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। আমাকে অনেকক্ষণ চুপচাপ দেখে দোকানের ছেলেটা জিজ্ঞেস করল, ‘ভাইজান কী লইয়া এত ভাবেন? সেই তখন থাইকা দেখতাছি...!’

রফিককে সব খুলে বললাম। আমার কথা শুনে পানখাওয়া লালচে দাঁতগুলোর সবকয়টা বের করে হাসতে লাগল সে। ওর হাসি দেখে বললাম, ‘দাঁত না ক্যালায়ে একটা বুদ্ধি দে ভাই!’

রফিক তার হাসি আরেকটু চওড়া করে বলল, ‘তাইলে এক কাজ করেন ভাইজান, ঘরে একটা সিসি ক্যামেরা লাগান!’

ওর কথা শুনে বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘আরে..., ঘরের ভেতরে ক্যামেরা লাগানো থাকলে কোনো প্রাইভেসি থাকে? সবই তো ক্যামেরাবন্দী হয়ে যাবে!’

রফিক এবার হাসি থামিয়ে সিরিয়াস ভঙ্গিতে উত্তর দিল, ‘এইটা ঠিক কইছেন অবশ্য!’ আমার সাথে কথা বলতে বলতেই সে একটা নষ্ট সিসি ক্যামেরা সারাইয়ের কাজে লেগে পড়ল।

ওর কাজ করা দেখেই আমার মাথায় নতুন বুদ্ধির উদয় হলো। বুদ্ধিটা মাথায় আসতেই রীতিমতো উল্লাস শুরু করেছি। আমার এমন উল্লাস দেখে রফিক মাথা তুলে জিজ্ঞেস করল, ‘হঠাৎ কী হইলো ভাইজান?’

ওর কথার জবাব না দিয়ে বললাম, ‘তোর দোকানে নষ্ট সিসি ক্যামেরা পড়ে আছে না?’

অবাক হয়ে সে উত্তর দিল, ‘আছে তো!’

হেসে বললাম, ‘আগামীকাল তোকে কল করলে বাসায় গিয়ে ওই নষ্ট ক্যামেরাগুলোর একটা আমার বাসার রান্নাঘর তাক করে লাগিয়ে দিয়ে আসবি!’

আমার কথার আগাগোড়া না বুঝতে পেরে অবাক বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল রফিক।

পরদিন একদম সকালে বুয়া রান্না করতে এলেন। ওই সময়েই মুঠোফোনে রফিককে ডাকলাম। পরিকল্পনামতো একটা চকচকে অথচ অকেজো সিসি ক্যামেরা নিয়ে আমার বাসায় হাজির হলো সে। রফিক তার যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বেশ যত্ন করে নষ্ট ক্যামেরাটা লাগিয়ে দিল। বুয়া হা করে আমাদের কার্যকলাপ দেখছিলেন। হঠাৎ উনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘মামা, কী করতাছেন এসব?’

খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললাম, ‘খালা, দিন দুনিয়ার অবস্থা ভালো না। নিজের সিকিউরিটির জন্য ক্যামেরা লাগাইয়া রাখতাছি। অফিসে বইসা থাইকাও মোবাইল বা কম্পিউটারে বাসার সবকিছু দেখতে পারব!’

আমার কথা শুনে বুয়াকে বেশ বিরক্ত মনে হলো। আজব মুখভঙ্গি করে ‘অহহ’ বলে রান্নায় মনোযোগ দিলেন।

নষ্ট সিসি ক্যামেরার সুফল এর পরের দিনগুলো থেকেই পেতে শুরু করলাম। অবাক হয়ে দেখলাম— বুয়ার হাতটানের অভ্যেস একদম হাওয়া হয়ে গেছে। রফিক বারবার আমার বুদ্ধির প্রশংসা করছিল। একদিন হেসে ওকে বললাম, ‘বুঝলি! একটু বুদ্ধি খাটিয়ে না চললে ব্যাচেলর জীবনে টিকে থাকা মুশকিল। 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন